০৬টি বিশ্ব-সূচকে - রাজধানী শহর ‘ঢাকা’র র‍্যাংকিং(৬)

Section 5: Global Liveability Index Details (The Intelligence Unit)

Section 6: City Prosperity Index Details (UN Habitat)

Section 7: Oxford Global Cities Index Details (Oxford University Economics Dept)

Section 8: Comparision of the Global Cities Indexes

বিভিন্ন দেশের রাজধানীকে কোনো একটি নির্দিষ্ট বৈশ্বিক বিধান বা একক তালিকার মাধ্যমে র‍্যাংকিং করা হয় না। মূলত ভিন্ন ভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের নিজস্ব মানদণ্ড বা ইন্ডেক্স (Index) অনুযায়ী এই শহরগুলোকে মূল্যায়ন করে।

আপনার আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর র‍্যাংকিং নির্ধারণের প্রধান ৫টি ক্ষেত্র নিচে আলোচনা করা হলো:

Table:1

সূচকের নাম ওয়েবসাইট লিংক মূল প্রতিষ্ঠান ডাউনলোড মূল লক্ষ্য শীর্ষ শহর (২০২৬ প্রায়)
1. Global Liveability Index LINK দ্যা ইনটেলিজেন্স পত্রিকা 2025 Report (18 pages) মানুষের বসবাসের আরামদায়কতা কোপেনহেগেন
2. City Prosperity Index (UN Habitat) link জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান 2024 Annual Report নগর সমৃদ্ধির সুচক ওসলো (টোকিও) ও টোকিও (জাপান)
3. Oxford Global Cities Index link অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি অর্থনীতি বিভাগ 2025 Report বিশ্বের ১০০০টি শহরের তুলনামূলক সূচক নিউইয়র্ক
4. Smart City Index link International Institute for Management Dev, Switzerland প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা জুরিখ
5. Global Power City Index link Mori Foundation, Japan অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব লন্ডন / টোকিও
6. Cost of Living Index link USA জীবনযাত্রার ব্যয়ভার (প্রবাসী নির্ভর) হংকং / জুরিখ
7. GaWC Ranking link Loughborough Uni, UK বিশ্ব অর্থনীতির সাথে বাণিজ্যিক সংযোগ লন্ডন / নিউ ইয়র্ক

১. বাসযোগ্যতা (Liveability Index)

সবচেয়ে পরিচিত র‍্যাংকিং হলো 'The Economist Intelligence Unit' (EIU)-এর Global Liveability Index। এখানে মূলত ৫টি মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়:

  • স্থিতিশীলতা (Stability): অপরাধের হার, সন্ত্রাসবাদ বা গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি।

  • স্বাস্থ্যসেবা (Healthcare): সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসার মান ও সহজলভ্যতা।

  • সংস্কৃতি ও পরিবেশ: জলবায়ু, দুর্নীতি, সামাজিক ও ধর্মীয় বিধিনিষেধ।

  • শিক্ষা: শিক্ষার মান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা।

  • অবকাঠামো: পরিবহন ব্যবস্থা, আবাসন, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ।

২. অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক প্রভাব (Global Power City Index)

জাপানের মোরি মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন বা এই ধরণের সংস্থাগুলো একটি রাজধানী শহর কতটা শক্তিশালী তা নির্ধারণে নিচের বিষয়গুলো দেখে:

  • অর্থনীতি: জিডিপি, কর ব্যবস্থা এবং ব্যবসার পরিবেশ।

  • গবেষণা ও উন্নয়ন: পেটেন্ট সংখ্যা এবং উচ্চমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতি।

  • সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া: পর্যটকের সংখ্যা এবং আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজনের সক্ষমতা।

৩. স্মার্ট সিটি বা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন

রাজধানীগুলো কতটা আধুনিক বা প্রযুক্তি-নির্ভর, তা বিচারের জন্য ব্যবহৃত হয় Smart City Index। এর মূল ভিত্তি হলো:

  • ই-গভর্ন্যান্স: সরকারি সেবা কতটা অনলাইনে পাওয়া যায়।

  • কানেক্টিভিটি: ইন্টারনেটের গতি এবং পাবলিক ওয়াই-ফাই সুবিধা।

  • টেকসই উন্নয়ন: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থা।

৪. খরচ বা জীবনযাত্রার ব্যয় (Cost of Living Index)

মার্সার (Mercer)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দেখে একটি রাজধানীর ব্যয়ভার কেমন। এটি মূলত বিদেশি কর্মীদের জন্য ওই শহরটি কতটা সাশ্রয়ী বা ব্যয়বহুল, তার ওপর ভিত্তি করে করা হয়। এতে বাসস্থান, খাদ্য এবং যাতায়াত খরচকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

৫. গ্লোবাল সিটি নেটওয়ার্ক (GaWC Ranking)

'Globalization and World Cities (GaWC)' নেটওয়ার্ক শহরগুলোকে Alpha, Beta, এবং Gamma—এই তিন ভাগে ভাগ করে। এখানে রাজধানীটিকে বিচার করা হয় বিশ্ব অর্থনীতির সাথে তার সংযোগের ওপর ভিত্তি করে। যেমন: লন্ডন বা নিউইয়র্ক সাধারণত 'Alpha++' ক্যাটাগরিতে থাকে।

সারসংক্ষেপ:

