বাংলাদেশের আইনসভাঃ কাঠামোগত দূর্বলতা ও করনীয় (২)

দূর্বলতার কারণঃ ০৬টিএবং প্রতিকারের উপায়ঃ ০৫টি‍ ‍

গণতন্ত্রের তিনটি স্তম্ভ—আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ—পরস্পর ভারসাম্য রক্ষা করে চলবে, এটাই সাংবিধানিক মূলনীতি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, ক্ষমতার ভারসাম্য ক্রমশ একদিকে হেলে পড়েছে। আইনসভা, যা জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হওয়ার কথা, তা আজ নির্বাহী বিভাগের একক আধিপত্যের (Executive Dominance) নিচে চাপা পড়ে গেছে। সংসদ সদস্যরা যেখানে সরকারের ভুলত্রুটি ধরবেন, সেখানে তারা অনেক সময় সরকারের সিদ্ধান্তের কেবল সমর্থনকারী হয়ে কাজ করছেন।

আইনসভার দূর্বলতার কারণঃ

১. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ: শৃঙ্খলিত বিবেক

বাংলাদেশের আইনসভা দুর্বল হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য তার দলের সিদ্ধান্তের বাইরে সংসদে ভোট দিতে পারেন না। এমনকি দলের কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেও তার সদস্যপদ ঝুঁকির মুখে পড়ে।

  • ফলাফল: এর ফলে সংসদ সদস্যরা নিজস্ব বিচারবুদ্ধি বা জনমতের ভিত্তিতে ভোট দিতে পারেন না। নির্বাহী বিভাগ (মন্ত্রিসভা) যে বিল বা বাজেট পেশ করে, দলের সদস্যরা তা পাস করতে বাধ্য থাকেন। এতে সংসদীয় বিতর্ক কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়।

২. স্বার্থের সংঘাত

সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রিসভার সদস্যরা সংসদ থেকেই আসেন। বাংলাদেশে নির্বাহী বিভাগের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তিরা (মন্ত্রীরা) একই সাথে আইনসভার প্রভাবশালী সদস্য।

  • ফলাফল: যখন আইনসভার সদস্যরা নিজেরাই নির্বাহী বিভাগের প্রধান হন, তখন তারা নিজেদের কাজের সমালোচনা বা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে উৎসাহী হন না। এতে 'চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স' নীতিটি অকেজো হয়ে পড়ে।

৩. সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অকার্যকর ভূমিকা

তত্ত্বগতভাবে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো মন্ত্রণালয়ের কাজের তদারকি করার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই কমিটিগুলো নানা কারণে দুর্বল:

  • গবেষণার অভাব: উন্নত বিশ্বে প্রতিটি সংসদীয় কমিটির নিজস্ব বিশেষজ্ঞ প্যানেল ও রিসার্চ উইং থাকে। বাংলাদেশে কমিটির সদস্যদের কারিগরি সহায়তা দেওয়ার মতো কোনো স্বতন্ত্র কাঠামো নেই।

  • তথ্যহীনতা: এমপিদের তথ্যের জন্য সেই মন্ত্রণালয়ের আমলাদের ওপরই নির্ভর করতে হয়, যাদের কাজ তারা তদারকি করছেন। ফলে আমলারা যে তথ্য দেন, তার বাইরে গিয়ে প্রকৃত অনিয়ম খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

৪. সংসদ সচিবালয়ের পরাধীনতা ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব

আইনসভার নিজস্ব একটি শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র সচিবালয় থাকা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে সংসদ সচিবালয় কার্যত নির্বাহী বিভাগের আমলাদের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়।

  • পেশাদারিত্বের অভাব: সংসদীয় সচিবালয়ে প্রেষণে আসা আমলারা মূলত সরকারের অনুগত থাকেন। তাদের পদোন্নতি ও বদলি নির্ভর করে নির্বাহী বিভাগের ওপর। ফলে তারা সংসদীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিতে পারেন না।

  • পদমর্যাদার সংকট: নির্বাহী বিভাগের সচিবদের তুলনায় সংসদীয় সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি না করায় তারা নির্বাহী বিভাগকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস পান না।

৫. গবেষণানির্ভর রাজনীতির অনুপস্থিতি

একটি আইনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব কী হবে, তা বিশ্লেষণের জন্য যে ধরনের বৌদ্ধিক চর্চা প্রয়োজন, আমাদের সংসদে তার অভাব প্রকট।

  • ভারতের লোকসভা বা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একটি বিশাল লাইব্রেরি ও রিসার্চ উইং রয়েছে যা প্রতিটি বিলের ওপর নিরপেক্ষ 'পলিসি ব্রিফ' তৈরি করে এমপিদের দেয়।

  • বাংলাদেশে এমপিদের নিজস্ব কোনো 'রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট' বা রাষ্ট্রীয় গবেষণা সুবিধা নেই। ফলে বিল পাসের সময় তারা গভীরে না গিয়েই কেবল দলের নির্দেশে সম্মতি দেন।

৬. বাজেটে সংসদের নামমাত্র ভূমিকা

বাজেট হলো রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আর্থিক দলিল। কিন্তু বাংলাদেশে বাজেট পাসের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং সেখানে সংসদ সদস্যদের সংশোধনী দেওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। নির্বাহী বিভাগ যেভাবে বাজেট তৈরি করে, সংসদে প্রায় হুবহু তাই পাস হয়।

উত্তরণের পথ: আইনসভাকে শক্তিশালীকরণ

আইনসভাকে শক্তিশালী করতে হলে নিম্নোক্ত সংস্কারগুলো অপরিহার্য:

ক) ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কার:

