গ্রন্থ সংক্ষেপ- ‘The World Economy: Historical Statistics’- বিশ্বের ২০০০ বছরের অর্থনীতির ইতিহাস (৩)

অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসন (Angus Maddison) এর "The World Economy: Historical Statistics" গ্রন্থটি কেবল একটি বই নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির গত দুই হাজার বছরের ইতিহাসের একটি পরিসংখ্যানগত মহাকাব্য। ওইসিডি (OECD) দ্বারা প্রকাশিত এই গ্রন্থটি অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ, নীতি-নির্ধারক এবং গবেষকদের জন্য একটি অপরিহার্য আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

নিচে বইটির একটি সংক্ষিপ্ত রিভিউ এবং তথ্যের সামারি তুলে ধরা হলো:

বইয়ের নাম: The World Economy: Historical Statistics

লেখক: Angus Maddison

প্রকাশক: OECD Publishing

বইটির সূচি সামারি (Table of Contents Summary)

বইটি প্রধানত তিনটি বড় অংশে বিভক্ত, যেখানে পরিসংখ্যানের পাশাপাশি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ দেওয়া হয়েছে:

  • অংশ ১: বিশ্ব অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতা (Long-term Trends in the World Economy)

    • ১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিশ্ব জিডিপি এবং মাথাপিছু আয়ের বিবর্তন।

    • জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তন।

    • ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা এবং আমেরিকার মধ্যে অর্থনৈতিক শক্তির ভারসাম্য বদলানোর ইতিহাস।

  • অংশ ২: আঞ্চলিক বিশ্লেষণ (Regional Analysis)

    • পশ্চিম ইউরোপ ও পশ্চিমা শাখা (Western Offshoots): ইউএসএ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া।

    • এশিয়া: বিশেষ করে ভারত ও চীনের প্রাচীন সমৃদ্ধি এবং পতন।

    • ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকা: ঔপনিবেশিক প্রভাব ও উন্নয়ন।

  • অংশ ৩: পরিসংখ্যানগত পরিশিষ্ট (Statistical Appendices)

    • Appendix A: জিডিপি এবং জনসংখ্যার দেশভিত্তিক ঐতিহাসিক টেবিল।

    • Appendix B: মাথাপিছু আয়ের তুলনামূলক চিত্র (গিয়ারি-খামিস ডলারে বা PPP মডেলে)।

    • Appendix C: ডাটা সোর্স এবং ক্যালকুলেশন মেথডোলজি (কীভাবে প্রাচীন ডেটা বের করা হয়েছে)।

রিভিউ:

অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসন এই বইটিতে ইতিহাসের একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ সম্পন্ন করেছেন—তা হলো কয়েক শতাব্দী আগের অর্থনীতিকে আধুনিক 'জিডিপি' (GDP) এবং 'পিপিপি' (PPP) বা ক্রয়ক্ষমতার সমতার ফ্রেমে পরিমাপ করা।

বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর 'ম্যাডিসন ডেটাবেস' তিনি দেখিয়েছেন যে, বিশ্ব অর্থনীতি সব সময় পশ্চিমকেন্দ্রিক ছিল না। বরং শিল্প বিপ্লবের আগে এশিয়া (বিশেষ করে ভারত ও চীন) ছিল বিশ্বের অর্থনৈতিক ইঞ্জিন। তাঁর এই কাজ অর্থনৈতিক ইতিহাসের প্রচলিত অনেক ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। যদিও প্রাচীন ডেটার নির্ভুলতা নিয়ে কিছু বিতর্ক আছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবণতা বোঝার জন্য এটিই এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস।

বইয়ের তথ্যের প্রধান সামারিঃ

ম্যাডিসন তাঁর পরিসংখ্যানে ১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক উত্থান-পতন বিশ্লেষণ করেছেন। প্রধান তথ্যগুলো হলো:

১. এশীয় আধিপত্য (১ খ্রি. – ১৭০০ খ্রি.)

ম্যাডিসনের তথ্যানুযায়ী, মানব ইতিহাসের দীর্ঘ সময় ধরে ভারত ও চীন ছিল বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি।

  • ভারত:১ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৩২% ছিল ভারতের দখলে। মোগল আমলের শেষ দিকে (১৭০০ খ্রি.) এটি ছিল প্রায় ২৪.৪%

  • চীন:১৭০০ থেকে ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে চীন ছিল বিশ্বের একক বৃহত্তম অর্থনীতি (বিশ্বের প্রায় ৩৩%)।

২. পশ্চিমের উত্থান ও শিল্প বিপ্লব

১৮২০ সালের পর থেকে চিত্র বদলাতে শুরু করে। শিল্প বিপ্লবের ফলে পশ্চিম ইউরোপ এবং পরবর্তীতে আমেরিকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। ম্যাডিসন দেখিয়েছেন কীভাবে 'গ্রেট ডাইভারজেন্স' (Great Divergence) বা পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে অর্থনৈতিক ব্যবধান তৈরি হয়েছিল।

৩. মাথাপিছু আয় ও জীবনযাত্রার মান

বইটিতে দেখানো হয়েছে যে, ১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১০০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী মাথাপিছু আয় প্রায় স্থির ছিল। কিন্তু ১৮২০ সালের পর থেকে প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের প্রসারে মাথাপিছু আয়ে এক বিশাল উল্লম্ফন ঘটে।

৪. মোগল ভারত বনাম ইউরোপ (একটি তুলনামূলক চিত্র)

