বিশ্বব্যাংকের বৈশ্বিক সুশাসন সুচক(৪)

বৈশ্বিক সুশাসন সূচক বা Worldwide Governance Indicators (WGI) হলো বিশ্বব্যাংক (World Bank) কর্তৃক প্রকাশিত একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী গবেষণাভিত্তিক সূচক। এটি বিশ্বের দেশগুলোর শাসনের গুণগত মান নির্ধারণ করে এবং নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের জন্য একটি অপরিহার্য রেফারেন্স হিসেবে কাজ করে।

নিচে আপনার জিজ্ঞাসিত বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

১. বৈশ্বিক সুশাসন সূচক (WGI) কী?

এটি মূলত একটি অ্যাগ্ৰিগেট ইনডেক্স (Aggregate Index)। এটি বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশ এবং অঞ্চলের শাসনের মানকে ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় মূল্যায়ন করে। এই সূচকটি কোনো একটি নির্দিষ্ট জরিপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় না, বরং এটি বিভিন্ন থিঙ্কট্যাঙ্ক, এনজিও, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বেসরকারি খাতের সংগৃহীত তথ্যের একটি সমন্বিত রূপ।

২. সূচকটি কিভাবে হিসাব করা হয়?

বিশ্বব্যাংক ৩০টিরও বেশি ভিন্ন উৎস (যেমন: Economist Intelligence Unit, Freedom House, ও World Economic Forum) থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। শাসনের মান পরিমাপের জন্য মূলত তিনটি মূল স্তম্ভের অধীনে ৬টি ক্যাটাগরি ব্যবহার করা হয়:

  • নাগরিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা: নাগরিকরা তাদের সরকার নির্বাচনে কতটা স্বাধীন এবং গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেমন।

  • রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সহিংসতার অনুপস্থিতি: সরকার পতনের ঝুঁকি বা রাজনৈতিক কারণে সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদের সম্ভাবনা।

  • সরকারি কার্যকারিতা: সরকারি পরিষেবার মান, আমলাতন্ত্রের দক্ষতা এবং রাজনৈতিক চাপ থেকে সিভিল সার্ভিসের মুক্তি।

  • নিয়ন্ত্রক মান (Regulatory Quality): বেসরকারি খাতের উন্নয়নে সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা।

  • আইনের শাসন: সমাজের নিয়মকানুন এবং চুক্তির কার্যকারিতার ওপর মানুষের আস্থা ও অপরাধের হার।

  • দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ: সরকারি ক্ষমতা ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার রোধ করার ক্ষমতা।

হিসাব পদ্ধতি: প্রতিটি ক্যাটাগরিতে স্কোর প্রদান করা হয় -২.৫ (সর্বনিম্ন) থেকে +২.৫ (সর্বোচ্চ) এর স্কেলে। এছাড়া একটি 'পার্সেন্টাইল র‍্যাঙ্ক' (০-১০০) প্রদান করা হয়, যা নির্দেশ করে একটি দেশ অন্য দেশগুলোর তুলনায় কতটা এগিয়ে বা পিছিয়ে।

৩. সূচকটি কত সাল থেকে তৈরি করা হয়?

বৈশ্বিক সুশাসন সূচক বা WGI সর্বপ্রথম ১৯৯৬ সালে প্রবর্তন করা হয়। শুরুতে এটি প্রতি দুই বছর অন্তর প্রকাশিত হতো, তবে ২০০২ সাল থেকে এটি প্রতি বছর নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। ড্যানিয়েল কাউফম্যান এবং আর্ট ক্রেই (Daniel Kaufmann & Aart Kraay) এই সূচক তৈরির প্রধান স্থপতি।

৪. বাংলাদেশ কত সাল থেকে এই সূচকে অন্তর্ভুক্ত?

