আইনসভার কাঠামোগত দূর্বলতা: যে ০৭টি অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি গণতন্ত্র ও জনগণ (৩)
একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান স্তম্ভের মধ্যে আইনসভা অন্যতম। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতিফলন ঘটার কথা জাতীয় সংসদে। কিন্তু বাস্তবে আইনসভা যদি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে না পারে এবং কেবল নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তের ‘রবার স্ট্যাম্প’ হিসেবে কাজ করে, তবে রাষ্ট্রের সামগ্রিক কাঠামো নড়বড়ে হয়ে পড়ে। আইনসভার এই দুর্বলতা কেবল সংসদীয় বিতর্ককে অর্থহীন করে না, বরং সুশাসন ও জবাবদিহিতার পথকেও রুদ্ধ করে দেয়।
১. নির্বাহী বিভাগের একাধিপত্য ও স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা
আইনসভা শক্তিশালী না হওয়ার প্রধান ও সরাসরি ফলাফল হলো নির্বাহী বিভাগের সীমাহীন ক্ষমতা। কাঠামোগত দূর্বলতার কারণে সাংসদদের যে জবাবদিহি নির্বাহী বিভাগ কে করার কথা ছিল, তা করা সম্ভব হচ্ছেনা। নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতার অনুপস্থিতিতে জনসেবার মান ও জনসম্পৃক্ত উন্নয়ন প্রত্যাশিত ভাবে করা সম্ভব নয়। সংসদ যখন সরকারকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করতে পারে না, তখন মন্ত্রিসভা বা সরকার প্রধানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা পরোক্ষভাবে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পথ প্রশস্ত করে।
২. কার্যকর আইন প্রণয়নের অভাব
আইনসভার মূল কাজ হলো জনবান্ধব ও দূরদর্শী আইন প্রণয়ন করা। কিন্তু সংসদ দুর্বল হলে গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো নিয়ে পর্যাপ্ত বিশ্লেষণ ও বিতর্ক হয় না। অনেক ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করে বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার্থে আইন পাস করা হয়। এতে আইনের গুণগত মান যেমন কমে, তেমনি সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একই ক্ষেত্রে, মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলো আইনের অধীনে যে বিধি তৈরি করে সেগুলোও আইনের সাথে কতটা সংগতিপূর্ণ তা পরীক্ষা নিরীক্ষা যথাযথভাবে করা সম্ভব হয়না।
সাংসদ কে কার্যকর করা গেলে আইন মন্ত্রণালয় নির্বাহী বিভাগের অধীনে না থেকে সরাসরি সংসদের (সংসদ সচিবালয়ের) অধীনে চলে যাবে। ফলে যে সকল আইন সংসদ পাশ করবে, সে সকল আইনের সংশোধন সংসদ থেকেই করা হবে। আইনের অধীন বিধি বা নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদ সচিবালয়ের আইন বিভাগই মতামত দেবে। এতে করে বর্তমানের যে বৈপরীত্য রয়েছে তা আর থাকবেনা।
৩. জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার সংকট
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর কাজ হলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড তদারকি করা। কিন্তু যখন সংসদীয় ব্যবস্থা দুর্বল থাকে, তখন এই কমিটিগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর ফলে সরকারি অর্থের অপচয়, মেগা প্রজেক্টে দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা আড়ালে থেকে যায়। জনগণের ট্যাক্সের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার কোনো শক্তিশালী মাধ্যম অবশিষ্ট থাকে না।
৪. বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ ও রাজনৈতিক মেরুকরণ
শক্তিশালী আইনসভায় বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনা সরকারকে সঠিক পথে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু সংসদ দুর্বল হলে বিরোধী দলের কথা বলার সুযোগ সংকুচিত হয়। এর ফলে রাজপথের রাজনীতিতে সহিংসতা বাড়ে এবং সংসদে আলোচনার সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। এটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও মেরুকরণকে আরও উসকে দেয়।
৫. আমলাতন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণের অভাব
একটি শক্তিশালী সংসদে জনগণের প্রতিনিধিরা আমলাদের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করেন। কিন্তু সংসদ কার্যকর না থাকলে আমলারা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে চলে যান। এতে প্রশাসনে জনবিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা পেতে হয়রানির শিকার হন। জনমুখী প্রশাসনের বদলে ‘আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়।
৬. নীতি-নির্ধারণে জনমতের প্রতিফলন না ঘটা
গণতন্ত্রের সারমর্ম হলো জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা। কিন্তু সংসদীয় বিতর্ক যখন প্রাণহীন হয়ে পড়ে, তখন দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা বৈদেশিক নীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনমতের কোনো প্রতিফলন ঘটে না। নীতিগুলো মূলত ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে।
৭। বিচারবিভাগে আইনের শাসনের অভাবঃ
আইনসভা শক্তিশালী না হবার কারণে বিচারবিভাগের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছেনা। নির্বাহী বিভাগ কোন দেশের বিচার বিভাগের উপর হস্তক্ষেপ করাটা কোন গণতান্ত্রিক পন্থা নয়। জনগণ আইনের শাসনের সুফল পাচ্ছে কিনা, দূর্নীতিমুক্ত ও জন-বান্ধব সেবা নিশ্চিত হচ্ছে কিনা তা জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিনিধি হিসাবে একমাত্র শক্তিশালী আইনবিভাগই তা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। বা তাদের কোন সুপারিশ থাকলে তা প্রধান বিচারপতি বরাবর মহামান্য রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে প্রেরণ করতে পারে। শক্তিশালী আইনসভা ব্যতীত আইনের জনগণের আইনের শাসনের সুফল নিশিচত করা সম্ভব নয়।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে শক্তিশালী আইনসভার কোনো বিকল্প নেই। আইনসভা দুর্বল থাকার অর্থ হলো রাষ্ট্রের ফুসফুস অকেজো হয়ে থাকা। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, সংসদীয় কমিটির ক্ষমতায়ন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের মাধ্যমে যদি জাতীয় সংসদকে প্রাণবন্ত করা না যায়, তবে সুশাসন ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন একটি অলীক কল্পনা হয়েই থাকবে।