A Study of History (Arnold J. Toynbee) (বই পরিচিতি-০২)
Download Link: Summary Book (690 Pages)
আর্নল্ড জে. টোয়েনবি (Arnold J. Toynbee) রচিত 'A Study of History' (১২ খণ্ডে সমাপ্ত) বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী এবং বিশাল এক কাজ। তিনি ইতিহাসের প্রথাগত 'জাতি-রাষ্ট্র' (Nation-state) ভিত্তিক আলোচনার পরিবর্তে 'সভ্যতা' (Civilization)-কে একক হিসেবে ধরেছেন।
১৯৩৪ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে এই খণ্ডগুলো প্রকাশিত হয়। নিচে প্রতিটি খণ্ডের নাম এবং তাদের মূল আলোচ্য বিষয় দেওয়া হলো:
| খণ্ড (Volume) | খণ্ডের নাম (Title) | প্রকাশের সাল | মূল বিষয়বস্তু |
|---|---|---|---|
| ১ (I) | Introduction | ১৯৩৪ | সভ্যতার সংজ্ঞা এবং ঐতিহাসিক এককের ধারণা। |
| ২ (II) | The Geneses of Civilizations | ১৯৩৪ | সভ্যতার জন্ম এবং 'চ্যালেঞ্জ ও রেসপন্স' তত্ত্ব। |
| ৩ (III) | The Growths of Civilizations | ১৯৩৪ | সভ্যতা কীভাবে বিকশিত হয় এবং সৃজনশীল নেতৃত্ব। |
| ৪ (IV) | The Breakdowns of Civilizations | ১৯৩৯ | সভ্যতার পতনের শুরু এবং সৃজনশীলতার অভাব। |
| ৫ (V) | The Disintegrations of Civilizations | ১৯৩৯ | সামাজিক বিভাজন এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা। |
| ৬ (VI) | The Disintegrations of Civilizations | ১৯৩৯ | পতন প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় অংশ (সার্বজনীন চার্চের ভূমিকা)। |
| ৭ (VII) | Universal States & Universal Churches | ১৯৫৪ | বিশাল সাম্রাজ্য গঠন এবং ধর্মের উত্থান। |
| ৮ (VIII) | Heroic Ages & Contacts between Civilizations | ১৯৫৪ | বীরত্বগাথা এবং বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যকার সংঘাত। |
| ৯ (IX) | Contacts between Civilizations in Space & Time | ১৯৫৪ | আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার সাথে অন্য সভ্যতার সম্পর্ক। |
| ১০ (X) | The Inspirations of Historians | ১৯৫৪ | ইতিহাসবিদদের কাজের উৎস এবং পদ্ধতিগত আলোচনা। |
| ১১ (XI) | Historical Atlas and Gazetteer | ১৯৫৯ | ঐতিহাসিক মানচিত্র এবং ভৌগোলিক নির্দেশিকা। |
| ১২ (XII) | Reconsiderations | ১৯৬১ | টোয়েনবির নিজের কাজের ওপর সমালোচনা ও পুনর্বিবেচনা। |
আপনার বুক ক্লাবের জন্য এই বিশাল গ্রন্থের একটি অধ্যায়ভিত্তিক (থিম্যাটিক) সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো:
১. সভ্যতার একক ও সংজ্ঞা (The Unit of Historical Study)
টোয়েনবি যুক্তি দেন যে, ইতিহাস বুঝতে হলে কোনো নির্দিষ্ট দেশ (যেমন- ভারত বা ইংল্যান্ড) নিয়ে পড়লে হবে না; বরং পুরো 'সভ্যতা'কে একটি ইউনিট হিসেবে দেখতে হবে। তিনি সারা বিশ্বে মোট ২১টি (পরবর্তীতে ২৬টি) পূর্ণাঙ্গ সভ্যতা চিহ্নিত করেছেন।