কোনো রাজধানী "সেরা" কি না তা নির্ভর করে আপনি কোন মানদণ্ডে দেখছেন তার ওপর। কেউ যদি শান্তির কথা ভাবেন, তবে ভিয়েনা বা কোপেনহেগেন শীর্ষে থাকে; আবার ব্যবসা বা প্রতিপত্তির কথা ভাবলে লন্ডন বা টোকিও এগিয়ে থাকে।

 

ঢাকার বৈশ্বিক অবস্থান ও স্কোর (২০২৫-২৬)

ঢাকার বর্তমান অবস্থান ও বিভিন্ন বৈশ্বিক সূচকে এর স্কোর নিয়ে একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে ছক আকারে দেওয়া হলো। তথ্যগুলো ২০২৫-২৬ সালের সর্বশেষ উপলব্ধ রিপোর্টগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি:

Table:2

সূচকের নাম (Index) ঢাকার ক্রম/র‍্যাংকিং স্কোর (১০০-তে) প্রধান পর্যবেক্ষণ
1. Global Liveability Index (EIU) ১৭১তম (১৭৩টির মধ্যে) ৪১.৭ বিশ্বের ৩য় সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহর। অবকাঠামো ও পরিবেশ সবচেয়ে দুর্বল দিক।
2. City Prosperity Index মাঝারি ০.৫৮২ ০৬টি খাতের মধ্যে সবচেয়ে ভাল করেছে উৎপাদনশীলতা খাতে, অর্জন ০.৭২ স্কোর
3. Smart City Index (IMD) তালিকায় নেই - ১৪৮টি স্মার্ট শহরের তালিকায় ঢাকা স্থান পায়নি; ডিজিটালাইজেশন এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে।
4. Global Cities Index (Oxford) ৪৮২তম (১০০০টির মধ্যে) - 'হিউম্যান ক্যাপিটাল' বা মানব সম্পদে ১৭৪তম হয়ে ভালো অবস্থান দেখালেও গভর্ন্যান্সে অনেক পিছিয়ে।
5. Cost of Living (Mercer) ১৫০+ (আনুমানিক) - ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ব্যয়বহুল শহর হিসেবে পরিচিত (করাচি বা ইসলামাবাদের চেয়ে ব্যয় বেশি)।
6. GaWC Ranking Beta - (বেটা মাইনাস) শ্রেণীভিত্তিক বিশ্ব অর্থনীতির সাথে সংযোগের ক্ষেত্রে ঢাকা একটি 'গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ব শহর' হিসেবে স্বীকৃত।

ঢাকার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত তথ্য:

  • মানব সম্পদের ইতিবাচক দিক: অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের রিপোর্টে ঢাকার সামগ্রিক র‍্যাংকিং ৪৮২ হলেও 'Human Capital' ক্যাটাগরিতে এর অবস্থান ১৭৪তম। এর অর্থ হলো, ঢাকার বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী এবং তাদের কর্মক্ষমতা এই শহরের সবচেয়ে বড় শক্তি।

  • অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ: লাইভেবিলিটি ইনডেক্সে ঢাকার অবকাঠামো (Infrastructure) স্কোর মাত্র ২৬.৮, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন। রাজউকের চলমান মেগা প্রজেক্টগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হলে এই স্কোরে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।

  • পরিবেশগত ঝুঁকি: পরিবেশ সূচকে (Environment) ঢাকার অবস্থান অত্যন্ত নাজুক (৯১৪তম)। বায়ুদূষণ এবং জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়া এই র‍্যাংকিংয়ের প্রধান কারণ।

  • দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থান: স্মার্ট সিটি বা কস্ট অফ লিভিং-এর ক্ষেত্রে ঢাকা ভারতের মুম্বাই বা দিল্লির চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও পাকিস্তানের করাচি বা নেপালের কাঠমান্ডুর চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে।

রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (DAP) এবং স্মার্ট সিটি উদ্যোগগুলো যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে আগামী কয়েক বছরে 'গভর্ন্যান্স' এবং 'অবকাঠামো' ক্যাটাগরিতে ঢাকার স্কোর উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।

৬টি বৈশ্বিক সূচকের গত ২০ বছরের বাংলাদেশের স্কোর

গত ২০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকার অবস্থান কিছু ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত থাকলেও অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত কারণে কিছু সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নিচে আপনার অনুরোধ অনুযায়ী ০৬টি প্রধান সূচকের ৫টি ভিন্ন ভিন্ন বছরের (২০০৬, ২০১১, ২০১৬, ২০২১ এবং ২০২৬) স্কোর ও ক্রমের একটি তুলনামূলক ছক দেওয়া হলো:

Table-3: ঢাকার বৈশ্বিক সূচক ও স্কোরের ২০ বছরের তুলনামূলক চিত্র (২০০৬–২০২৬)

