গ্রন্থ সংক্ষেপ ‘The Agrarian System of Mughal India (1556–1707)’(৪)
ইরফান হাবিবের "The Agrarian System of Mughal India (1556–1707)" মোগল ভারতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের ওপর লেখা সবচেয়ে প্রভাবশালী গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। এটি মূলত মোগল সাম্রাজ্যের ভিত্তি—অর্থাৎ 'ভূমি ও কৃষি ব্যবস্থা'র ওপর ভিত্তি করে রচিত।
নিচে বইটির সূচিভিত্তিক সামারি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ তুলে ধরা হলো:
১. বইটির সূচিভিত্তিক সামারি (Table of Contents Summary)
বইটি প্রধানত ৮টি অধ্যায়ে এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিশিষ্টে (Appendices) বিভক্ত:
অধ্যায় ১: কৃষি উৎপাদন (Agricultural Production): মোগল ভারতের প্রধান ফসল, সেচ ব্যবস্থা এবং কৃষিজ বৈচিত্র্য।
অধ্যায় ২: কৃষি বাণিজ্য (Trade in Agricultural Produce): গ্রাম থেকে শহরে শস্যের প্রবাহ এবং বাজার ব্যবস্থা।
অধ্যায় ৩: কৃষক শ্রেণী (The Peasantry): কৃষকদের সামাজিক স্তরবিন্যাস, স্বত্বাধিকার এবং তাদের জীবনযাত্রা।
অধ্যায় ৪: জমিদার শ্রেণী (The Zamindars): জমিদারের অধিকার, দায়িত্ব এবং মোগল শাসনের সাথে তাদের সম্পর্ক।
অধ্যায় ৫: ভূমি রাজস্ব নির্ধারণ (The Land Revenue): রাজস্ব নির্ধারণের পদ্ধতি (জবতি, নসক, কানকুত) এবং এর বিবর্তন।
অধ্যায় ৬: রাজস্ব সংগ্রহ ও বন্টন (Collection and Distribution of Revenue): জাগিরদারি প্রথা এবং কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে রাজস্বের ভাগাভাগি।
অধ্যায় ৭: কৃষি সংকট (The Agrarian Crisis): অতিরিক্ত রাজস্বের চাপ, কৃষকদের পলায়ন এবং বিদ্রোহ।
অধ্যায় ৮: মোগল সাম্রাজ্যের পতন (The Collapse of the Empire): কৃষি সংকট কীভাবে সাম্রাজ্যের পতনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
২. মূল তথ্যের সামারি (Core Findings)
ইরফান হাবিব তাঁর গবেষণায় মোগল অর্থনীতির একটি স্বচ্ছ চিত্র তুলে ধরেছেন:
জাগিরদারি প্রথা (Jagirdari System): মোগল কর্মকর্তারা (মনসবদার) বেতনের পরিবর্তে নির্দিষ্ট অঞ্চলের রাজস্ব সংগ্রহের অধিকার পেতেন। কিন্তু বদলিযোগ্য (Transferable) হবার কারণে তারা কৃষকদের ওপর চরম শোষণ চালাতেন।
জমিদার বনাম রাষ্ট্র: মোগল আমলে 'জমিদার' বলতে কেবল ভূমির মালিক বোঝাত না; তারা ছিল রাষ্ট্রের সহযোগী শাসক এবং গ্রামীণ আভিজাত্য। তাদের নিজস্ব সেনাবাহিনীও থাকত।
কৃষি উদ্বৃত্ত (Agricultural Surplus): মোগল সাম্রাজ্যের বিশাল রাজকীয় জাঁকজমক এবং সেনাবাহিনী টিকে ছিল কৃষকদের উৎপাদিত 'উদ্বৃত্ত' মূল্যের ওপর, যা কর হিসেবে আদায় করা হতো।
মুদ্রা ও বাজার: মোগল আমলে রূপার মুদ্রা (Rupee) এবং তামার মুদ্রার (Dam) ব্যবহার কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণের দিকে ঠেলে দেয়, কারণ কর নগদে পরিশোধ করতে হতো।
৩. বইটির গুরুত্বপূর্ণ ও চমকপ্রদ তথ্যসমূহ
১. রাজস্বের হার: ইরফান হাবিব দেখিয়েছেন যে, মোগল শাসনামলে কৃষকদের ওপর রাজস্বের বোঝা ছিল উৎপাদিত ফসলের প্রায় ১/৩ (এক-তৃতীয়াংশ) থেকে ১/২ (অর্ধেক)।
২. কৃষক বিদ্রোহের কারণ: লেখকের মতে, মোগল সাম্রাজ্যের পতন কোনো ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত কারণে নয়, বরং 'কৃষি সংকট'-এর কারণে হয়েছিল। জাগিরদারদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে জাঠ, শিখ ও মারাঠা বিদ্রোহ দানা বাঁধে।
৩. সেচ ও প্রযুক্তি: সেই সময়ে ফারসি চাকা (Persian Wheel) এবং ক্যানাল বা খালের মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতির প্রমাণ তিনি বইটিতে দিয়েছেন।
৪. মসলিন ও নীল: কৃষি কেবল খাদ্যের জন্য ছিল না; সুতি ও নীল চাষের মাধ্যমে বিশ্ব বাজারের সাথে ভারতের গভীর সংযোগ স্থাপিত হয়েছিল।
৫. আইন-ই-আকবরি থেকে তথ্য: হাবিব তাঁর ডেটার বড় অংশ নিয়েছেন আবুল ফজলের 'আইন-ই-আকবরি' থেকে এবং তা আধুনিক অর্থনৈতিক মডেলে বিশ্লেষণ করেছেন।
৪. কেন এই বইটি গুরুত্বপূর্ণ?