মূল কথা: সভ্যতাগুলো একটি জৈবিক প্রক্রিয়ার মতো—তাদের জন্ম, বৃদ্ধি, পূর্ণতা এবং মৃত্যু আছে।
২. চ্যালেঞ্জ এবং রেসপন্স (Challenge and Response)
এটি টোয়েনবির দর্শনের সবচেয়ে বিখ্যাত অংশ। তিনি মনে করেন, একটি সভ্যতা কেন গড়ে ওঠে? যখন কোনো সমাজ একটি কঠিন 'চ্যালেঞ্জ' বা সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং সফলভাবে তার 'রেসপন্স' বা উত্তর দেয়।
ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ: যেমন নীল নদের বন্যা সামলাতে গিয়ে মিশরীয় সভ্যতার জন্ম।
সামাজিক চ্যালেঞ্জ: কোনো বাহ্যিক আক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলা করা।
বুক ক্লাব নোট: যদি চ্যালেঞ্জ খুব সহজ হয়, তবে সমাজ অলস হয়ে পড়ে। আবার চ্যালেঞ্জ যদি অতি কঠিন হয়, তবে সমাজ ধ্বংস হয়ে যায়। 'গোল্ডিলকস জোন' বা উপযুক্ত মাত্রার চ্যালেঞ্জই সভ্যতা গড়ে তোলে।
৩. সভ্যতার বৃদ্ধি ও সৃজনশীল সংখ্যালঘু (The Growth of Civilizations)
সভ্যতা কখন বৃদ্ধি পায়? যখন সমাজের একটি 'সৃজনশীল সংখ্যালঘু' (Creative Minority) গোষ্ঠী নতুন নতুন সমস্যার সমাধান দেয় এবং সাধারণ জনগণ (Internal Proletariat) স্বেচ্ছায় তাদের অনুসরণ করে।
অনুকরণ (Mimesis): সাধারণ মানুষ যখন নেতার গুণাবলীতে মুগ্ধ হয়ে তাকে অনুকরণ করে, তখন সভ্যতা বিকশিত হয়।
৪. সভ্যতার পতন: আত্মঘাতী ব্যর্থতা (The Breakdown of Civilizations)
টোয়েনবি বিশ্বাস করতেন, সভ্যতা বাইরে থেকে কেউ এসে ধ্বংস করে না; সভ্যতা 'আত্মহত্যা' করে।
সৃজনশীলতার অভাব: যখন 'সৃজনশীল সংখ্যালঘু' গোষ্ঠী আর নতুন সমাধান দিতে পারে না, তখন তারা 'শাসক সংখ্যালঘু' (Dominant Minority)-তে পরিণত হয়। তারা তখন বুদ্ধির বদলে লাঠি বা শক্তির জোরে শাসন করতে চায়।
বিচ্ছিন্নতা: সাধারণ মানুষ তখন শাসকদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং সমাজ বিভক্ত হয়ে যায়।
৫. সর্বজনীন রাষ্ট্র ও চার্চ (Universal State and Universal Church)
সভ্যতার পতনের শেষ পর্যায়ে একটি 'সর্বজনীন রাষ্ট্র' (যেমন রোমান সাম্রাজ্য বা মৌর্য সাম্রাজ্য) গঠিত হয়। এটি সাময়িকভাবে শান্তি আনলেও আসলে তা পতনেরই একটি লক্ষণ। এই সময়েই 'সর্বজনীন চার্চ' বা ধর্মের উত্থান ঘটে, যা পুরোনো সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে নতুন একটি সভ্যতার বীজ বপন করে।
৬. বুক ক্লাবের জন্য অধ্যায়ভিত্তিক সারসংক্ষেপ (Short Chapters Overview)
| খণ্ড/অধ্যায় | মূল বিষয়বস্তু | সারাংশ |
|---|---|---|
| ১-২ খণ্ড | সভ্যতার জন্ম | চ্যালেঞ্জ ও রেসপন্স থিওরির মাধ্যমে সভ্যতার উত্থান। |
| ৩ খণ্ড | সভ্যতার বৃদ্ধি | সৃজনশীল নেতৃত্ব ও সামাজিক সংহতি। |
| ৪ খণ্ড | সভ্যতার ভাঙন | নেতৃত্বের ব্যর্থতা এবং 'ক্রিয়েটিভ মাইনোরিটি'র পতন। |
| ৫-৬ খণ্ড | পতনের প্রক্রিয়া | অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক প্রলেতারিয়েত (শ্রমজীবী) বিদ্রোহ। |
