10. How Democracies Die (Book review)

স্টিভেন লেভিটস্কি (Steven Levitsky) এবং ড্যানিয়েল জিব্ল্যাট (Daniel Ziblatt)-এর লেখা "How Democracies Die" (২০১৮) বর্তমান সময়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম আলোচিত বই। আধুনিক যুগে গণতন্ত্র কীভাবে সামরিক ক্যু বা রক্তক্ষয়ী বিপ্লব ছাড়াই তিলে তিলে ধ্বংস হয়ে যায়, তা এই বইটির মূল উপজীব্য।

একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে এই বইটি আপনার জন্য এক সতর্কবার্তা এবং একই সাথে গণতন্ত্র রক্ষার দিকনির্দেশনা।

১. সূচিপত্র (Table of Contents)

১. The Fateful Alliance: রাজনৈতিক দলগুলোর ভুল জোট ও স্বৈরাচারের প্রবেশ পথ।

২. Gatekeeping in America: রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে সম্ভাব্য স্বৈরাচারীদের আটকে দেয়।

৩. The Great Abdication: দলগুলোর নীতি বিসর্জন ও স্বৈরাচারকে মেনে নেওয়া।

৪. Subverting Democracy: আইন মেনেও কীভাবে গণতন্ত্র ধ্বংস করা যায়।

৫. The Guardrails of Democracy: গণতন্ত্রের অদৃশ্য রক্ষাকবচসমূহ।

৬. The Unwritten Rules: অলিথিত নিয়মগুলোর গুরুত্ব।

৭. The Crisis of Neutrality: নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ।

২. অধ্যায়ভিত্তিক সামারি (Chapter-wise Summary)

স্টিভেন লেভিটস্কি এবং ড্যানিয়েল জিব্ল্যাটের "How Democracies Die" বইটি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি কালজয়ী বিশ্লেষণ। ৯টি অধ্যায়ে বিভক্ত এই বইটিতে লেখকরা দেখিয়েছেন কীভাবে গণতান্ত্রিক নিয়ম মেনেই গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়।

নিচে প্রতিটি অধ্যায়ের বিস্তারিত সামারি দেওয়া হলো:

অধ্যায় ১: নিয়তি নির্ধারিত জোট (The Fateful Alliance)

এই অধ্যায়ে লেখকরা আলোচনা করেছেন কীভাবে স্বৈরাচারী মানসিকতার নেতারা মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

  • মূল বক্তব্য: স্বৈরাচারীরা সাধারণত এককভাবে ক্ষমতায় আসতে পারে না। তারা মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জোট বাঁধে।

  • শিক্ষা: যখন প্রতিষ্ঠিত দলগুলো মনে করে তারা একজন জনতুষ্টিবাদী (Populist) নেতাকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় যাবে এবং পরে তাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, তখন তারা ভুল করে। উল্টো সেই নেতাই দলকে গিলে ফেলে।

অধ্যায় ২: আমেরিকায় গেটকিপিং (Gatekeeping in America)

এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর 'প্রহরী' বা গেটকিপার হিসেবে ভূমিকার কথা বলা হয়েছে।

  • মূল বক্তব্য: দলগুলোর কাজ হলো উগ্রবাদী বা অগণতান্ত্রিক মানসিকতার নেতাদের মনোনয়ন না দেওয়া।

  • শিক্ষা: আমেরিকার ইতিহাসে দেখা গেছে, দলগুলোর অভ্যন্তরীণ শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে অনেক সম্ভাব্য স্বৈরাচারী নেতা আগে ছিটকে পড়েছেন। কিন্তু আধুনিক যুগে সেই গেটকিপিং ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

অধ্যায় ৩: মহাত্যাগ (The Great Abdication)

এই অধ্যায়ে দেখা যায় কীভাবে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নীতি বিসর্জন দিয়ে একজন স্বৈরাচারী নেতার অনুগত হয়ে পড়ে।

  • মূল বক্তব্য: দল যখন ব্যক্তির চেয়ে দুর্বল হয়ে যায়, তখন নেতারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে স্বৈরাচারের প্রতিটি অন্যায়কে বৈধতা দিতে শুরু করে। একেই লেখকরা 'বিশাল আত্মসমর্পণ' বা 'Abdication' বলেছেন।