মার্ক্সীয় ঘরানার ইতিহাস: ইরফান হাবিব ইতিহাসকে রাজা-বাদশাহদের কাহিনী হিসেবে না দেখে সাধারণ মানুষের শ্রম ও উৎপাদনের প্রেক্ষাপটে দেখেছেন।
অর্থনৈতিক দলিল: মোগল ভারতের কৃষি উৎপাদন এবং জনসংখ্যা বিষয়ক যে কোনো গবেষণায় এই বইটি এখনো 'বাইবেল' হিসেবে বিবেচিত।
ভারতের দারিদ্র্যের শেকড়: এটি বুঝতে সাহায্য করে কীভাবে মোগল আমলের সম্পদ এবং পরবর্তীকালে ঔপনিবেশিক শোষণ ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থাকে রূপ দিয়েছে।
রেফারেন্স:
Habib, Irfan. (1963/1999). The Agrarian System of Mughal India (1556–1707). Oxford University Press.
লেখক পরিচিতি
অধ্যাপক ইরফান হাবিব (Irfan Habib) বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জীবন্ত ইতিহাসবিদ। তিনি মূলত মোগল আমল এবং ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের ওপর তাঁর যুগান্তকারী গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত। তাঁকে 'মার্ক্সীয় ইতিহাসচর্চার' (Marxist Historiography) অন্যতম প্রধান পুরোধা মনে করা হয়।
নিচে তাঁর জীবন ও কর্মের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলো:
১. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
জন্ম: ১২ আগস্ট, ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দ।
জন্মস্থান: গুজরাট, ব্রিটিশ ভারত।
পিতা: মোহাম্মদ হাবিব (তিনি নিজেও একজন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ছিলেন)।
শিক্ষাজীবন: তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (AMU) থেকে উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করেন এবং পরবর্তীতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় (New College, Oxford) থেকে ডক্টরেট (D.Phil) ডিগ্রি লাভ করেন।
২. পেশাগত জীবন
তিনি দীর্ঘকাল আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
তিনি ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ (ICHR)-এর চেয়ারম্যান (১৯৮৬-১৯৯৩) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি আলিগড় স্কুল অফ হিস্টোরিওগ্রাফি-র অন্যতম স্তম্ভ, যারা ভারতের মধ্যযুগীয় ইতিহাসকে রাজা-বাদশাহদের ব্যক্তিগত জীবনী থেকে বের করে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছেন।
৩. ঐতিহাসিক অবদান ও গবেষণার ক্ষেত্র
ইরফান হাবিবের গবেষণার মূল বৈশিষ্ট্য হলো তথ্যের নিগূঢ় বিশ্লেষণ এবং প্রাথমিক উৎস (Primary Sources) যেমন—ফারসি পাণ্ডুলিপি, মোগল ফরমান ও প্রশাসনিক নথিপত্রের ব্যবহার।
কৃষি অর্থনীতি: তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ হলো মোগল ভারতের কৃষি ব্যবস্থা। তিনি দেখিয়েছেন যে, মোগল সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতনের মূলে ছিল কৃষি রাজস্ব এবং কৃষকদের উৎপাদনশীলতা।
প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান: মধ্যযুগীয় ভারতে প্রযুক্তির বিবর্তন (যেমন: ফারসি চাকা, টেক্সটাইল প্রযুক্তি, বারুদ) নিয়ে তাঁর গবেষণা অত্যন্ত মৌলিক।
জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা: তিনি ভারতের ইতিহাসে হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির সমন্বয় এবং ভারতের একীভূত জাতীয় সত্তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যার ঘোর বিরোধী।
৪. উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ (Major Publications)
তাঁর লেখা বইগুলো সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়:
The Agrarian System of Mughal India (1556–1707): এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ (Magnum Opus), যা ১৯৬৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়।
An Atlas of the Mughal Empire: মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিটি পরগনা ও সরকারভিত্তিক বিস্তারিত মানচিত্র সংবলিত একটি অনন্য গ্রন্থ।
Essays in Indian History: Towards a Marxist Perception: এতে তিনি ভারতীয় ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়কে মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করেছেন।
The Economic History of Medieval India: মধ্যযুগের বাজার, বাণিজ্য ও মুদ্রা ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।
A People's History of India: এটি তাঁর একটি বিশাল প্রজেক্ট, যা সাধারণ মানুষের ইতিহাস তুলে ধরার লক্ষ্যে একাধিক খণ্ডে প্রকাশিত হচ্ছে।
৫. সম্মাননা ও স্বীকৃতি
ইতিহাসে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন:
পদ্মভূষণ (২০০৫): ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অন্যতম বেসামরিক সম্মান।
যশ ভারত (২০০৬): উত্তরপ্রদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত।
ওয়াটুমুল পুরস্কার (১৯৬৮): ঐতিহাসিক গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
৬. তাঁর ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি
ইরফান হাবিব বিশ্বাস করেন যে, ইতিহাস কেবল অতীতকে জানার জন্য নয়, বরং বর্তমানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বোঝার একটি হাতিয়ার। তিনি মনে করেন, মোগলদের পতন কোনো ধর্মীয় সংঘাতের চেয়ে বরং 'কৃষি সংকট' (Agrarian Crisis) এবং অতিরিক্ত করের চাপের কারণে বেশি ত্বরান্বিত হয়েছিল।