| ৭-৯ খণ্ড | রাষ্ট্র ও ধর্ম | সাম্রাজ্যের পতন ও ধর্মের মাধ্যমে নতুন সভ্যতার ইঙ্গিত। |
| ১০-১২ খণ্ড | সমসাময়িক বিশ্ব | আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার ভবিষ্যৎ ও বিশ্বশান্তি। |
বুক ক্লাব ডিসকাশন পয়েন্ট (টোয়েনবি স্পেশাল):
বর্তমান চ্যালেঞ্জ: আমাদের বর্তমান বিশ্ব যে 'জলবায়ু পরিবর্তন' বা 'এআই (AI)'-এর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, আমাদের উত্তর (Response) কি যথেষ্ট সৃজনশীল?
নেতৃত্বের সংকট: টোয়েনবির মতে, নেতারা যখন শক্তি প্রয়োগ শুরু করেন, তখনই পতন শুরু হয়। বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক অস্থিরতা কি এই পতনের ইঙ্গিত?
WCI সংযোগ: টোয়েনবি বলেছিলেন, ধর্ম ও নৈতিকতা একটি সভ্যতাকে পুনর্জীবিত করতে পারে। আপনার World Civilization Index কি সেই নৈতিক মানদণ্ডগুলোকে মাপতে সফল হচ্ছে?
আর্নল্ড জে. টয়েনবি (Arnold J. Toynbee)-এর A Study of History (১৯৩৪–১৯৬১) একটি বিরাট ১২ খণ্ডের কাজ, যেখানে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতার (প্রায় ১৯–২৩টি) উত্থান, বিকাশ, পতন এবং ধ্বংসের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন। এই বইয়ের মূল শিক্ষনীয় দিকগুলো নিম্নরূপ:
১. 'চ্যালেঞ্জ ও রেসপন্স' (Challenge and Response) নীতি
এটিই বইটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা। টোয়েনবি শিখিয়েছেন যে, পরিবেশ বা পরিস্থিতি যখন আমাদের সামনে কোনো কঠিন চ্যালেঞ্জ (যেমন: খরা, যুদ্ধ বা মহামারি) ছুড়ে দেয়, তখনই আমাদের ভেতরের সৃজনশীলতা জেগে ওঠে।
শিক্ষা: কোনো সমস্যাই সভ্যতার জন্য শেষ কথা নয়; বরং সমস্যাটি কতটুকু 'সৃজনশীল উত্তর' (Creative Response) পাচ্ছে, তার ওপরই সভ্যতার টিকে থাকা নির্ভর করে। চ্যালেঞ্জহীন জীবন বা সমাজ আলস্যে ধ্বংস হয়ে যায়।
২. নেতৃত্বের ধরণ: সৃজনশীল বনাম শাসক (Creative vs. Dominant)
টোয়েনবি দেখিয়েছেন, একটি সমাজ ততক্ষণই উন্নতি করে যতক্ষণ তার নেতারা 'সৃজনশীল সংখ্যালঘু' (Creative Minority) হিসেবে নতুন নতুন সমস্যার সমাধান দেয় এবং জনগণ তাদের ভালোবেসে অনুকরণ করে।
শিক্ষা: যখন নেতারা বুদ্ধির বদলে 'লাঠি' বা সামরিক শক্তি (Dominant Minority) দিয়ে শাসন করতে চায়, তখনই সভ্যতার পতন শুরু হয়। প্রকৃত ক্ষমতা বন্দুকের নলে নয়, বরং নতুন আইডিয়ার মধ্যে থাকে।
৩. 'মরে না, বরং আত্মহত্যা করে' (Suicide of Civilizations)
টোয়েনবির মতে, কোনো সভ্যতা সাধারণত বাইরের শত্রু (যেমন: অন্য কোনো দেশ বা দস্যু) দ্বারা ধ্বংস হয় না। সভ্যতা ধ্বংস হয় তার অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নৈতিক অবক্ষয় এবং সৃজনশীলতা হারানোর কারণে।
শিক্ষা: বাইরের শত্রুর চেয়ে নিজের ভেতরের দুর্বলতা এবং বিভাজন একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য বেশি ভয়ংকর। অর্থাৎ, অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও নৈতিকতাই সভ্যতার আসল কবজ।