অধ্যায় ৪: গণতন্ত্রের অবক্ষয় (Subverting Democracy)

এটি বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যেখানে Autocratic Legalism-এর ধারণা দেওয়া হয়েছে।

  • মূল বক্তব্য: আধুনিক স্বৈরাচারীরা সংবিধান পোড়ায় না, বরং সংবিধানের প্রতিটি শব্দ মেনে তারা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে।

  • প্রক্রিয়া: তারা 'রেফারি' বা বিচার বিভাগকে নিজেদের লোক দিয়ে পূর্ণ করে এবং আইনের দোহাই দিয়ে প্রতিপক্ষকে দমন করে।

অধ্যায় ৫: গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ (The Guardrails of Democracy)

সংবিধানই কি গণতন্ত্র রক্ষার জন্য যথেষ্ট? এই অধ্যায় বলছে—না।

  • মূল বক্তব্য: বিশ্বের অনেক দেশে চমৎকার সংবিধান থাকা সত্ত্বেও স্বৈরতন্ত্র এসেছে। কারণ গণতন্ত্র কেবল লিখিত আইনের ওপর নয়, বরং দুটি অলিখিত নিয়মের ওপর টিকে থাকে:

    1. Mutual Toleration (পারস্পরিক সহনশীলতা) 2. Institutional Forbearance (প্রাতিষ্ঠানিক সংযম)

অধ্যায় ৬: অলিখিত নিয়মসমূহ (The Unwritten Rules)

এখানে পূর্ববর্তী অধ্যায়ের অলিখিত নিয়ম দুটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

  • পারস্পরিক সহনশীলতা: প্রতিপক্ষকে দেশদ্রোহী বা শত্রু মনে না করে তাদের বৈধ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে শ্রদ্ধা করা।

  • প্রাতিষ্ঠানিক সংযম: আইনত ক্ষমতা থাকলেও প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করতে সেই ক্ষমতার চরম ব্যবহার না করা।

অধ্যায় ৭: নিরপেক্ষতার সংকট (The Crisis of Neutrality)

এই অধ্যায়ে দেখানো হয়েছে কীভাবে নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করা হয়।

  • মূল বক্তব্য: যখন পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং আদালত সরকারের 'অস্ত্র' হিসেবে কাজ শুরু করে, তখন সাধারণ মানুষের আর আশ্রয়ের জায়গা থাকে না। নিরপেক্ষতা হারিয়ে গেলে গণতন্ত্রের মৃত্যু অনিবার্য হয়ে ওঠে।

অধ্যায় ৮: বিভাজন ও মেরুকরণ (Polarization)

রাজনীতিতে চরম বিভক্তি কীভাবে গণতন্ত্রকে কুরে কুরে খায়, তা এখানে আলোচিত।

  • মূল বক্তব্য: সমাজ যখন জাতিগত, ধর্মীয় বা আদর্শগতভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, তখন মানুষ সত্য-মিথ্যার চেয়ে দলের জয়কে বড় করে দেখে। এই মেরুকরণই স্বৈরাচারীকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেয়।

অধ্যায় ৯: গণতন্ত্র বাঁচানোর পথ (Saving Democracy)

শেষ অধ্যায়ে লেখকরা সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেছেন।

  • মূল বক্তব্য: গণতন্ত্র বাঁচাতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে আবার গেটকিপিং শুরু করতে হবে এবং সামাজিক মেরুকরণ কমাতে হবে। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনাই হলো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একমাত্র পথ।

সার্বিক বিশ্লেষণ:

বইটির মূল শিক্ষা হলো—গণতন্ত্র একটি ভঙ্গুর কাঁচের মতো। এটি কেবল কাগজের সংবিধান দিয়ে বাঁচে না; এটি বেঁচে থাকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধৈর্য, সহনশীলতা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর।

একজন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আপনি অধ্যায় ৪ ও ৭-এর 'নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান' এবং 'আইনী কারসাজি' (Legal subversion) অংশগুলো পড়লে বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির এক চমৎকার চিত্র খুঁজে পাবেন।

৩. সার্বিক সামারি (Executive Summary)

