Book Review:Understanding Public Policy (6)

থমাস আর. ডাই (Thomas R. Dye) এর "Understanding Public Policy" (to download or to read) বইটি জননীতির শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আকর গ্রন্থ বা 'বাইবেল' হিসেবে বিবেচিত। নিচে বইটির একটি সংক্ষিপ্ত এবং সারগর্ভ বুক রিভিউ দেওয়া হলো:

মূল বিষয়বস্তু

বইটির মূল উদ্দেশ্য হলো—জননীতি কী, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ এবং এর প্রভাব কী, তা সহজবোধ্যভাবে ব্যাখ্যা করা। ডাই-এর মতে, জননীতি হলো "সরকার কী করার সিদ্ধান্ত নেয় বা নেয় না (Whatever governments choose to do or not to do)"। এই সহজ সংজ্ঞার ওপর ভিত্তি করেই পুরো বইটি আবর্তিত হয়েছে।


প্রধান আকর্ষণ: পলিসি মডেলসমূহ

এই বইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো জননীতি বিশ্লেষণের জন্য বিভিন্ন মডেল বা ফ্রেমওয়ার্কের উপস্থাপনা। ডাই দেখিয়েছেন যে, নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ফল। বইটিতে আলোচিত উল্লেখযোগ্য মডেলগুলো হলো:

  • এলিট থিওরি (Elite Theory): নীতি কেবল উচ্চবিত্ত বা প্রভাবশালী শ্রেণির ইচ্ছার প্রতিফলন।

  • গ্রুপ থিওরি (Group Theory): বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর মধ্যে ভারসাম্যের ফল হলো নীতি।

  • ইনস্টিটিউশনাল মডেল (Institutionalism): সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাঠামো কীভাবে নীতি নির্ধারণ করে।

  • র‍্যাশনালিজম (Rationalism): সর্বোচ্চ সামাজিক লাভের জন্য বিজ্ঞানসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

  • ইনক্রিমেন্টালিজম (Incrementalism): বিদ্যমান নীতির সামান্য পরিবর্তন বা সংযোজন।


বইটির গঠনশৈলী

বইটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে নীতি বিশ্লেষণের তাত্ত্বিক মডেলগুলো আলোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় অংশে এই মডেলগুলোকে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে দেখানো হয়েছে। এতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক নীতির মতো বিষয়গুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে বাস্তব উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। যদিও উদাহরণগুলো মূলত পশ্চিমকেন্দ্রিক, কিন্তু এর তাত্ত্বিক কাঠামোটি যেকোনো দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় প্রয়োগযোগ্য।

সবল দিক

  • সহজবোধ্য ভাষা: ডাই অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় জটিল তাত্ত্বিক বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেছেন, যা নতুন গবেষক বা শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক।

  • কাঠামোগত বিশ্লেষণ: এটি পাঠককে কেবল নীতি জানায় না, বরং একটি নীতিকে কীভাবে 'অ্যানালাইসিস' করতে হয় সেই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দেয়।

  • নিরপেক্ষতা: লেখক কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ চাপিয়ে না দিয়ে বিভিন্ন মডেলের সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা উভয়ই তুলে ধরেছেন।

সীমাবদ্ধতা

বইটির একটি প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো এর উদাহরণগুলো মূলত আমেরিকান শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে লেখা। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনন্য প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ বা রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন এখানে সরাসরি পাওয়া যায় না।

যারা প্রশাসনিক কাঠামো, নীতি নির্ধারণের নেপথ্যের শক্তি এবং সরকারি সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা বুঝতে চান, তাদের জন্য "Understanding Public Policy" একটি অপরিহার্য পাঠ। এটি কেবল একটি পাঠ্যবই নয়, বরং জননীতিকে একটি বৈজ্ঞানিক ডিসিপ্লিন হিসেবে চেনার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।

থমাস আর. ডাই (Thomas R. Dye) তাঁর বইতে জননীতি বা পাবলিক পলিসি বিশ্লেষণের জন্য মূলত আটটি প্রধান ফ্রেমওয়ার্ক বা মডেল বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, কোনো একক মডেল সম্পূর্ণ নয়; বরং প্রতিটি মডেল আমাদের সরকারি কর্মকাণ্ডকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে সাহায্য করে।

নিচে ডাই-এর আলোচিত কাঠামোগত ফ্রেমওয়ার্কগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

১. প্রাতিষ্ঠানিক মডেল (Institutionalism)

এই ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, জননীতি হলো সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম।

  • মূল কথা: নীতি ততক্ষণ পর্যন্ত 'পাবলিক পলিসি' হয় না, যতক্ষণ না সেটি কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গৃহীত ও বাস্তবায়িত হয়।

  • গুরুত্ব: সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নীতিকে তিনটি সুবিধা দেয়—আইনি বৈধতা (Legitimacy), সার্বজনীনতা (Universality) এবং জবরদস্তিমূলক ক্ষমতা (Coercion)।