৪. অনুকরণের বিপদ (The Danger of Mimesis)
টোয়েনবি লক্ষ্য করেছেন যে, সভ্যতার শুরুতে সাধারণ মানুষ নেতাদের 'সৃজনশীলতা' অনুকরণ করে। কিন্তু পতনের সময় তারা কেবল নেতাদের 'লাইফস্টাইল' বা বাইরের ঠাটবাট অনুকরণ শুরু করে।
শিক্ষা: কেবল বাহ্যিক জাঁকজমক বা প্রযুক্তি ধার করলেই একটি জাতি উন্নত হয় না; যদি না সেই জাতির মধ্যে মৌলিক চিন্তা ও নতুন কিছু উদ্ভাবনের ক্ষমতা থাকে।
৫. ধর্মের ভূমিকা: সভ্যতার সেতুবন্ধন
টোয়েনবি বিশ্বাস করতেন, যখন একটি পুরনো সভ্যতা (যেমন: রোমান) ভেঙে পড়ে, তখন সেখান থেকে একটি 'সর্বজনীন ধর্ম' (যেমন: খ্রিস্টধর্ম বা ইসলাম) জন্ম নেয়। এই ধর্মটিই পরবর্তী নতুন সভ্যতার বীজ বহন করে।
শিক্ষা: চরম বিপর্যয়ের সময় আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধই মানুষকে আবার ঐক্যবদ্ধ করতে এবং নতুন করে শুরু করার সাহস দিতে পারে।
৬. সভ্যতার জন্ম ও বিকাশের ব্যাখ্যাঃ
সভ্যতা কখনো সহজ বা আরামদায়ক পরিবেশ থেকে জন্মায় না। বরং কোনো কঠিন চ্যালেঞ্জের (প্রাকৃতিক, ভৌগোলিক, মানবীয় বা বাহ্যিক আক্রমণ) সৃজনশীল প্রতিক্রিয়ার (creative response) মাধ্যমে সভ্যতার জন্ম ও বিকাশ ঘটে।
- চ্যালেঞ্জ খুব কম হলে সভ্যতা স্থবির হয়ে যায়।
- চ্যালেঞ্জ খুব বেশি হলে তা ধ্বংস করে দেয়।
- আদর্শ চ্যালেঞ্জ (golden mean) সভ্যতাকে সৃজনশীল করে তোলে।
একটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার পর নতুন চ্যালেঞ্জ আসে—এভাবে চলতে থাকে বিকাশের চক্র।
সৃজনশীল সংখ্যালঘু (Creative Minority)
সভ্যতার বিকাশের পেছনে থাকে একদল সৃজনশীল মানুষ বা গোষ্ঠী (creative minority), যারা চ্যালেঞ্জের সমাধান খুঁজে বের করে এবং অন্যদের অনুপ্রাণিত করে।
পতনের সময় এই সৃজনশীল সংখ্যালঘু dominant minority-তে পরিণত হয়—তারা জোর করে শাসন করে, কিন্তু সৃজনশীলতা হারিয়ে ফেলে। ফলে সাধারণ মানুষ (internal proletariat) তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
৮. সভ্যতার জীবনচক্র
টয়েনবি সভ্যতাকে জীবন্ত প্রাণীর মতো দেখেন, যার নির্দিষ্ট পর্যায় রয়েছে:
- Genesis (জন্ম): চ্যালেঞ্জের প্রতিক্রিয়ায় জন্ম।
- Growth (বিকাশ): একের পর এক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা।
- Time of Troubles (সংকটকাল): অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ, সামাজিক অস্থিরতা।
- Universal State (সার্বজনীন রাষ্ট্র): সংকটের পর একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে (যেমন রোমান সাম্রাজ্য), কিন্তু এটি পতনের লক্ষণ।
- Disintegration (ধ্বংস): সৃজনশীলতার অভাবে সভ্যতা ভেঙে পড়ে।
সভ্যতা মূলত অভ্যন্তরীণ কারণে ধ্বংস হয় (নিজস্ব সৃজনশীলতা হারানো), বাহ্যিক আক্রমণ শুধু অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
৯. পতনের মূল কারণ