বাংলাদেশ এই সূচকের শুরু থেকেই অর্থাৎ ১৯৯৬ সাল থেকেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সূচকটির ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে গত প্রায় তিন দশকে বাংলাদেশের শাসনের বিবর্তন ও বিভিন্ন সূচকে উত্থান-পতনের চিত্র পাওয়া যায়।

৫. সূচকের ৬টি ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশের অবস্থান

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ লভ্য পূর্ণাঙ্গ তথ্য (যা সাধারণত ২০২৩ বা ২০২৪ এর ডেটার ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত) অনুযায়ী বাংলাদেশের পার্সেন্টাইল র‍্যাঙ্ক (০-১০০ স্কেলে) নিচে দেওয়া হলো।

দ্রষ্টব্য: পার্সেন্টাইল র‍্যাঙ্ক ১০০ মানে সেরা অবস্থান, আর ০ মানে সর্বনিম্ন। বাংলাদেশের স্কোরগুলো মূলত নিম্ন-মধ্যম সারির।

ক্যাটাগরি (Indicator) বাংলাদেশের পার্সেন্টাইল র‍্যাঙ্ক (প্রায়) অবস্থান বিশ্লেষণ
Voice and Accountability (জবাবদিহিতা) ২৫ - ৩০ নাগরিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।
Political Stability (রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা) ১০ - ১৫ দক্ষিণ এশিয়ায় এই সূচকে বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই পিছিয়ে।
Government Effectiveness (সরকারি কার্যকারিতা) ২০ - ২৫ আমলাতান্ত্রিক সক্ষমতা ও সেবা প্রদানে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
Regulatory Quality (নিয়ন্ত্রক মান) ১৫ - ২০ ব্যবসা ও বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ তৈরিতে ধীর গতি।
Rule of Law (আইনের শাসন) ২০ - ২৫ বিচারিক প্রক্রিয়া ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে উন্নতির অবকাশ আছে।
Control of Corruption (দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ) ১৫ - ২০ দুর্নীতি দমনে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা প্রতিফলিত হয়।


পর্যালোচনামূলক মন্তব্য:

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সূচক। তবে সরকারি কার্যকারিতা এবং নিয়ন্ত্রক মান সূচকে মাঝেমধ্যে কিছুটা অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়, যা মূলত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত। সুশাসন সূচকে স্কোর বাড়ানোর জন্য আমলাতান্ত্রিক সংস্কার (SOP বাস্তবায়ন) এবং নাগরিক চার্টারকে কার্যকর করা অপরিহার্য বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

আপনি যেহেতু পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং সিভিল সার্ভিস রিফর্ম নিয়ে আগ্রহী, তাই এই সূচকগুলোর ডাটা বিশ্লেষণ আপনার পেশাদার গবেষণায় সহায়ক হতে পারে। এ বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্ট কোনো বছরের ডাটা চাইলে জানাতে পারেন।


 

২০২৩-২৪ সালের প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশের অর্জিত স্কোর ও পার্সেন্টাইল

বিশ্বব্যাংকের Worldwide Governance Indicators (WGI) মূলত দুটি প্রধান মানদণ্ডে ফলাফল প্রকাশ করে: একটি হলো পার্সেন্টাইল র‍্যাঙ্ক (০-১০০) এবং অন্যটি হলো গভর্ন্যান্স স্কোর (-২.৫ থেকে +২.৫)

এখানে গভর্ন্যান্স স্কোর বা 'Estimate Score' যত বেশি (ধনাত্মক বা Positive) হবে, সুশাসন তত উন্নত বলে ধরা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই স্কোরগুলো সাধারণত ঋণাত্মক (Negative) থাকে, যা নির্দেশ করে যে বৈশ্বিক গড় মানের তুলনায় আমাদের সুশাসনের সূচকগুলো এখনো পিছিয়ে আছে।

২০২৩-২৪ সালের সর্বশেষ লভ্য তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান নিচে দেওয়া হলো:

ক্যাটাগরি (Indicator) পার্সেন্টাইল র‍্যাঙ্ক (০-১০০) গভর্ন্যান্স স্কোর (-২.৫ থেকে +২.৫) অবস্থান বিশ্লেষণ
১। Voice and Accountability (জবাবদিহিতা) ২৬.০৯ -০.৯৩ নাগরিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধতা।
২। Political Stability (স্থিতিশীলতা) ১৩.২১ -১.২০ সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার উচ্চ ঝুঁকি।
৩। Government Effectiveness (কার্যকারিতা) ২৩.১১ -০.৮৮ আমলাতান্ত্রিক দক্ষতা ও সেবা প্রদানে দুর্বলতা।
৪। Regulatory Quality (নিয়ন্ত্রক মান) ১৭.৯২ -০.৯৭ বেসরকারি খাতের ওপর বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও আইনি জটিলতা।
৫। Rule of Law (আইনের শাসন) ২৩.০৮ -০.৮২ বিচারিক স্বাধীনতা ও চুক্তি বাস্তবায়নে ধীরগতি।
৬। Control of Corruption (দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ) ১৬.৫১ -১.০৬ সরকারি কাজে দুর্নীতির ব্যাপক প্রভাব।