বইটির মূল সারমর্ম হলো—গণতন্ত্র ধ্বংস করার জন্য এখন আর সংবিধান স্থগিত করার প্রয়োজন হয় না। নির্বাচিত শাসকরাই সংবিধানের প্রতিটি শব্দ মেনে এবং সংসদের দোহাই দিয়ে ধাপে ধাপে গণতন্ত্রকে অকার্যকর করে ফেলে। যখন রাজনীতিতে 'পারস্পরিক শ্রদ্ধা' হারিয়ে যায় এবং দলগুলো একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করে, তখনই সেই দেশে গণতন্ত্রের অন্তিম সময় শুরু হয়।

৪. গুরুত্বপূর্ণ কোটেশন (Key Quotations)

১. গণতন্ত্রের মৃত্যু নিয়ে:

"Democracies may die at the hands not of generals, but of elected leaders—presidents or prime ministers who subvert the very process that brought them to power."

(গণতন্ত্র এখন আর জেনারেলদের হাতে মরে না, বরং মরে নির্বাচিত নেতাদের হাতে—সেসব প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী যারা সেই প্রক্রিয়াকেই ধ্বংস করে দেন যা তাদের ক্ষমতায় এনেছিল।)

২. গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ নিয়ে:

"Institutions alone are not enough to rein in would-be autocrats. Constitutions must be defended by political parties and organized citizens, but also by democratic norms."

(শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠান দিয়ে হবু স্বৈরাচারীদের ঠেকানো যায় না। সংবিধানকে রক্ষা করতে হয় রাজনৈতিক দল, সচেতন নাগরিক এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতির মাধ্যমে।)

৩. অলিখিত নিয়ম নিয়ে:

"Democracy’s unwritten rules—mutual toleration and institutional forbearance—are the guardrails of our system."

(গণতন্ত্রের অলিখিত নিয়ম—পারস্পরিক সহনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংযমই হলো আমাদের শাসনব্যবস্থার রক্ষাকবচ।)

৫. ১০টি গুরুত্বপূর্ণ কি-ওয়ার্ড (Key Terms)

১. Democratic Backsliding: একটি গণতান্ত্রিক দেশ যখন ধীরে ধীরে স্বৈরতন্ত্রের দিকে পিছিয়ে যায়।

২. Gatekeeping: রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে উগ্রবাদী নেতাদের মূল রাজনীতিতে আসা ঠেকানো।

৩. Mutual Toleration: বিরোধী দলকে বৈধ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মেনে নেওয়া এবং তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন না তোলা।

৪. Institutional Forbearance: আইনত ক্ষমতা থাকলেও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে তার অপপ্রয়োগ না করা।

৫. Capturing the Referees: বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশনের মতো নিরপেক্ষ সংস্থাকে দলীয়করণ করা।

৬. Buying off Opponents: ব্যবসায়িক সুবিধা বা ভয় দেখিয়ে বিরোধী পক্ষকে চুপ করিয়ে দেওয়া।

৭. Changing the Rules of the Game: নিজেদের আজীবন ক্ষমতায় রাখার জন্য সংবিধান বা নির্বাচনী আইন বদলে ফেলা।

৮. Polarization: সমাজের মানুষের মধ্যে চরম বিভক্তি যা গণতন্ত্রের জন্য বিষস্বরূপ।

৯. Autocratic Legalism: আইনের দোহাই দিয়ে এবং আইনি পথেই স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা।

১০. Fateful Alliance: মূলধারার নেতাদের সাথে জনতুষ্টিবাদী বা স্বৈরাচারী নেতাদের সুবিধাবাদী জোট।

নেতা হিসেবে আপনার জন্য বিশেষ লেসন:

আপনি যখন জনগণের সামনে দাঁড়াবেন, এই বইয়ের রেফারেন্স দিয়ে বলতে পারেন:

"আমাদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র কেবল সংবিধানে থাকে না, এটি থাকে আমাদের আচরণে। আমরা যদি আমাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে 'শত্রু' মনে করি এবং সব প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাই, তবে আমরাই অজান্তে গণতন্ত্রকে হত্যা করছি। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে এমন এক রাজনীতি যেখানে Mutual Toleration বা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে।"

ব্যালট বক্সের আড়ালে গণতন্ত্রের মৃত্যু: আধুনিক স্বৈরতন্ত্রের স্বরূপ ও বিবর্তন

স্টিভেন লেভিটস্কি এবং ড্যানিয়েল জিব্ল্যাটের "How Democracies Die" বইটির মূল তত্ত্বের আলোকে গণতন্ত্রের অবক্ষয় ও মৃত্যুর কারণ নিয়ে একটি প্রবন্ধ নিচে তুলে ধরা হলো। এটি আপনার রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে গঠনমূলক রূপ দিতে সাহায্য করবে।