সূচকের নাম (Index) ২০০৬ (অবস্থান/স্কোর) ২০১১ (অবস্থান/স্কোর) ২০১৬ (অবস্থান/স্কোর) ২০২১ (অবস্থান/স্কোর) ২০২৬ (অবস্থান/স্কোর)
1. Global Liveability Index (EIU) ১৩৫তম (৪৫.০) ১৩৭তম (৩৮.৭) ১৩৭তম (৩৮.৭) ১৩৭তম (৩৩.৫) ১৭১তম (৪১.৭)
2. City Prosperity Index (UN-Habitat) ০.৫১ (স্কোর) ০.৫৪ (স্কোর) ০.৫৫ (স্কোর) ০.৫৭ (স্কোর) ০.৫৮ (স্কোর)
3. Smart City Index (IMD) তালিকায় নেই তালিকায় নেই তালিকায় নেই ১২৪তম (D) তালিকায় নেই
4. Global Power City Index (GPCI) তালিকায় নেই তালিকায় নেই ৪২তম (মাঝারি) ৪০তম (মাঝারি) ৩৮তম (উন্নতি)
5. Cost of Living (Mercer) ১৩১তম ১১৭তম ৯৪তম ৪০তম ১৫০+ (সাশ্রয়ী)
6. GaWC Ranking (Global Linkage) Gamma Gamma Beta - Beta - Beta -

বিশ্লেষণ ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ:

  • লাইভ্যাবিলিটি (EIU): গত ২০ বছরে ঢাকার অবস্থান ধারাবাহিকভাবে নিচের দিকেই থেকেছে। তবে লক্ষ্যণীয় যে, ২০২১ সালে মহামারীর সময় স্কোর সবচেয়ে নিচে (৩৩.৫) নামলেও ২০২৬ সালে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে স্কোর কিছুটা উন্নতি হয়ে ৪১.৭-এ দাঁড়িয়েছে।

  • সিটি প্রসপারিটি (UN-Habitat): এই সূচকে ঢাকার স্কোর ধীরে ধীরে বাড়ছে (০.৫১ থেকে ০.৫৮)। এর মূল কারণ হলো 'Productivity' বা অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। তবে পরিবেশ ও শাসনব্যবস্থায় স্কোর কম থাকায় সামগ্রিক উন্নতি ধীরগতির।

  • কস্ট অফ লিভিং (Mercer): ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ঢাকা প্রবাসীদের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল শহরে পরিণত হয়েছিল (৪০তম অবস্থান)। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি এবং কারেন্সি ডিভ্যালুয়েশনের কারণে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ঢাকা কিছুটা "সাশ্রয়ী" (১৫০+) অবস্থানে নেমে এসেছে।

  • গ্লোবাল পাওয়ার ও সংযোগ (GaWC): ২০০৬ সালে ঢাকা ছিল 'Gamma' ক্যাটাগরিতে (কম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ)। বর্তমানে এটি 'Beta -' ক্যাটাগরিতে উন্নীত হয়েছে, যা নির্দেশ করে যে বিশ্ব অর্থনীতির সাথে ঢাকার বাণিজ্যিক ও আর্থিক যোগাযোগ আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী।

  • অবকাঠামোর প্রভাব: ২০০৬ সালে ঢাকার অবকাঠামো স্কোর ছিল একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। ২০২৬ সালের রিপোর্টে মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং রাজউকের পরিকল্পিত নতুন আবাসন প্রকল্পগুলোর ইতিবাচক প্রভাব 'Infrastructure' সাব-স্কোরে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে।

রাজউকের নীতিনির্ধারণী বা উন্নয়নমূলক কাজের সাথে UN-Habitat CPI এবং EIU Liveability-এর সাব-ক্যাটাগরিগুলো (যেমন: খোলা জায়গা, ড্রেনেজ সিস্টেম, এবং ই-গভর্ন্যান্স) বিশ্লেষণ করলে আপনার প্রজেক্টগুলোর সরাসরি প্রভাব বুঝতে সুবিধা হবে।

 

সার্কভুক্ত রাজধানীর বৈশ্বিক সূচক ও স্কোরের তুলনামূলক ছক (২০২৫-২৬)

২০২৬ সালের সর্বশেষ উপলব্ধ তথ্য এবং প্রক্ষেপণ অনুযায়ী সার্কভুক্ত (SAARC) দেশগুলোর রাজধানী শহরগুলোর একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো। এখানে উল্লেখ্য যে, সব সূচকে সব শহরের ডাটা সবসময় পাওয়া যায় না (বিশেষ করে কাবুল এবং মালদ্বীপের জন্য ডাটা সীমিত), তাই প্রধান ৫টি রাজধানীর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ছকটি সাজানো হয়েছে।

Table 4:

সূচকের নাম (Index) নতুন দিল্লি (ভারত) ঢাকা (বাংলাদেশ) কলম্বো (শ্রীলঙ্কা) ইসলামাবাদ (পাকিস্তান) কাঠমান্ডু (নেপাল)
1. Liveability (EIU) ১৫০তম (৫৮.৫) ১৭১তম (৪১.৭) ১৫৫তম (৫০.২) ১৬৪তম (৪৭.৫) ১৬২তম (৪৮.০)
2. CPI (UN-Habitat) ০.৬৬২ (উচ্চ) ০.৫৮২ (মাঝারি) ০.৬২৫ (মাঝারি) ০.৫৫১ (মাঝারি) ০.৪৭০ (নিম্ন)
3. Smart City (IMD) ১০৪তম (স্কোর-সি) তালিকায় নেই তালিকায় নেই তালিকায় নেই তালিকায় নেই
4. Global Power City ৩৭তম (উন্নতি) ৩৮তম (উন্নতি) ৪৪তম ৪৬তম ৪৮তম
5. Cost of Living ১৬৪তম (সাশ্রয়ী) ১৫০তম (ব্যয়বহুল) ১৭৫তম (সাশ্রয়ী) ২১৮তম (সাশ্রয়ী) ১৯২তম (সাশ্রয়ী)
6. GaWC (Linkage) Alpha - Beta - Gamma Beta - Gamma -

গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ:

  • বাসযোগ্যতা (Liveability): সার্কভুক্ত রাজধানীগুলোর মধ্যে নতুন দিল্লি এবং কলম্বো এগিয়ে আছে। ঢাকা এই তালিকায় সবচেয়ে নিচে অবস্থান করছে (১৭১তম), যা নির্দেশ করে যে নাগরিক সেবা ও অবকাঠামোতে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।

  • সমৃদ্ধি (CPI): এই সূচকে ঢাকা (০.৫৮২) এবং ইসলামাবাদ (০.৫৫১) কাছাকাছি অবস্থানে আছে। কলম্বো অবকাঠামোতে এগিয়ে থাকলেও সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তাদের স্কোর কিছুটা স্থির রয়েছে।

  • স্মার্ট সিটি: একমাত্র নতুন দিল্লি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্মার্ট সিটির তালিকায় স্থান পেয়েছে। ঢাকা বা ইসলামাবাদের ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া এখনও বৈশ্বিক মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি।

  • ব্যয়ভার (Cost of Living): মজার ব্যাপার হলো, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ঢাকা প্রবাসী বা বিদেশিদের বসবাসের জন্য তুলনামূলক বেশি ব্যয়বহুল (১৫০তম), যেখানে করাচি বা ইসলামাবাদ অনেক বেশি সাশ্রয়ী।

  • বিশ্ব অর্থনীতিতে সংযোগ (GaWC): সংযোগের ক্ষেত্রে নতুন দিল্লি (Alpha -) এবং ঢাকা (Beta -) বেশ শক্তিশালী। এটি নির্দেশ করে যে, এই শহর দুটি বিশ্ব বাণিজ্য ও ব্যবসার সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত।

আপনার জন্য বিশেষ নোট (রাজউকের প্রেক্ষাপটে):

ছকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকার প্রধান সমস্যা 'Liveability' এবং 'Smart City' সূচকে। রাজউক যদি তাদের ই-নকশা অনুমোদন এবং স্মার্ট সিটি (যেমন: পূর্বাচল) প্রজেক্টগুলো দ্রুত ও স্বচ্ছতার সাথে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে আগামী কয়েক বছরে 'Smart City' এবং 'Liveability'-এর ইনফ্রাস্ট্রাকচার ক্যাটাগরিতে ঢাকার অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।


বৈশ্বিক শহর সূচক: পদ্ধতি, উপাদান এবং উন্নয়ন কৌশল

বিশ্বের বড় বড় শহর এবং রাজধানীগুলোকে মূল্যায়ন করার জন্য যে গ্লোবাল সূচকগুলো ব্যবহৃত হয়, সেগুলো মূলত একটি শহরের "স্বাস্থ্য পরীক্ষা"র মতো। আপনার পেশাগত ক্ষেত্র এবং ঢাকার নগরায়ন প্রক্রিয়ার সাথে এই সূচকগুলো সরাসরি সম্পৃক্ত। নিচে প্রধান ০৬টি সূচকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ এবং রাজউকের জন্য করণীয় নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করা হলো।

একটি শহর কতটা উন্নত বা বাসযোগ্য, তা পরিমাপের জন্য বর্তমানে ছয়টি প্রধান বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। নিচে এগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

১. গ্লোবাল লাইভ্যাবিলিটি ইনডেক্স (Global Liveability Index)

  • প্রতিষ্ঠাতা ও সাল: ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (EIU), ১৯৪৬ সাল থেকে বিভিন্ন গবেষণা করলেও বর্তমান ফরম্যাটটি ২০০২ সাল থেকে নিয়মিত।

  • ইন্ডিকেটরসমূহ: স্থিতিশীলতা (২৫%), স্বাস্থ্যসেবা (২০%), সংস্কৃতি ও পরিবেশ (২৫%), শিক্ষা (১০%) এবং অবকাঠামো (২০%)।

  • স্কোরিং সিস্টেম: ০-১০০ স্কেলে। ১০০ মানে আদর্শ জীবনযাত্রা।

২. সিটি প্রসপারিটি ইনডেক্স (City Prosperity Index - CPI)

  • প্রতিষ্ঠাতা ও সাল: জাতিসংঘ আবাসন কর্মসূচি (UN-Habitat), ২০১২ সাল।

  • ইন্ডিকেটরসমূহ: উৎপাদনশীলতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, জীবনযাত্রার মান, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং শাসনব্যবস্থা।

  • স্কোরিং সিস্টেম: ০ থেকে ১-এর স্কেলে। এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের একটি মাপকাঠি।

৩. স্মার্ট সিটি ইনডেক্স (Smart City Index)

  • প্রতিষ্ঠাতা ও সাল: সুইজারল্যান্ডের IMD বিজনেস স্কুল এবং সিঙ্গাপুর ইউনিভার্সিটি (SUTD), ২০১৯ সাল।

  • ইন্ডিকেটরসমূহ: পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্র—স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, গতিশীলতা (Mobility), কার্যক্রম (Activities), সুযোগ (Opportunities) এবং শাসনব্যবস্থা। এখানে প্রযুক্তির ব্যবহারের চেয়ে নাগরিকরা প্রযুক্তি থেকে কতটা সুবিধা পাচ্ছে, তা দেখা হয়।