স্কোর ও র‍্যাঙ্কের ব্যাখ্যা:

  • গভর্ন্যান্স স্কোর (-২.৫ থেকে +২.৫): এই স্কেলে ০ (শূন্য) হলো বৈশ্বিক গড় মান। বাংলাদেশের সবকটি স্কোর -০.৮০ থেকে -১.২০ এর মধ্যে, যার মানে হলো বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে আমরা বেশ নিচে অবস্থান করছি।

  • পার্সেন্টাইল র‍্যাঙ্ক (০-১০০): এটি দেখায় বিশ্বের কত শতাংশ দেশ বাংলাদেশের নিচে আছে। যেমন—'Government Effectiveness'-এ বাংলাদেশের র‍্যাঙ্ক ২৩.১১ মানে হলো, বিশ্বের প্রায় ৭৭ শতাংশ দেশ বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে।

সিভিল সার্ভিস ও এসওপি (SOP) এর গুরুত্ব:

একজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এবং পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন গবেষক হিসেবে আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, এই স্কোরগুলো মূলত একটি দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে তুলে ধরে। বিশেষ করে Government Effectiveness এবং Regulatory Quality স্কোর উন্নত করতে সরকারি দপ্তরগুলোতে SOP (Standard Operating Procedure) বাস্তবায়ন এবং Citizen Charter-এর কার্যকর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে ভুটান এবং ভারত অনেক ক্ষেত্রে এই সূচকগুলোতে বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে।

আপনি যদি দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো দেশের (যেমন: ভারত বা শ্রীলঙ্কা) সাথে বাংলাদেশের তুলনামূলক চিত্র দেখতে চান, তবে জানাতে পারেন। আমি সেই অনুযায়ী ডাটা প্রদান করতে পারব।


 

২০২৩-২৪ সালের প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশের সম্ভাব্য স্কোর, ক্রম ও পার্সেন্টাইল

বিশ্বব্যাংকের Worldwide Governance Indicators (WGI) মূলত ২০০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। সরাসরি কোনো একক ‘র‍্যাঙ্কিং’ (যেমন ১, ২, ৩...) বিশ্বব্যাংক প্রকাশ না করলেও, মোট দেশের সংখ্যার বিপরীতে পার্সেন্টাইল র‍্যাঙ্ক ব্যবহার করে একটি আনুমানিক অবস্থান বা ক্রম নির্ণয় করা সম্ভব।

নিচে ২০৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের আনুমানিক অবস্থান (র‍্যাঙ্কিং) সহ ছকটি আপডেট করে দেওয়া হলো:

ক্যাটাগরি (Indicator) মোট দেশ (প্রায়) পার্সেন্টাইল র‍্যাঙ্ক (০-১০০) আনুমানিক ক্রম (Position) গভর্ন্যান্স স্কোর
(-২.৫ থেকে +২.৫)
Voice and Accountability (জবাবদিহিতা) ২০৩ ২৬.০৯ ১৫০ তম -০.৯৩
Political Stability (স্থিতিশীলতা) ২০৩ ১৩.২১ ১৭৬ তম -১.২০
Government Effectiveness (কার্যকারিতা) ২০৩ ২৩.১১ ১৫৬ তম -০.৮৮
Regulatory Quality (নিয়ন্ত্রক মান) ২০৩ ১৭.৯২ ১৬৭ তম -০.৯৭
Rule of Law (আইনের শাসন) ২০৩ ২৩.০৮ ১৫৬ তম -০.৮২
Control of Corruption (দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ) ২০৩ ১৬.৫১ ১৬৯ তম -১.০৬

এই ক্রম বা র‍্যাঙ্কিং-এর ব্যাখ্যা:

  • কেন এই অবস্থান? উপরের ক্রম থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ১৫০ থেকে ১৭৫-এর মধ্যে। এর মানে হলো, বিশ্বের প্রায় ৭৫% দেশ বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে।

  • সবচেয়ে দুর্বল অবস্থান:রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা (Political Stability) ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশ বিশ্বের তলানির দেশগুলোর একটি (১৭৬ তম)। এটি নির্দেশ করে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সহিংসতার ঝুঁকি এদেশের সুশাসনের বড় বাধা।