অন্তত আস্থা ভোট বা বাজেট ছাড়াঅন্যান্য সাধারণ বিলের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত দেওয়ার সুযোগ দেওয়া।

খ) স্বতন্ত্র সংসদীয় ক্যাডার:

সংসদ সচিবালয়কে সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত করা এবং সেখানে বিশেষজ্ঞ গবেষক ও টেকনিক্যাল স্টাফ নিয়োগ দেওয়া। এক্ষেত্রে সংসদ সচিবালয়ে যে অর্গানোগ্রাম বা জনবল কাঠামো রয়েছে তা পুনর্বিন্যাস করে একে শক্তিশালী করা দরকার। জনবল কাঠামো বৃদ্ধির পূর্বেই সংসদ সচিবালয়ের কার্যক্রমকে আরো বিস্তৃত করতে হবে এবং একে এমনভাবে করতে হবে যেন সেখানে থেকে সকল মন্ত্রণালয়কে তত্ত্বাবধান করা যায়, এবং মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সকল আইন ও বিধিগুলো গবেষণা করে এর সুবিধা অসুবিধা চিহ্নিত করে তা সংশোধন প্রস্তাব করা যায় এবং একে কার্যকর ভাবে জনবান্ধব করে তোলা যায়।

সেক্ষেত্রে, সংসদ সচিবালয়ে যে ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি রয়েছে সেগুলো কার্যক্ষেত্র বিবেচনায় নিয়ে একে ১০- ১৫টি ডোমেইনে বিভক্ত করা যায় এবং প্রত্যেকটি বিভাগকে এককজন সচিব বা সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার পদ সৃষ্টি করে সেখানে স্বতন্ত্রভাবে কর্মকর্তা (স্বতন্ত্র সংসদ সচিবালয় ক্যাডারের মাধ্যমে) নিয়োগ দিতে হবে। বিচার বিভাগের মতই এই ক্যাডারের অফিসারদের নির্বাহী বিভাগের অফিসারদের সাথে বদলিযোগ্য করা যাবেনা। প্রত্যেকটি বিভাগের প্রধান পদে রাজনৈতিক সরকারের পলিসি প্রণয়ণ কাজের সাথে যুক্ত সাবেক আমলা/গবেষক/ সরকারী-বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদলে এটি সরকারের পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে, নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ পদোন্নতিযোগ্য হবে সর্বোচ্চ পদের নিম্ন-পদ।

গ) গবেষণা উইং স্থাপন:

প্রতিটি সংসদীয় কমিটির জন্য পৃথক রিসার্চ সেল গঠন করা, যারা নির্বাহী বিভাগের ফাইলের ভুলগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে ধরিয়ে দেবে। এছাড়াও, এই উইং স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা প্রণয়ন করবে এবং নির্বাহী বিভাগের সকল কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা করবে। সকল সংসদীয় আসনের সমস্যা চিহ্নিত করবে, সে সকল সমস্যা সমাধানে করণীয় প্রস্তাব করবে, সে আলোকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে পত্র/ডিও লেটার প্রেরণ করবে, এবং বিভিন্ন মেয়াদে সেসব এলাকার অগ্রগতি বিবেচনা করবে। এছাড়াও, এই উইং থেকে আঞ্চলিক ও জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েও কাজ করবে এবং গৃহীত পরিকল্পনার অগ্রগতি বিবেচনা করবে। আন্তর্জাতিক চুক্তির বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত পলিসি ব্রিফ এবং ক্যাবিনেটকে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক অগ্রগতি জানিয়ে বিভিন্ন সুপারিশ করবে যাতে তারা তা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।

ঘ) পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন অধিদপ্তর স্থাপনঃ

সংসদ সচিবালয়ের আওতায় একটি শক্তিশালী ও দক্ষ পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন অধিদপ্তর স্থাপন করতে হবে। এই অধিদপ্তর মন্ত্রণালয় ভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত বাজেটের কার্যকর ব্যবহার ও সর্বোচ্চ আউটপুট নিশ্চিত হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ ও মুল্যায়ন করবে এবং গ্রেডভিত্তিক তালিকা প্রকাশ করবে। এছাড়া এই অধিদপ্তর মাসিক পলিসি ব্রিফ এর আয়োজন করবে যাতে সরকারের কাজের জন্য জনগণ নিয়মিত জানতে পারে। এর মাধ্যমে জনগণের নিকট জবাবদিহিতার কালচার চালু হবে এবং সুশাসন নিশ্চিত হবে।

ঙ) পদমর্যাদা বৃদ্ধি:

সংসদীয় সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা নির্বাহী সচিবদের উপরে বা সমমান করা যাতে জবাবদিহিতা আদায়ে তারা প্রশাসনিক শক্তি পান, এবং জনগণের অধিকার আদায়ে সাংসদদের সক্রিয় সহযোগিতা করতে পারেন।

আইনসভা যদি শক্তিশালী না হয়, তবে নির্বাহী বিভাগ স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠে এবং দুর্নীতি ডালপালা মেলে। সংসদ সদস্যদের কেবল এলাকার উন্নয়ন প্রতিনিধি নয়, বরং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও পাহারাদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন সংসদ সচিবালয় এবং গবেষণা-নির্ভর সংসদীয় চর্চাই পারে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থেই কার্যকর করতে।

 
Previous
Previous

আইনসভার কাঠামোগত দূর্বলতা: যে ০৭টি অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি গণতন্ত্র ও জনগণ (৩)

Next
Next

গণতন্ত্র - মানবিক অধিকারের স্বীকৃতির এক ‘অনন্য’ মতবাদঃ জন্ম ও বিকাশ (১)