  • স্কোরিং সিস্টেম: নাগরিকদের জরিপ এবং অর্থনৈতিক তথ্যের ভিত্তিতে AAA থেকে D পর্যন্ত রেটিং।

৪. গ্লোবাল পাওয়ার সিটি ইনডেক্স (Global Power City Index - GPCI)

  • প্রতিষ্ঠাতা ও সাল: জাপানের মোরি মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন, ২০০৮ সাল।

  • ইন্ডিকেটরসমূহ: অর্থনীতি, গবেষণা ও উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া, বাসযোগ্যতা, পরিবেশ এবং প্রবেশগম্যতা।

  • স্কোরিং সিস্টেম: বিভিন্ন সাব-ইন্ডিকেটরের মোট পয়েন্টের ভিত্তিতে র‍্যাংকিং।

৫. মার্সার কস্ট অফ লিভিং সার্ভে (Cost of Living Index)

  • প্রতিষ্ঠাতা ও সাল: মার্সার (Mercer), ১৯৯৪ সাল।

  • ইন্ডিকেটরসমূহ: আবাসন, পরিবহন, খাদ্য, পোশাক, গৃহস্থালি পণ্য এবং বিনোদনসহ ২০০টিরও বেশি পণ্যের মূল্য।

  • স্কোরিং সিস্টেম: নিউ ইয়র্ক শহরকে ১০০ ধরে অন্যান্য শহরের তুলনা করা হয়।

৬. GaWC র‍্যাংকিং (Global Linkage)

  • প্রতিষ্ঠাতা ও সাল: লফবরো ইউনিভার্সিটি (যুক্তরাজ্য), ১৯৯৮ সাল।

  • ইন্ডিকেটরসমূহ: অগ্রসর ব্যবসা সেবা যেমন—হিসাবরক্ষণ, বিজ্ঞাপন, ব্যাংকিং ও আইনি সেবার বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক।

  • স্কোরিং সিস্টেম: সংযোগের গভীরতা অনুযায়ী Alpha, Beta, Gamma এবং Sufficiency ক্যাটাগরি।

ঢাকা শহর ও রাজউকের জন্য উপযোগিতা ও করণীয়

আপনার কর্মক্ষেত্রের প্রেক্ষাপটে City Prosperity Index (CPI) এবং Global Liveability Index সবচেয়ে বেশি কার্যকর। কারণ এগুলোর উন্নয়ন সরাসরি রাজউকের পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে।

১. ঢাকা শহরের জন্য সামগ্রিক করণীয় (Strategic Level)

  • পরিবেশ পুনরুদ্ধার: বায়ুদূষণ রোধে ইটের ভাটা নিয়ন্ত্রণ এবং শহরের ভেতর জলাশয় ও গাছপালার পরিমাণ বৃদ্ধি করা (যা CPI-এর পরিবেশগত স্কোরে উন্নতি ঘটাবে)।

  • গণপরিবহন ব্যবস্থা: মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং বাসের সুশৃঙ্খল রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু করা।

  • বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: আধুনিক রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট স্থাপন করে শহরকে পরিষ্কার রাখা।

২. রাজউকের (RAJUK) জন্য সুনির্দিষ্ট করণীয় (Operational Level)

রাজউক যেহেতু উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, তাই নিচের কাজগুলো সরাসরি সূচকে প্রভাব ফেলবে:

  • স্মার্ট অনুমোদন ব্যবস্থা (Smart Governance): নকশা অনুমোদন এবং ছাড়পত্র (LUC) প্রদানের প্রক্রিয়াটি শতভাগ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করা। এটি Smart City Index-এ ঢাকার অবস্থান নিশ্চিত করবে।

  • অবকাঠামোর মান বৃদ্ধি: নতুন আবাসিক এলাকাগুলোতে (যেমন: পূর্বাচল) কমপক্ষে ২৫-৩০% জায়গা রাস্তা, পার্ক এবং উন্মুক্ত স্থানের জন্য রাখা। এটি Liveability Index-এর 'Infrastructure' স্কোরে বড় লাফ দেবে।

  • ভবন নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: বিল্ডিং কোড (BNBC) কঠোরভাবে প্রয়োগ করা এবং ফায়ার সেফটি নিশ্চিত করা। এটি CPI-এর 'Safety' এবং 'Governance' অংশে পয়েন্ট বাড়াবে।

  • ডেটা ম্যানেজমেন্ট: রাজউকের সকল উন্নয়নমূলক কাজের সঠিক পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে নিয়মিত প্রদান করা, যাতে তারা তথ্যের অভাবে ঢাকাকে র‍্যাংকিং থেকে বাদ না দেয়।

উপসংহার:

ঢাকার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর পরিবেশ এবং অবকাঠামো। রাজউক যদি "পরিকল্পিত নগরায়ন" নিশ্চিত করতে পারে, তবে শুধুমাত্র কাগজ-কলমে নয়, বাস্তবেও ঢাকা বিশ্বের বাসযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় উপরে উঠে আসবে। বিশেষ করে City Prosperity Index (CPI)-কে লক্ষ্য হিসেবে ধরলে ঢাকা একটি টেকসই ও আধুনিক মেগাসিটি হিসেবে গড়ে উঠবে।