- আত্ম-নির্ধারণের (self-determination) অভাব: সভ্যতা যখন নিজেকে সৃজনশীলভাবে পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়।
- অতীতের পূজা (idolization of the past) বা ঐতিহ্যের অন্ধ অনুকরণ।
- জাতীয়তাবাদ, সামরিকবাদ, অভ্যন্তরীণ বিভেদ এবং নেতৃত্বের সৃজনশীলতা হারানো।
- বাহ্যিক থেকে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জে (etherialization) মনোযোগ স্থানান্তর করতে না পারা।
১০. ইতিহাসের একক (Unit of Historical Study)
জাতিরাষ্ট্র বা পুরো মানবজাতি নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা বা সমাজ (society/civilization) হলো ইতিহাস অধ্যয়নের যথাযথ একক। একটি সভ্যতা অন্য সভ্যতার সাথে যোগাযোগ, সংঘর্ষ বা প্রভাবিত হয়।
১১. উচ্চ ধর্ম ও আশার বার্তা
সভ্যতার পতনকালে প্রায়ই উচ্চ ধর্ম (higher religions) এবং universal church জন্ম নেয়, যা পরবর্তী সভ্যতার ভিত্তি তৈরি করে। টয়েনবি মনে করেন, চক্রাকার পতন অনিবার্য নয়—মানুষ যদি সৃজনশীলভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, তাহলে এই চক্র ভাঙা সম্ভব।
আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা
বইটির শিক্ষা আজকের বিশ্বের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ:
- সমাজ যখন পরিবেশগত, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, তখন সৃজনশীল নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনী প্রতিক্রিয়া ছাড়া টিকে থাকা কঠিন।
- অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও সৃজনশীলতার অভাব আজকের অনেক সমাজের পতনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
টয়েনবির এই তত্ত্ব অনেক সমালোচনারও মুখোমুখি হয়েছে (যেমন—অত্যধিক সাধারণীকরণ), কিন্তু এটি ইতিহাসকে একটি বড় চিত্রে দেখার অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি দেয়।
সংক্ষিপ্ত সংস্করণ (D.C. Somervell-এর abridgement) পড়লে মূল আইডিয়াগুলো সহজে বোঝা যায়।
টোয়েনবির ২৬টি সভ্যতার তালিকা ও সময়কাল
আর্নল্ড টোয়েনবির গবেষণায় উঠে আসা ২৬টি সভ্যতার তালিকা নিচে দেওয়া হলো। তিনি এই সভ্যতাগুলোকে মূলত তাদের ধর্মীয় এবং ভৌগোলিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ভাগ করেছিলেন। টোয়েনবি সভ্যতাগুলোকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন: স্বাধীন সভ্যতা, উপগ্রহ (Satellite) সভ্যতা, এবং স্তব্ধ (Arrested) সভ্যতা।
১. স্বাধীন সভ্যতা (Independent Civilizations)
এগুলো কোনো আগের সভ্যতার অনুকরণ নয়, বরং স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়েছে।
| সভ্যতার নাম | আনুমানিক সময়কাল | প্রধান অঞ্চল |
|---|---|---|
| ১. সুমেরীয় | খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ – ১৭০০ | মেসোপটেমিয়া (ইরাক) |