ঐতিহাসিকভাবে আমরা জানি, গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটে ট্যাঙ্ক, সামরিক অভ্যুত্থান বা রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের মাধ্যমে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্রের পতনের ধরণ আমূল বদলে গেছে। আধুনিক যুগে গণতন্ত্র আর কামানের গোলায় ধ্বংস হয় না; বরং এটি ধ্বংস হয় নির্বাচিত নেতাদের হাতে, ধাপে ধাপে, অত্যন্ত সুচারুভাবে আইনের মোড়কে। স্টিভেন লেভিটস্কি এবং ড্যানিয়েল জিব্ল্যাটের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, বর্তমানের স্বৈরাচারীরা সংবিধান স্থগিত করে না, বরং সংবিধানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে গণতন্ত্রকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়।

গণতন্ত্রের মৃত্যুর প্রধান কারণসমূহ

বইটির আলোকে গণতন্ত্রের পতনের পেছনে মূলত তিনটি গভীর সংকট কাজ করে:

১. রাজনৈতিক গেটকিপিংয়ের ব্যর্থতা (Failure of Gatekeeping): গণতন্ত্রের প্রাথমিক রক্ষাকবচ হলো রাজনৈতিক দল। যখন মূলধারার দলগুলো ক্ষমতার লোভে কোনো জনতুষ্টিবাদী (Populist) বা চরমপন্থী নেতাকে প্রশ্রয় দেয় বা মনোনয়ন দেয়, তখন স্বৈরতন্ত্রের বীজ বপন করা হয়। দলগুলো যখন তাদের ফিল্টারিং ক্ষমতা হারায়, তখন গণতন্ত্র অরক্ষিত হয়ে পড়ে।

২. চরম মেরুকরণ (Extreme Polarization): যখন একটি সমাজ বা রাজনীতি 'আমরা বনাম ওরা'—এই দুই ভাগে চরমভাবে বিভক্ত হয়ে যায়, তখন গণতন্ত্র সংকটে পড়ে। এই অবস্থায় মানুষ মনে করে, "আমার প্রতিপক্ষ জয়ী হওয়া মানে দেশের ধ্বংস।" এই ভীতি থেকে মানুষ নিজের দলের নেতার স্বৈরাচারী আচরণকেও সমর্থন করতে শুরু করে।

৩. অলিখিত নিয়মের ভাঙন (Erosion of Norms): গণতন্ত্র কেবল লিখিত সংবিধান দিয়ে চলে না। এর জন্য দুটি অদৃশ্য রক্ষাকবচ প্রয়োজন—পারস্পরিক সহনশীলতা (বিরোধী দলকে শত্রু মনে না করা) এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংযম (ক্ষমতা থাকলেও তার অপপ্রয়োগ না করা)। যখন নেতারা এই অলিখিত নিয়মগুলো ভাঙতে শুরু করেন, তখন সংবিধান হয়ে পড়ে এক প্রাণহীন কাগজ।

গণতন্ত্র ধ্বংসের ধাপসমূহ (The Stages of Decay)

লেভিটস্কি ও জিব্ল্যাট গণতন্ত্রের মৃত্যুকে একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেখিয়েছেন:

ধাপ ১: রেফারিদের কব্জা করা (Capturing the Referees)

স্বৈরাচারী শাসক ক্ষমতায় এসে প্রথমেই বিচার বিভাগ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং নির্বাচন কমিশনের মতো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের অনুগত লোক বসান। একে বলা হয় 'রেফারিদের কিনে নেওয়া'। ফলে সরকারের যেকোনো অবৈধ কাজকে এই প্রতিষ্ঠানগুলো 'আইনত বৈধ' বলে সিলমোহর দেয়।

ধাপ ২: প্রতিপক্ষকে কেনা বা দমন (Buying off or Bullying Opponents)

শাসকগোষ্ঠী মিডিয়া মালিকদের ব্যবসায়িক সুবিধা দিয়ে বা ভয় দেখিয়ে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসে। যারা আপস করে না, তাদের কর ফাঁকি বা রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় ফাঁসানো হয়। এতে বিরোধী কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে।