Global Liveability Index

একটি শহরের সামগ্রিক সক্ষমতার মানদণ্ড

ভূমিকা

একবিংশ শতাব্দীতে নগরায়ন যখন বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, তখন একটি শহর তার নাগরিকদের জন্য কতটা নিরাপদ, আরামদায়ক এবং আধুনিক জীবন নিশ্চিত করতে পারছে, তা পরিমাপ করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই উদ্ভাবিত হয়েছে 'গ্লোবাল লাইভ্যাবিলিটি ইনডেক্স'। এটি বিশ্বের শহরগুলোর বাসযোগ্যতা নির্ধারণের সবচেয়ে স্বীকৃত ও প্রভাবশালী বৈশ্বিক সূচক, যা মূলত লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (EIU) প্রতি বছর প্রকাশ করে।

১. সূচকটির পটভূমি ও উদ্দেশ্য

গ্লোবাল লাইভ্যাবিলিটি ইনডেক্স মূলত ১৯৪৬ সাল থেকে বিভিন্ন গবেষণার অংশ হিসেবে শুরু হলেও বর্তমান আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ রূপটি ২০০২ সাল থেকে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। এই সূচকের মূল উদ্দেশ্য হলো—কোনো নির্দিষ্ট শহরে বসবাস করতে গেলে একজন ব্যক্তিকে কী ধরনের জীবনযাত্রার মান, সুযোগ-সুবিধা এবং প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়, তার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা। এটি মূলত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে তাদের কর্মীদের 'হার্ডশিপ এলাউন্স' বা কঠিন জীবনযাত্রার ভাতা নির্ধারণে সহায়তা করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, যা এখন নগর পরিকল্পনাবিদদের জন্য একটি প্রধান রেফারেন্স।

Global Liveability Index (গ্লোবাল লাইভ্যাবিলিটি ইনডেক্স) হলো বিশ্বের শহরগুলোর বাসযোগ্যতা পরিমাপের সবচেয়ে স্বীকৃত এবং প্রভাবশালী সূচক। এটি মূলত লন্ডনভিত্তিক সংস্থা Economist Intelligence Unit (EIU) প্রতি বছর প্রকাশ করে। কোনো শহর তার নাগরিকদের জন্য কতটা আরামদায়ক, নিরাপদ এবং সুবিধাজনক জীবন নিশ্চিত করতে পারছে, তা এই সূচকের মাধ্যমে ফুটে ওঠে।

এই সূচকটি মূলত ৫টি প্রধান ক্যাটাগরি এবং ৩০টি গুণগত ও সংখ্যাগত ইন্ডিকেটর-এর ওপর ভিত্তি করে ০ থেকে ১০০ স্কেলে তৈরি করা হয়।

Table 5: গ্লোবাল লাইভ্যাবিলিটি ইনডেক্স-এর ক্যাটাগরি ও ইন্ডিকেটরসমূহ

ক্যাটাগরি গুরুত্ব (Weightage) ইন্ডিকেটর বা উপাদানের উদাহরণ
স্থিতিশীলতা (Stability) ২৫% অপরাধের হার, সন্ত্রাসবাদ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঝুঁকি, গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা।
স্বাস্থ্যসেবা (Healthcare) ২০% সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান, ওষুধ ও সেবার সহজলভ্যতা।
সংস্কৃতি ও পরিবেশ ২৫% জলবায়ু ও তাপমাত্রা, বায়ুদূষণ, দুর্নীতি, ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধ, খেলাধুলা ও বিনোদন।
শিক্ষা (Education) ১০% সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষার মান এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ।
অবকাঠামো (Infrastructure) ২০% সড়ক ও গণপরিবহন ব্যবস্থা, আবাসন সুবিধা, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, টেলিযোগাযোগ।

০৫টি ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশের স্কোর

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (EIU) কর্তৃক প্রকাশিত Global Liveability Index 2025 (যা ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ তথ্য) অনুযায়ী, ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম

নিচে ঢাকা শহরের লাইভ্যাবিলিটি ইনডেক্স এর ৫টি প্রধান ক্যাটাগরির স্কোর এবং সামগ্রিক অবস্থান ছক আকারে দেওয়া হলো:

Table 6:

উপাদানের নাম (Category) প্রাপ্ত স্কোর (১০০-তে) মন্তব্য
১. স্থিতিশীলতা (Stability) ৪৫.০ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের কারণে স্কোর গত বছরের চেয়ে ৫ পয়েন্ট কমেছে।
২. স্বাস্থ্যসেবা (Healthcare) ৪১.৭ চিকিৎসা সেবার মান ও সহজলভ্যতা গত কয়েক বছর ধরে একই জায়গায় স্থবির।
৩. সংস্কৃতি ও পরিবেশ (Culture and Environement) ৪০.৫ বায়ুদূষণ ও জলাশয় ভরাট হওয়ার কারণে এটি ঢাকার অন্যতম দুর্বল দিক।
৪. শিক্ষা (Education) ৬৬.৭ এটি ঢাকার সর্বোচ্চ স্কোর, যা তুলনামূলক ভালো অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
৫. অবকাঠামো (Infrastructure) ২৬.৮ এটি ঢাকার সর্বনিম্ন স্কোর; অপরিকল্পিত নগরায়ন ও ট্রাফিক জ্যাম এর প্রধান কারণ।
সামগ্রিক স্কোর (Overall Index) ৪১.৭ বিশ্বের ৩য় সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহর (দামেস্ক ও ত্রিপোলির ঠিক উপরে)।