| ২. মিশরীয় | খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ – খ্রিষ্টাব্দ ৩০০ | নীল নদ অববাহিকা |
| ৩. সিন্ধু-সরস্বতী | খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০০ – ১৫০০ | উত্তর-পশ্চিম ভারত ও পাকিস্তান |
| ৪. চীন (প্রাচীন) | খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ – বর্তমান | হুয়াং হো নদী অববাহিকা |
| ৫. আন্দিয়ান | খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ – খ্রিষ্টাব্দ ১৫০০ | দক্ষিণ আমেরিকা (পেরু) |
| ৬. মায়া | খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ – খ্রিষ্টাব্দ ৯০০ | মধ্য আমেরিকা (মেক্সিকো) |
| ৭. মিনোয়ান | খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ – ১৪০০ | ক্রীট দ্বীপ (গ্রিস) |
২. উত্তরসূরি বা সংযুক্ত সভ্যতা (Affiliated Civilizations)
এগুলো আগের কোনো সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে জন্ম নিয়েছে।
| সভ্যতার নাম | উৎস সভ্যতা | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|---|
| ৮. পশ্চিমা (Western) | হেলেনিক (গ্রিক-রোমান) | উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ |
| ৯. অর্থোডক্স খ্রিস্টান | হেলেনিক | রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপ |
| ১০. ইসলামী | সিরীয় ও পারসিক | মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা |
| ১১. হিন্দু | সিন্ধু ও বৈদিক | দক্ষিণ এশিয়া (ভারত) |
| ১২. দূরপ্রাচ্য (Far Eastern) | প্রাচীন চীন | জাপান ও কোরিয়া |
| ১৩. হেলেনিক (গ্রিক-রোমান) | মিনোয়ান | বিলুপ্ত (বর্তমান পাশ্চাত্যের ভিত্তি) |
| ১৪. বাবিলনীয় | সুমেরীয় | বিলুপ্ত |
| ১৫. হিট্টাইট (Hittite) | সুমেরীয় | বিলুপ্ত (তুরস্ক অঞ্চল) |
| ১৬. সিরীয় | সুমেরীয়/মিশরীয় | বিলুপ্ত |
৩. উপগ্রহ (Satellite) ও স্তব্ধ (Arrested) সভ্যতা
এগুলো বড় সভ্যতার প্রভাবে গড়ে উঠেছে অথবা প্রতিকূল পরিবেশের কারণে আর এগোতে পারেনি।
| সভ্যতার নাম | ধরন | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| ১৭. এস্কিমো | স্তব্ধ | অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে স্থবির হয়ে যায়। |
| ১৮. যাযাবর (Nomadic) | স্তব্ধ | মরুভূমির প্রতিকূলতায় বিকাশ থমকে যায়। |
| ১৯. স্পার্টান | স্তব্ধ | অতি-সামরিকীকরণের কারণে শিল্পে পিছিয়ে যায়। |
| ২০. পলিনেশিয়ান | স্তব্ধ | সমুদ্রের বিচ্ছিন্নতায় স্থবির হয়ে পড়ে। |
| ২১. অটোমান | স্তব্ধ/উপগ্রহ | প্রশাসনিক জটিলতায় পতন ঘটে। |
| ২২. ইরানী | উপগ্রহ | ইসলামী সভ্যতার সাথে মিশে যায়। |
| ২৩. কোরিয়ান | উপগ্রহ | চীনা সভ্যতার প্রভাবে বিকশিত। |
| ২৪. জাপানি | উপগ্রহ | চীনা সভ্যতা থেকে অনুপ্রাণিত। |
| ২৫. তিব্বতী | উপগ্রহ | ভারতীয় ও চীনা সংমিশ্রণ। |
| ২৬. মেক্সিকান (আজটেক) | উপগ্রহ | মায়ান সভ্যতার উত্তরসূরি। |
WCI-এর জন্য টোয়েনবির দর্শনের নির্যাস:
টোয়েনবি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন যা আপনার পোর্টালের মূলমন্ত্র হতে পারে:
"সভ্যতাগুলো মরে না, তারা আত্মহত্যা করে।"
আপনার সূচকে (WCI) কোনো দেশের স্কোর যখন কমবে, তখন টোয়েনবির এই তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে যে—সেই সমাজটি আর 'সৃজনশীল উত্তর' (Creative Response) দিতে পারছে না, বরং শক্তির প্রয়োগ করছে।
বাস্তবমুখী ক্রিটিক
আর্নল্ড জে. টয়েনবির A Study of History বইয়ের বাস্তবমুখী ক্রিটিক (বিশেষ করে D.C. Somervell-এর abridgement-এর আলোকে)
টয়েনবির এই বিরাট কাজ (১২ খণ্ড) এবং তার সংক্ষিপ্ত সংস্করণ দুটোই সাধারণ পাঠকদের মধ্যে অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, কিন্তু প্রফেশনাল ইতিহাসবিদদের মধ্যে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। ১৯৫০-৬০-এর দশকে তার খ্যাতি চূড়ায় উঠলেও, পরবর্তীকালে একাডেমিক জগতে তার প্রভাব অনেক কমে যায়। নিচে বাস্তব ও প্রধান ক্রিটিকগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. পদ্ধতিগত সমস্যা: “Empirical” নয়, বরং “Speculative” ও “Metahistorical”
- টয়েনবি দাবি করেন যে তাঁর বিশ্লেষণ empirical (তথ্যভিত্তিক), কিন্তু সমালোচকরা বলেন এটি আসলে পূর্বনির্ধারিত তত্ত্বে (preconceived theory) তথ্যকে ফিট করার চেষ্টা। তিনি ইতিহাসের ঘটনাগুলোকে নিজের “Challenge and Response”, “Creative Minority”, “Disintegration” ইত্যাদি ছকে জোর করে ঢোকান।
- Hugh Trevor-Roper (অক্সফোর্ডের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ) বলেন: “He pretends that he has proved what he has merely stated... a terrible perversion of history.” তিনি এটাকে “Philosophy of Mish-Mash” বলে অভিহিত করেন।
- Pieter Geyl এবং অন্যরা বলেন যে এটি ঐতিহাসিক তথ্যের পরিবর্তে mystical বা দার্শনিক যুক্তি। তথ্য নির্বাচন arbitrary (খামখেয়ালি) এবং প্রায়ই distorted।
২. তথ্যের ভুল ও অসঙ্গতি (Factual Errors and Inconsistencies)
- অনেক উদাহরণে তিনি সভ্যতার শুরু-শেষের তারিখ arbitraryভাবে নির্ধারণ করেন।
- কিছু সভ্যতাকে (যেমন Minoan ও Hellenic) একসাথে জুড়ে দেন বা অতিরঞ্জিত করে দেখান।
- Geoffrey Barraclough বলেন: “arbitrary use of historical evidence” এবং “inconsistency”।
- Challenge and Response তত্ত্বটি খুবই vague — কোন পরিবেশ “চ্যালেঞ্জিং” তা স্পষ্টভাবে মাপা যায় না। একই পরিবেশ কারো জন্য চ্যালেঞ্জ, কারো জন্য সহজ হতে পারে।
৩. অতিরিক্ত সাধারণীকরণ (Over-generalization)
- ২১-২৩টি সভ্যতাকে একই ছকে ফেলে দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবে খুবই জটিল ও ভিন্নধর্মী।
- প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বা সামরিক শক্তির সাথে সভ্যতার “vigor”-এর কোনো সম্পর্ক দেখান না — যা অনেকের কাছে অবাস্তব মনে হয়।