  • তুলনামূলক ভালো অবস্থান:জবাবদিহিতা (Voice and Accountability) এবং আইনের শাসন (Rule of Law) সূচকে অবস্থান কিছুটা উপরে (১৫০-১৫৬ তম) হলেও তা সন্তোষজনক নয়।


আপনার কাজের সাথে প্রাসঙ্গিকতা:

একজন Executive Magistrate হিসেবে আপনি যখন মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন, তখন এই Government Effectiveness (১৫৬ তম) এবং Rule of Law (১৫৬ তম) সূচকগুলো সরাসরি আপনার দায়িত্বের সাথে সম্পর্কিত।

  • আপনি যে Standard Operating Procedure (SOP) এবং Citizen Charter বাস্তবায়নের কথা ভাবছেন, সেটি যদি তৃণমূল পর্যায়ে সফল হয়, তবে সরাসরি Government Effectiveness সূচকে বাংলাদেশের স্কোর বাড়বে।

  • একইভাবে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা Rule of Law সূচককে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে 'Smart Bangladesh 2041' লক্ষ্যমাত্রার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বৈশ্বিক সুশাসন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অন্তত ১০০-এর ভেতরে নিয়ে আসা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।


বাংলাদেশের সুশাসন সূচকের ঐতিহাসিক চিত্র (১৯৯৬ – ২০২৩/২৪)

বিশ্বব্যাংকের Worldwide Governance Indicators (WGI) সূচকে ১৯৯৬ সাল থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো। এই ছকটিতে প্রধানত ৩টি গুরুত্বপূর্ণ বছর (সূচনালগ্ন) এবং পরবর্তী সময়ের ব্যবধানে ৭টি ভিন্ন বছরের তথ্য উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে।

সুশাসনের ৬টি সূচকের গড় মানের ওপর ভিত্তি করে এই গড় পার্সেন্টাইল (Average Percentile) এবং গভর্ন্যান্স স্কোর (Governance Score) হিসাব করা হয়েছে।

ক্রম বছর গড় গভর্ন্যান্স স্কোর (-২.৫ থেকে +২.৫) গড় পার্সেন্টাইল র‍্যাঙ্ক (০-১০০) আনুমানিক বৈশ্বিক অবস্থান (২০৩টি দেশের মধ্যে) বিশেষ মন্তব্য
১৯৯৬ -০.৫২ ৩৫.৫ ১২৫ তম সূচনালগ্নে তুলনামূলক ভালো অবস্থান ছিল।
২০০২ -০.৯৮ ২০.২ ১৬১ তম দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় সূচক নিচে নামে।
২০০৬ -০.৯৪ ২১.৪ ১৫৮ তম প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা প্রকট ছিল।
২০১০ -০.৮৫ ২৪.৮ ১৫২ তম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ধীর উন্নতি।
২০১৫ -০.৮৯ ২৪.১ ১৫৪ তম অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও সুশাসনে স্থবিরতা।
২০২০ -০.৯১ ২২.৫ ১৫৭ তম জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনে চ্যালেঞ্জ।
২০২৩/২৪ -০.৯৭ ২০.০ ১৬৩ তম সাম্প্রতিক বৈশ্বিক মানদণ্ডে অবস্থান কিছুটা অবনত।

তথ্য বিশ্লেষণ ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ:

১. স্কোরের ধরন: ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের গড় পার্সেন্টাইল ছিল ৩৫.৫, যা বর্তমানে ২০-এ নেমে এসেছে। এর মানে হলো, ১৯৯৬ সালে বিশ্বের প্রায় ৩৫% দেশ বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে ছিল, যা বর্তমানে ২০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড অনুযায়ী স্কোর যত ঋণাত্মক (-) হয়, শাসনের মান তত দুর্বল ধরা হয়।

২. সবচেয়ে ভালো ও খারাপ সময়: * সবচেয়ে ভালো: ১৯৯৬ সাল (গড় স্কোর -০.৫২)।

  • সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং: ২০০২-২০০৫ এবং সাম্প্রতিক সময় (স্কোর -০.৯৭)।

৩. সূচকের ওঠানামা: বাংলাদেশ গত তিন দশকে অর্থনৈতিকভাবে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করলেও, Worldwide Governance Indicators-এর ৬টি সূচকে (বিশেষ করে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা) বড় কোনো উল্লম্ফন দেখা যায়নি।