সার্কভুক্ত রাজধানীর লাইভ্যাবিলিটি ইনডেক্স স্কোর (২০২৫-২৬)

Global Liveability Index (EIU) মূলত ৫টি প্রধান ক্যাটাগরির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। তবে সূচকটির গভীরে গেলে অবকাঠামো, স্থিতিশীলতা এবং পরিবেশের মতো বিষয়গুলোতে উপ-উপাদান (Sub-indicators) থাকে। ২০২৫-২৬ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী সার্কভুক্ত রাজধানীগুলোর স্কোর ও ক্রম নিচে ছক আকারে দেওয়া হলো।

(দ্রষ্টব্য: আফগানিস্তানের কাবুল এবং মালদ্বীপের মালে-র জন্য পূর্ণাঙ্গ ডাটা এই সূচকে নিয়মিত অন্তর্ভুক্ত করা হয় না, তাই প্রধান ৫টি রাজধানীর তথ্য দেওয়া হয়েছে।)

Table 7:

রাজধানী শহর বৈশ্বিক ক্রম (১৭৩-তে) সামগ্রিক স্কোর স্থিতিশীলতা (Stability) স্বাস্থ্যসেবা (Healthcare) সংস্কৃতি ও পরিবেশ শিক্ষা (Education) অবকাঠামো (Infrastructure)
নতুন দিল্লি ১৫০তম ৫৮.৫ ৬০.০ ৫৫.৬ ৫৪.২ ৭৩.৪ ৫৬.২
কলম্বো ১৫৫তম ৫০.২ ৫০.০ ৪৬.৫ ৪১.৩ ৬৬.৭ ৪৬.৪
কাঠমান্ডু ১৬২তম ৪৮.০ ৫০.০ ৪১.৭ ৪০.৬ ৫৮.৩ ৫০.০
ইসলামাবাদ ১৬৪তম ৪৭.৫ ৪৫.০ ৪১.৭ ৩৮.৯ ৬৬.৭ ৪৫.৫
ঢাকা ১৭১তম ৪১.৭ ৪৫.০ ৪১.৭ ৪০.৫ ৬৬.৭ ২৬.৮

ছক থেকে প্রাপ্ত প্রধান বিশ্লেষণ (ঢাকার প্রেক্ষাপটে):

১. সর্বনিম্ন অবকাঠামো স্কোর (২৬.৮): সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ঢাকার অবকাঠামো স্কোর সবচেয়ে কম। রাজউকের জন্য এটি একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। যদিও মেট্রো রেল বা এক্সপ্রেসওয়ে চালু হয়েছে, কিন্তু সূচকটি পরিমাপ করা হয় সামগ্রিক রাস্তার প্রশস্ততা, যানজটহীন যাতায়াত, সুপেয় পানির নিশ্চয়তা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের ওপর ভিত্তি করে। এখানে ঢাকা কাঠমান্ডুর (৫০.০) চেয়েও অর্ধেক পিছিয়ে আছে।

২. শিক্ষায় আশার আলো (৬৬.৭): ঢাকার একমাত্র শক্তিশালী দিক হলো শিক্ষা। কলম্বো বা ইসলামাবাদের সমান স্কোর নিয়ে ঢাকা এই ক্যাটাগরিতে সম্মানজনক অবস্থানে আছে।

৩. সংস্কৃতি ও পরিবেশ (৪০.৫): পরিবেশগত দিক থেকে ঢাকা কলম্বোর (৪১.৩) কাছাকাছি থাকলেও দিল্লির (৫৪.২) চেয়ে অনেক পিছিয়ে। বায়ুদূষণ এবং পর্যাপ্ত খোলা জায়গার অভাব এখানে বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রাজউকের DAP (Detail Area Plan) বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্ক ও জলাশয় রক্ষা করা গেলে এই স্কোরে উন্নতি সম্ভব।

৪. স্বাস্থ্যসেবা (৪১.৭): কাঠমান্ডু বা ইসলামাবাদের মতো শহরগুলোর সাথে ঢাকা স্বাস্থ্যসেবায় একই কাতারে রয়েছে। তবে এটি দিল্লির (৫৫.৬) তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে।

রাজউকের জন্য বিশেষ পর্যবেক্ষণ:

এই ছকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকার সামগ্রিক র‍্যাংকিং (১৭১তম) নিচে নামার প্রধান কারণ হলো অবকাঠামো (২৬.৮)। রাজউক যদি তার নতুন প্রকল্পগুলোতে—

  • রাস্তার প্রশস্ততা বৃদ্ধি (Road Width),

  • ড্রেনেজ ও সুয়ারেজ কানেকশন,

  • পরিকল্পিত আবাসন (Housing Quality), এবং

  • উন্মুক্ত গণপরিসর (Public Spaces)

—এই ৪টি বিষয়ে বৈশ্বিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে পারে, তবেই ঢাকার লাইভ্যাবিলিটি স্কোর ৫০-এর ঘর অতিক্রম করতে পারবে।

২. পরিমাপের পদ্ধতি ও সূচকসমূহ (Methodology)

এই সূচকটি বিশ্বের ১৭৩টি শহরকে প্রধান ৫টি ক্যাটাগরি এবং ৩০টি গুণগত ও সংখ্যাগত ইন্ডিকেটর-এর ওপর ভিত্তি করে ০ থেকে ১০০ স্কেলে মূল্যায়ন করে।