ধাপ ৩: খেলার নিয়ম বদলে ফেলা (Rewriting the Rules of the Game)

যখন রেফারিরা পকেটে থাকে এবং বিরোধীরা দুর্বল হয়, তখন শাসকগোষ্ঠী সংবিধান বা নির্বাচনী আইন সংশোধন করে। তারা এমনভাবে নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণ (Gerrymandering) বা ভোটার আইন তৈরি করে যাতে ভবিষ্যতে তাদের হারার কোনো সম্ভাবনা না থাকে।

উপসংহার

গণতন্ত্রের মৃত্যু এখন আর হঠাৎ ঘটে না; এটি একটি ধীর প্রক্রিয়া। এর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, যখন গণতন্ত্র মারা যায়, তখন বাইরে থেকে দেখে মনে হয় সব ঠিক আছে—নির্বাচন হচ্ছে, সংসদ চলছে, খবরের কাগজ প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু ভেতর থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে পড়ে অন্তঃসারশূন্য।

একজন দূরদর্শী নেতার জন্য এই বইটির শিক্ষা হলো—গণতন্ত্র রক্ষা করতে হলে কেবল নির্বাচন জয় করলেই হবে না, বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অস্তিত্বকে স্বীকার করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। কারণ, প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ আজ প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করলেও কাল তা পুরো রাষ্ট্রকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।


অটোক্রেটিক লিগ্যালিজম (Autocratic Legalism) বা 'স্বৈরতান্ত্রিক বৈধতাবাদ'-এর মূল মন্ত্রই হলো "Rule by Law" (আইন দ্বারা শাসন) ব্যবহার করে "Rule of Law" (আইনের শাসন) বা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা। এটি এমন একটি কৌশল যেখানে সরকার আইন ভাঙার বদলে আইনকে নিজের সুবিধামতো পরিবর্তন করে ফেলে।

'How Democracies Die' এবং আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বাস্তব উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. হাঙ্গেরি: ভিক্টর অরবান এবং "আইনের শাসন" (The Textbook Case)

ভিক্টর অরবান এবং তার দল 'ফিদেস' (Fidesz) অটোক্রেটিক লিগ্যালিজমের সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

  • কী করেছেন: ২০১১ সালে তারা পার্লামেন্টে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে হাঙ্গেরির সংবিধান পুরোপুরি বদলে ফেলে (যাকে বলা হয় 'Fundamental Law')।

  • আইনের ব্যবহার:

    • নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ (Gerrymandering): তারা নির্বাচনী এলাকাগুলো এমনভাবে কাটছাঁট করেছিল যাতে সরকার পরিবর্তন অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি সম্পূর্ণ "আইনি" প্রক্রিয়ায় করা হয়েছিল।

    • মিডিয়া আইন: 'মিডিয়া কাউন্সিল' নামে একটি সংস্থা তৈরি করা হয় এবং এমন আইন করা হয় যাতে অসংলগ্ন বা সরকারবিরোধী তথ্যের জন্য মিডিয়াকে বিপুল জরিমানা করা যায়। ফলে বড় বড় মিডিয়াগুলো সরকারি চাপে নিজেই আত্মসমর্পন করে (Self-censorship)।

  • ফলাফল: অরবান আইন ভাঙেননি, তিনি আইন তৈরি করেছেন যা তাকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দিয়েছে।

২. ভেনেজুয়েলা: বিচার বিভাগ পকেটে নেওয়া (Packing the Court)

হুগো শাভেজ এবং পরবর্তীতে নিকোলাস মাদুরো ভেনেজুয়েলায় এই কৌশলটি নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করেন।

  • কী করেছেন: ২০০৪ সালে তারা সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের সংখ্যা ২০ থেকে বাড়িয়ে ৩২ করে। এরপর তারা নিজেদের অনুগত ১২ জন বিচারক নিয়োগ দেয়।

  • আইনের ব্যবহার: বিচার বিভাগ এখন সরকারের একটি 'রবার স্ট্যাম্প'-এ পরিণত হয়েছে। যেকোনো বিরোধী দলের নেতাকে আটক করা বা কোনো সাংবিধানিক সংশোধনীকে বৈধতা দেওয়ার প্রয়োজন হলে তারা আদালতের দ্বারস্থ হয়, এবং আদালত সেটি আইনত সঠিক বলে রায় দেয়।