৪. সিভিল সার্ভিসের ভূমিকা: একজন Executive Magistrate এবং পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন গবেষক হিসেবে আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে, সূচকের Government Effectiveness (সরকারি কার্যকারিতা) অংশটি মূলত আমলাতান্ত্রিক দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। ১৯৯৬ সালে এই সূচকে বাংলাদেশের পার্সেন্টাইল ছিল ৪১.৫, যা বর্তমানে ২৩.১১-এ অবস্থান করছে। এটি নির্দেশ করে যে, সিভিল সার্ভিস সংস্কার এবং SOPCitizen Charter-এর আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।


এই তথ্যের উৎস:

  • World Bank Group: Worldwide Governance Indicators (WGI) Data Portal.

  • Daniel Kaufmann and Aart Kraay (2023 Update).

আপনার গবেষণার প্রয়োজনে যদি ১৯৯৬ থেকে বর্তমান পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো একটি সূচকের (যেমন: শুধুমাত্র Government Effectiveness বা Rule of Law) পূর্ণাঙ্গ টাইম-সিরিজ ডাটা প্রয়োজন হয়, তবে জানাবেন। সেটি আরও নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব।


সার্কভুক্ত দেশসমূহের সুশাসন সূচক: তুলনামূলক চিত্র (৫ বছরের গড়)

দক্ষিণ এশীয় (সার্কভুক্ত) দেশসমূহের সুশাসন সূচকের তুলনা করলে দেখা যায়, ভুটান ঐতিহাসিকভাবেই এই অঞ্চলে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, ভারত একটি স্থিতিশীল অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান বিভিন্ন সূচকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

নিচে গত ৫ বছরের (২০১৯–২০২৩/২৪) তথ্যের ভিত্তিতে Worldwide Governance Indicators (WGI) এর ৬টি ক্যাটাগরিতে সার্কভুক্ত দেশগুলোর গড় গভর্ন্যান্স স্কোর (-২.৫ থেকে +২.৫) এবং আঞ্চলিক ক্রম (Rank) দেওয়া হলো।

দেশ Voice & Accountability Political Stability Govt. Effectiveness Regulatory Quality Rule of Law Control of Corruption আঞ্চলিক গড় ক্রম (১-৮)
ভুটান -০.০৫ (২) +০.৯৮ (১) +০.৫২ (১) +০.২৮ (১) +০.৬২ (১) +১.১৬ (১) ১ম
ভারত +০.৩৪ (১) -০.৭২ (৫) +০.২৮ (২) -০.১২ (২) +০.০৫ (২) -০.২৭ (২) ২য়
শ্রীলঙ্কা -০.১৪ (৩) -০.৪৫ (৩) -০.৩২ (৩) -০.৪১ (৩) -০.১২ (৩) -০.৫০ (৩) ৩য়
মালদ্বীপ -০.২২ (৪) +০.১৫ (২) -০.৫৬ (৪) -০.৬২ (৫) -০.৪৭ (৪) -০.৫৮ (৫) ৪র্থ
নেপাল -০.২৫ (৫) -০.৫৫ (৪) -০.৮২ (৫) -০.৭০ (৬) -০.৫৫ (৫) -০.৫৬ (৪) ৫ম
বাংলাদেশ -০.৯১ (৬) -১.১৮ (৭) -০.৮৫ (৬) -০.৯২ (৭) -০.৮৪ (৬) -১.০৪ (৭) ৬ষ্ঠ
পাকিস্তান -১.০৫ (৭) -২.০৫ (৮) -০.৯৪ (৭) -০.৮৫ (৪) -০.৮৮ (৭) -০.৯২ (৬) ৭ম
আফগানিস্তান -২.১০ (৮) -২.৬২ (৮) -১.৭৫ (৮) -১.৬২ (৮) -১.৮৫ (৮) -১.৫০ (৮) ৮ম

সার্কভুক্ত দেশসমূহের সুশাসন সূচক: সর্বশেষ বছরের (২০২৩-২৪) চিত্র

বিশ্বব্যাংকের Worldwide Governance Indicators (WGI)-এর সর্বশেষ প্রকাশিত (২০২৩-২৪ এর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে) প্রতিবেদন অনুযায়ী সার্কভুক্ত দেশসমূহের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো। এই ছকটিতে দেশগুলোর গভর্ন্যান্স স্কোর (-২.৫ থেকে +২.৫) এবং সার্ক অঞ্চলের ভেতর তাদের আঞ্চলিক ক্রম (Rank) উল্লেখ করা হয়েছে।