- সভ্যতার পতন শুধু অভ্যন্তরীণ কারণে হয় বলে দাবি করা হয়, কিন্তু বাহ্যিক কারণকে পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না।
৪. ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার অতিরিক্ত গুরুত্ব
- পরবর্তী খণ্ডগুলোতে (বিশেষ করে Vol. VII–XII) তিনি higher religions ও “universal church”-কে সভ্যতার পুনরুজ্জীবনের মূল হিসেবে দেখেন। সমালোচকরা বলেন এটি Christian moralist-এর দৃষ্টিভঙ্গি, ইতিহাসবিদের নয়।
- Myths, metaphors ও ধর্মীয় ধারণাকে factual data-র সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৫. ইউরোসেন্ট্রিজমের সমালোচনা এবং অন্যান্য
- টয়েনবি নিজে ইউরোসেন্ট্রিক ইতিহাসের সমালোচনা করেছিলেন, কিন্তু অনেকে বলেন তাঁর ছকেও পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি প্রচ্ছন্নভাবে রয়েছে।
- কিছু সমালোচক (যেমন Elie Kedourie) তাঁকে “moralistic flagellant” বলে অভিহিত করেন — পশ্চিমকে অপরাধী ও অন্যদের শিকার হিসেবে দেখানোর অভিযোগ।
সমালোচনার সারাংশ ও প্রসঙ্গ
প্রফেশনাল ইতিহাসবিদরা (Trevor-Roper, Barraclough, Geyl ইত্যাদি) মনে করেন যে টয়েনবির কাজ bold ও visionary হলেও, এটি bad history (খারাপ ইতিহাস) এবং bad philosophy (খারাপ দর্শন) — দুটোরই খারাপ দিক নিয়ে এসেছে। তথ্যের ব্যাপকতা ও erudition (জ্ঞানের গভীরতা) স্বীকার করে নিয়েও তারা বলেন যে পদ্ধতি flawed।
পজিটিভ দিক (ক্রিটিকের আলোকে):
- বিশ্ব ইতিহাসকে জাতিরাষ্ট্রের বাইরে সভ্যতার এককে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে।
- Eurocentrism-এর বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করেছে (যা পরবর্তীকালে William McNeill, Jürgen Osterhammel-এর মতো বিশ্ব-ইতিহাসবিদদের প্রভাবিত করেছে)।
- সাধারণ পাঠকের জন্য বড় চিত্র (big picture) দেখার অনুপ্রেরণা।
রেফারেন্স (প্রধান সোর্স):
- Hugh Trevor-Roper-এর “Arnold Toynbee’s Millennium” এবং Toynbee and History: Critical Essays (1956)।
- Pieter Geyl-এর সমালোচনা।
- Walter Kaufmann-এর “Toynbee: The Historian as False Prophet” (*Commentary* magazine)।
- Encyclopedia Britannica ও Encyclopedia Americana-এর এন্ট্রি (তথ্যের ভুল ও ধর্মীয় over-reliance-এর কথা উল্লেখ আছে)।
- আধুনিক আলোচনা: Rein Taagepera, Krishan Kumar, Jürgen Osterhammel ইত্যাদি।
সংক্ষেপে বললে: Somervell-এর abridgement মূল আইডিয়াগুলো সুন্দরভাবে তুলে ধরে পড়তে সহজ করে, কিন্তু তার মধ্যেও একই ত্রুটিগুলো (over-simplification, selective evidence) বিদ্যমান। এটি দার্শনিক চিন্তা বা বড় দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়ার জন্য ভালো, কিন্তু কঠোর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ হিসেবে নির্ভরযোগ্য নয়।