  • ফলাফল: সরকার যা কিছুই করে, তা আদালতের রায়ের মাধ্যমে "আইনত বৈধ" হয়ে যায়। ফলে প্রতিবাদ করা বা আইনি লড়াই চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

৩. তুরস্ক: গণভোটের মাধ্যমে স্বৈরতন্ত্র (The Referendum Model)

রেসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান তুরস্কে আইন ও সংবিধানের পরিবর্তনের মাধ্যমেই ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছেন।

  • কী করেছেন: ২০১৭ সালে একটি সাংবিধানিক গণভোটের (Referendum) আয়োজন করা হয়। সেখানে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা বিলুপ্ত করে 'এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্সি' বা প্রেসিডেন্ট শাসিত ব্যবস্থা চালু করা হয়।

  • আইনের ব্যবহার: এই পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির হাতে আইন প্রণয়ন, বিচারক নিয়োগ এবং জরুরি অবস্থা জারির অঢেল ক্ষমতা চলে আসে। তুরস্কে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের (Anti-terror laws) এত বিস্তৃত অপব্যবহার করা হয় যে, যে কোনো সমালোচনাকে রাষ্ট্রদ্রোহ বা সন্ত্রাসবাদ হিসেবে আইনি মামলায় রূপ দেওয়া সম্ভব।

  • ফলাফল: এরদোয়ান যা করছেন তা জনগণের ভোটে ও আইনের মাধ্যমেই করছেন, কিন্তু এটি তুরস্কের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে।

৪. পোল্যান্ড: বিচার বিভাগীয় সংস্কারের নামে নিয়ন্ত্রণ (Judicial Capture)

২০১৫-২০২৩ সময়কালে পোল্যান্ডের 'ল অ্যান্ড জাস্টিস' (PiS) দল এই কৌশলে গিয়েছিল।

  • কী করেছেন: তারা একটি 'ডিসিপ্লিনারি চেম্বার' গঠন করেছিল, যার কাজ ছিল বিচারকদের কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখা। সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো রায় দিলে বা সরকারবিরোধী মনোভাব দেখালে এই চেম্বার বিচারকদের বরখাস্ত করতে পারত।

  • আইনের ব্যবহার: তারা যুক্তি দিয়েছিল যে, তারা বিচার বিভাগকে 'দুর্নীতিমুক্ত' করতে চায়। এটি একটি আপাতদৃষ্টিতে বৈধ ও ভালো আইনি উদ্যোগ হিসেবেই তারা প্রচার করেছিল।

  • ফলাফল: আদালত বা বিচার বিভাগকে এভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা সরকারের যেকোনো কর্মকাণ্ডকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। (পরবর্তীতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে এটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে)।

শিক্ষা:

এই দেশগুলোর দিকে তাকালে অটোক্রেটিক লিগ্যালিজমের একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন (Pattern) দেখতে পাবেন:

  1. আইনের অস্ত্রায়ন (Weaponization of Law): আইন এখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার নয়, বরং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার হাতিয়ার।

  2. প্রতিষ্ঠান দখল (Institutional Capture): যেকোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠান (যেমন- নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, সুপ্রিম কোর্ট) কে সরাসরি বন্ধ না করে বরং সেগুলোকে নিজেদের অনুগত লোক দিয়ে পূর্ণ করা হয়।

  3. জনতুষ্টিবাদ ও বৈধতা: এই কাজগুলো করার সময় তারা সবসময় দাবি করে যে তারা "জনগণের ম্যান্ডেট" নিয়ে কাজ করছে। তারা 'আইন' ও 'জনপ্রিয়তা'কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে।

একজন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আপনি হয়তো খেয়াল করবেন, গণতন্ত্রে "Rule of Law" মানে হলো আইনের সামনে সবাই সমান। কিন্তু অটোক্রেটিক লিগ্যালিজমে "Rule by Law" মানে হলো—আইন সরকারের নির্দেশে শাসিত বা শাসকের হাত লম্বা করার মাধ্যম।

Previous
Previous

11. The Third Wave: Democratization in the Late Twentieth Century- (S.P. Huntington)

Next
Next

9. The Treatises of Governement