২. প্রক্রিয়া মডেল (Process Model)

এখানে নীতিকে একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখা হয়। এটি মূলত 'পলিসি সাইকেল' বা নীতি চক্রের ওপর ভিত্তি করে গঠিত:

  • ধাপগুলো: সমস্যা চিহ্নিতকরণ $\rightarrow$ এজেন্ডা সেটিং $\rightarrow$ নীতি প্রণয়ন $\rightarrow$ বৈধতা প্রদান $\rightarrow$ বাস্তবায়ন $\rightarrow$ মূল্যায়ন।


৩. গ্রুপ থিওরি বা গোষ্ঠী তত্ত্ব (Group Theory)

এই মডেলে নীতিকে দেখা হয় বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর (Interest Groups) মধ্যেকার ভারসাম্যের ফলাফল হিসেবে।

  • মূল কথা: রাজনীতি হলো গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে লড়াই। যখন কোনো একটি গোষ্ঠী শক্তিশালী হয়ে ওঠে, নীতি তখন সেই গোষ্ঠীর অনুকূলে চলে যায়। সরকারের কাজ এখানে অনেকটা 'আম্পায়ার'-এর মতো, যারা ভারসাম্য রক্ষা করে।


৪. এলিট মডেল বা উচ্চবিত্ত তত্ত্ব (Elite Theory)

এটি ডাই-এর আলোচিত অন্যতম প্রভাবশালী মডেল।

  • মূল কথা: জননীতি জনগণের ইচ্ছা নয়, বরং শাসক শ্রেণি বা 'এলিট'দের পছন্দ ও মূল্যবোধের প্রতিফলন।

  • প্রক্রিয়া: নীতি ওপর থেকে নিচে (Top-down) প্রবাহিত হয়। সাধারণ জনগণ নিষ্ক্রিয় থাকে এবং এলিটরা তাদের নিজেদের স্বার্থ ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য নীতি তৈরি করে।


৫. র‍্যাশনাল মডেল বা যৌক্তিক মডেল (Rationalism)

এই মডেলটি সর্বোচ্চ সামাজিক লাভ (Maximum Social Gain) অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেয়।

  • মূল কথা: একটি নীতি তখনই 'র‍্যাশনাল' যখন তার সুফল (Benefits) এর খরচের (Costs) চেয়ে অনেক বেশি হবে।

  • চ্যালেঞ্জ: ডাই স্বীকার করেছেন যে, সব তথ্য পাওয়া এবং সব বিকল্পের প্রভাব আগে থেকে জানা কঠিন বলে বাস্তবে এটি প্রয়োগ করা জটিল।


৬. ইনক্রিমেন্টাল মডেল (Incrementalism)

এটি র‍্যাশনাল মডেলের ঠিক বিপরীত এবং বাস্তবসম্মত একটি পদ্ধতি।

  • মূল কথা: নতুন নীতি মানেই আমূল পরিবর্তন নয়, বরং বর্তমান নীতির সামান্য পরিবর্তন বা সংযোজন।

  • যুক্তি: নীতিনির্ধারকরা অতীতের পরীক্ষিত নীতিকেই নিরাপদ মনে করেন এবং বড় কোনো ঝুঁকি না নিয়ে ধাপে ধাপে এগোতে পছন্দ করেন।


৭. গেম থিওরি (Game Theory)

এই ফ্রেমওয়ার্কটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে 'কৌশল' বা 'স্ট্র্যাটেজি'র ওপর গুরুত্ব দেয়।

  • মূল কথা: যখন দুজন নীতিনির্ধারক বা পক্ষ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তখন একজনের সিদ্ধান্ত অন্যজনের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। এটি মূলত জাতীয় নিরাপত্তা বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হয়।


৮. পাবলিক চয়েস মডেল (Public Choice Theory)

এটি রাজনীতির একটি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ।

  • মূল কথা: নীতিনির্ধারক, আমলা এবং ভোটাররা সবাই ব্যক্তিগত স্বার্থ দ্বারা চালিত হন। প্রত্যেকেই চান নিজের সুবিধা সর্বোচ্চ করতে। সুতরাং, জননীতি হলো রাজনৈতিক বাজারে বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বার্থের পারস্পরিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ার ফল।


আপনার জন্য বিশেষ পর্যবেক্ষণ:

আপনি যদি সিভিল সার্ভিস সংস্কার বা মাঠ প্রশাসনের দক্ষতা নিয়ে কাজ করেন, তবে ইনস্টিটিউশনাল মডেল এবং প্রক্রিয়া মডেল আপনার জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। আর যদি নীতিনির্ধারণের নেপথ্যের শক্তিগুলো বুঝতে চান, তবে এলিট থিওরি এবং গ্রুপ থিওরি চমৎকার বিশ্লেষণ প্রদান করে।

Next
Next

Book Review: Public Policy: Concepts, Politics, and Analysis (5)