গণতন্ত্রের বিকাশে শক্তিশালী আইনসভার অপরিহার্য কেন? (৪)

গণতন্ত্র কেবল ভোটদানের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি নিরন্তর জবাবদিহিতার ব্যবস্থা। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক মঁতেস্কু (Montesquieu) তার ‘The Spirit of the Laws’ গ্রন্থে ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতির (Separation of Powers) ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তার মতে, রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগ—আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ—পরস্পর থেকে স্বাধীন থাকা বাঞ্ছনীয়। এর মধ্যে আইনসভা হলো জনগণের কণ্ঠস্বর, যা নির্বাহী বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে গণতন্ত্রকে স্বৈরতন্ত্রে রূপান্তর হওয়া থেকে রক্ষা করে।

০৫টি উল্লেখযোগ্য কারণঃ

১. ক্ষমতার ভারসাম্য ও চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স

শক্তিশালী আইনসভার প্রধান কাজ হলো নির্বাহী বিভাগ বা সরকারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill) তার ‘Considerations on Representative Government’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, আইনসভার কাজ কেবল আইন তৈরি করা নয়, বরং সরকারের প্রতিটি কাজকে জনসমক্ষে নিয়ে আসা এবং সমালোচনা করা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের কথা ধরা যেতে পারে। সেখানে রাষ্ট্রপতির অনেক সিদ্ধান্ত বা বাজেট পাসের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। এটি শাসন বিভাগকে একনায়কতান্ত্রিক হতে বাধা দেয়।

২. জবাবদিহিতা ও সংসদীয় কমিটি

সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার প্রধান ও মন্ত্রিসভাকে তাদের প্রতিটি কাজের জন্য আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হয়। শক্তিশালী আইনসভায় সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো অত্যন্ত সক্রিয় থাকে, যা আমলাতন্ত্র এবং মন্ত্রণালয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ওয়াল্টার ব্যাজেহট (Walter Bagehot) আইনসভার 'Informational' এবং 'Supervisory' ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, সংসদ যদি সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে, তবে সুশাসন বাধাগ্রস্ত হয়।

৩. অন্তর্ভুক্তিমূলক আইন প্রণয়ন ও জনমত

আইনসভা হলো এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে সমাজের বিভিন্ন মতাদর্শ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকেন। শক্তিশালী আইনসভায় যে কোনো বিল পাসের আগে ব্যাপক বিতর্ক ও জনশুনানি হয়। এর ফলে আইনগুলো কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছায় নয়, বরং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়।

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর (যেমন: নরওয়ে বা সুইডেন) আইনসভাগুলোতে অত্যন্ত গঠনমূলক বিতর্ক হয়, যার ফলে তাদের পাস করা আইনগুলো দীর্ঘমেয়াদে জনকল্যাণকর হয়।

৪. বাজেট ও জাতীয় অর্থের সুরক্ষা

‘No taxation without representation’—এই নীতির ভিত্তিতেই আধুনিক গণতন্ত্রের জন্ম। জনগণের ট্যাক্সের টাকা সরকার কোথায় এবং কীভাবে খরচ করবে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা একমাত্র শক্তিশালী আইনসভারই থাকে। আইনসভা দুর্বল হলে মেগা প্রজেক্টের নামে দুর্নীতি ও অর্থের অপচয় বৃদ্ধি পায়।

৫. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিরোধীদের অংশগ্রহণ

একটি শক্তিশালী আইনসভা বিরোধী দলকে রাজপথের পরিবর্তে সংসদীয় বিতর্কে অংশ নিতে উৎসাহিত করে। যখন বিরোধী দল সংসদে কথা বলার সুযোগ পায়, তখন রাজনৈতিক অসন্তোষ কমে এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকশিত হয়। লিজফার্ট (Arend Lijphart) তার ‘Consensus Democracy’ মডেলে উল্লেখ করেছেন যে, সংসদীয় বিতর্কে সকল পক্ষের অংশগ্রহণ রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষা করে।

পরিশেষে, শক্তিশালী আইনসভা ছাড়া গণতন্ত্র একটি খোলস মাত্র। এটি নাগরিক অধিকারের প্রহরী এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে টেকসই উন্নয়নের জন্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রোধে আইনসভাকে কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জায়গা থেকে বের করে একটি কার্যকর তদারকি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সময়ের দাবি।

Previous
Previous

পাঠ্য তালিকাঃ স্বতন্ত্র ও জবাবদিহিতার ক্ষমতাসম্পন্ন আইনসভা (৫)

Next
Next

আইনসভার কাঠামোগত দূর্বলতা: যে ০৭টি অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি গণতন্ত্র ও জনগণ (৩)