ম্যাডিসন প্রমাণ করেছেন যে, ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে মোগল ভারতের জিডিপি সমগ্র পশ্চিম ইউরোপের সম্মিলিত জিডিপির চেয়েও বেশি ছিল। ভারতের তৎকালীন ২৪.৪% জিডিপির বিপরীতে সমগ্র ইউরোপের শেয়ার ছিল প্রায় ২৩.৩%।

বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান টেবিল (ম্যাডিসন ডেটা অনুযায়ী)

সাল (খ্রি.) ভারত (GDP %) চীন (GDP %) পশ্চিম ইউরোপ (GDP %) ইউএসএ (GDP %)
৩২.৯% ২৬.২% ১০.৮% ০.০%
১০০০ ২৮.৯% ২২.৭% ৮.৭% ০.৭%
১৫০০ ২৪.৫% ২৫.০% ১৭.৯% ০.৫%
১৭০০ (মোগল আমল) ২৪.৪% ২২.৩% ২২.৫% ০.১%
১৮২০ ১৬.০% ৩২.৯% ২৩.৬% ১.৮%
১৯৫২ ৩.৮% ৫.২% ২৬.৩% ২৮.৪%
২০০০ ৩.৫% ৭.৩% ২০.৫% ২১.০%
২০২৫ (প্রাক্কলিত) ৯.৫% - ১০.০% ১৮.৫% - ১৯.০% ১৪.০% - ১৫.০% ১৫.০% - ১৫.৫%

বইটির গুরুত্ব:

  • নীতি নির্ধারণ: এটি প্রমাণ করে যে অর্থনৈতিক ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে যেকোনো অঞ্চল ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

  • উপনিবেশবাদের প্রভাব: ভারতের জিডিপি ১৭০০ সালে ২৪.৪% থেকে ১৯৫২ সালে ৩.৮%-এ নেমে আসার পরিসংখ্যানটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝার জন্য একটি অকাট্য দলিল।

  • ভবিষ্যদ্বাণী: ম্যাডিসন তাঁর বইতে এশিয়ার (বিশেষ করে চীন ও ভারতের) পুনরায় বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, যা বর্তমানে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসনের "The World Economy: Historical Statistics" বইটির গঠন অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং এটি মূলত তথ্য-উপাত্তের একটি বিশাল ভাণ্ডার। নিচে বইটির সূচি সামারি এবং ম্যাডিসন ডাটাবেজ যাচাই করার অনলাইন লিংক দেওয়া হলো।

৫. ম্যাডিসন ডাটাবেজ (Maddison Database) অনলাইন লিংক

অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসনের মৃত্যুর পর (২০১০ সালে), গ্রোনিংজেন বিশ্ববিদ্যালয় (University of Groningen) তাঁর এই বিশাল কাজকে নিয়মিত আপডেট এবং রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য 'ম্যাডিসন প্রজেক্ট' (Maddison Project) গঠন করে। আপনি নিচের লিংকগুলো ব্যবহার করে তথ্য যাচাই করতে পারেন:

  • অফিসিয়াল ম্যাডিসন প্রজেক্ট ডাটাবেজ (MPD):

    এটিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস। এখানে ২০০ বছরেরও বেশি সময়ের ডেটা এক্সেল (Excel) ফরম্যাটে ডাউনলোড করা যায়।

    লিংক: https://www.rug.nl/ggdc/historicaldevelopment/maddison/

  • আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডাটা (Our World in Data):

    ম্যাডিসনের ডেটার ওপর ভিত্তি করে চমৎকার সব ইন্টারেক্টিভ চার্ট এবং ম্যাপ দেখার জন্য এটি সেরা সাইট। এখানে ভারত ও বিশ্বের জিডিপির ঐতিহাসিক পরিবর্তন সহজে দেখা যায়।

    লিংক: https://ourworldindata.org/economic-growth

  • OECD iLibrary (বইটির মূল কপি):

    বইটির মূল পরিসংখ্যান এবং চার্টগুলো দেখার জন্য ওইসিডি লাইব্রেরি ব্যবহার করা যায়।

    লিংক: https://www.oecd-ilibrary.org/economics/the-world-economy_9789264104143-en

৬. কীভাবে ডেটা যাচাই করবেন?

আপনি যখন Maddison Project Database (MPD) লিংকে যাবেন, তখন 'Full Data' বা 'Releases' অপশনে ক্লিক করলে একটি এক্সেল ফাইল পাবেন। সেখানে:

  • Country Code: 'IND' লিখে সার্চ করলে ভারতের ডেটা পাবেন।

  • Year: ১, ১০০০, ১৫০০, ১৬০০ বা ১৭০০ সাল সিলেক্ট করলে তৎকালীন জিডিপি বা মাথাপিছু আয় দেখতে পাবেন।

ম্যাডিসনের এই পরিসংখ্যানগুলো মূলত '১৯৯০ আন্তর্জাতিক গিয়ারি-খামিস ডলার' (International Geary-Khamis dollars) এককে পরিমাপ করা হয়েছে, যা বিভিন্ন সময়ের মুদ্রার মানকে তুলনামূলক অবস্থানে আনার একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড।

৭. রেফারেন্স:

Maddison, A. (2003). The World Economy: Historical Statistics. OECD Development Centre.

Maddison, A. (2001). The World Economy: A Millennial Perspective. OECD.

Previous
Previous

গ্রন্থ সংক্ষেপ ‘The Agrarian System of Mughal India (1556–1707)’(৪)

Next
Next

A Study of History (Arnold J. Toynbee) (বই পরিচিতি-০২)