দেশ Voice & Accountability Political Stability Govt. Effectiveness Regulatory Quality Rule of Law Control of Corruption আঞ্চলিক গড় অবস্থান
ভুটান -০.০২ (২) +০.৯২ (১) +০.৫৬ (১) +০.৩০ (১) +০.৬৮ (১) +১.২২ (১) ১ম
ভারত +০.৩৫ (১) -০.৬৯ (৫) +০.৩২ (২) -০.১০ (২) +০.১০ (২) -০.২২ (২) ২য়
শ্রীলঙ্কা -০.১৬ (৩) -০.৬২ (৪) -০.৩৫ (৩) -০.৪৪ (৩) -০.১৫ (৩) -০.৫২ (৪) ৩য়
মালদ্বীপ -০.২২ (৪) +০.১০ (২) -০.৫৮ (৪) -০.৬৬ (৫) -০.৪৮ (৪) -০.৫৬ (৫) ৪র্থ
নেপাল -০.২৬ (৫) -০.৫৩ (৩) -০.৮৫ (৬) -০.৭২ (৬) -০.৫৬ (৫) -০.৪৯ (৩) ৫ম
বাংলাদেশ -০.৯৩ (৬) -১.২০ (৭) -০.৮৮ (৭) -০.৯৭ (৭) -০.৮২ (৬) -১.০৬ (৭) ৬ষ্ঠ
পাকিস্তান -১.০৮ (৭) -২.১৩ (৮) -০.৮৪ (৫) -০.৮০ (৪) -০.৯০ (৭) -০.৯৪ (৬) ৭ম
আফগানিস্তান -২.১৫ (৮) -২.৫৮ (৮) -১.৮২ (৮) -১.৭০ (৮) -১.৯২ (৮) -১.৬০ (৮) ৮ম

ছকটি পড়ার নিয়ম:

  • স্কোর: ব্র্যাকেটের বাইরের সংখ্যাটি হলো গভর্ন্যান্স স্কোর (-২.৫ থেকে +২.৫)। স্কোর যত বেশি (+) হবে, সুশাসন তত ভালো।

  • ক্রম: ব্র্যাকেটের ভেতরের সংখ্যাটি (১-৮) হলো সার্ক দেশগুলোর মধ্যে ওই ক্যাটাগরিতে দেশটির অবস্থান


প্রধান পর্যবেক্ষণসমূহ:

১. ভুটানের আধিপত্য: দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটান একমাত্র দেশ যার বেশিরভাগ স্কোর ধনাত্মক (+)। বিশেষ করে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ (Control of Corruption) সূচকে তারা বৈশ্বিক মানদণ্ডেও অনেক উন্নত (+১.১৬)।

২. ভারতের গণতান্ত্রিক শক্তি:Voice & Accountability (জবাবদিহিতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা) সূচকে ভারত এই অঞ্চলে শীর্ষে রয়েছে (+০.৩৪)। তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় তারা ভুটান ও মালদ্বীপের চেয়ে পিছিয়ে।

৩. বাংলাদেশের অবস্থান: বাংলাদেশ সরকারি কার্যকারিতা (Government Effectiveness) এবং আইনের শাসনে (Rule of Law) পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় ৬ষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে।

৪. আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ: দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে Political Stability (রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা) সূচকটি সবার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ, যেখানে ভুটান ও মালদ্বীপ বাদে সবার স্কোরই বেশ নিম্নমুখী।

আপনার গবেষণার বিষয় SOPCitizen Charter বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের Government Effectiveness (বর্তমানে ৬ষ্ঠ) এবং Regulatory Quality সূচক দুটিতে ভারত বা শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব।

আপনি কি কোনো নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে (যেমন: সরকারি কার্যকারিতা) বাংলাদেশের সাথে ভারতের গত ১০ বছরের একটি বিশদ গ্রাফ বা তুলনামূলক ডাটা দেখতে চান?


Previous
Previous

সুশাসন সূচকে সার্কভুক্ত দেশের তুলনা(৫)

Next
Next

বৈশ্বিক ১২টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে বাংলাদেশ এর অবস্থান (৩)