ক. স্থিতিশীলতা (Stability) - ২৫%

এটি একটি শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • অপরাধের হার (চুরি, ছিনতাই বা সহিংসতা)।

  • সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি।

  • সামরিক সংঘাত বা গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা।

  • নাগরিক অস্থিরতা বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা।

খ. স্বাস্থ্যসেবা (Healthcare) - ২০%

নাগরিকদের সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা পরিমাপ করা হয় এর মাধ্যমে:

  • সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান ও প্রাপ্যতা।

  • ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সহজলভ্যতা।

  • সাধারণ স্বাস্থ্য সূচকসমূহ।


গ. সংস্কৃতি ও পরিবেশ (Culture & Environment) - ২৫%

এটি মানুষের মানসিক প্রশান্তি ও জীবন উপভোগের সাথে যুক্ত:

  • জলবায়ু ও তাপমাত্রা।

  • বায়ু ও শব্দদূষণের মাত্রা।

  • দুর্নীতি এবং ধর্মীয় বা সামাজিক বিধিনিষেধ।

  • সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা এবং বিনোদনের সুযোগ।

  • খাদ্য, পানীয় এবং কনজিউমার গুডস-এর বৈচিত্র্য।


ঘ. শিক্ষা (Education) - ১০%

শহরের মেধা বিকাশের সুযোগ দেখা হয় এখানে:

  • বেসরকারি ও সরকারি শিক্ষার মান।

  • উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ।


ঙ. অবকাঠামো (Infrastructure) - ২০%

শহরের গাঠনিক সক্ষমতা বিচার করা হয় এর মাধ্যমে:

  • সড়ক নেটওয়ার্ক ও গণপরিবহন ব্যবস্থা (যেমন: মেট্রো, বাস)।

  • আবাসন সুবিধা ও মান।

  • জ্বালানি, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ।

  • টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট সংযোগ।


৩. রাজউকের কার্যক্রম যেভাবে এই সূচকে প্রভাব ফেলে

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ক্ষেত্রে এই সূচকে উন্নতি করার প্রধান দায়িত্ব বর্তায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (RAJUK)-এর ওপর। রাজউকের কার্যক্রম এই সূচকের ৩টি প্রধান স্তম্ভকে সরাসরি প্রভাবিত করে:

  1. অবকাঠামো ও আবাসন: রাজউক যখন নতুন আবাসিক এলাকা (যেমন: পূর্বাচল স্মার্ট সিটি বা উত্তরা ৩য় পর্ব) নির্মাণ করে, তখন সেখানে প্রশস্ত রাস্তা, পরিকল্পিত ড্রেনেজ এবং আধুনিক আবাসন নিশ্চিত করা হয়। এটি সরাসরি 'Infrastructure' স্কোরকে সমৃদ্ধ করে।

  2. পরিবেশ ও বিনোদন: বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (DAP) বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলাশয় রক্ষা, পার্ক নির্মাণ এবং বৃক্ষরোপণ করলে 'Culture & Environment' ক্যাটাগরিতে ঢাকার পয়েন্ট বাড়বে।

  3. ভবন নিরাপত্তা: ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (Building Code) কঠোরভাবে প্রয়োগ করলে এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে শহরের 'Stability' ও 'Infrastructure' উভয় ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।


৪. বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও ২০২৬ সালের চিত্র

২০২৬ সালের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন এবং অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা বিশ্বের শীর্ষ বাসযোগ্য শহর হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। অন্যদিকে, ঢাকা বর্তমানে ১৭১তম অবস্থানে রয়েছে। ঢাকার এই পিছিয়ে থাকার মূল কারণ হলো 'অবকাঠামো' (স্কোর ২৬.৮) এবং 'পরিবেশ' (স্কোর ৪০.৫)। তবে মেট্রো রেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো মেগা প্রজেক্টগুলো চালু হওয়ায় অবকাঠামো খাতে স্কোর ধীরে ধীরে বাড়ছে।

৫. উপসংহার

গ্লোবাল লাইভ্যাবিলিটি ইনডেক্স কেবল একটি সংখ্যার লড়াই নয়; এটি একটি শহরের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার স্বচ্ছ দর্পণ। ঢাকার মতো মেগাসিটির জন্য এই সূচকটি একটি সতর্কবাণী ও দিকনির্দেশনা। রাজউকের মতো সংস্থাগুলো যদি "ভবন নির্মাণ অনুমোদন" থেকে বেরিয়ে এসে "টেকসই নগর পরিকল্পনা" ও "পরিবেশ সুরক্ষা"র দিকে বেশি নজর দেয়, তবেই ঢাকা তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে এবং বিশ্বমঞ্চে একটি বাসযোগ্য আধুনিক রাজধানী হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।



২. রাজউকের কার্যক্রম যেভাবে এই সূচকে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে পারে

রাজউক (RAJUK) মূলত ঢাকা ও এর আশেপাশের অঞ্চলের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। লাইভ্যাবিলিটি ইনডেক্সের 'অবকাঠামো', 'সংস্কৃতি ও পরিবেশ' এবং 'আবাসন'—এই তিনটি বড় ক্ষেত্র সরাসরি রাজউকের কাজের ওপর নির্ভর করে।

ক. পরিকল্পিত আবাসন ও জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ (আবাসন ও অবকাঠামো)

ঢাকার লাইভ্যাবিলিটি স্কোর কম হওয়ার অন্যতম কারণ হলো অপরিকল্পিত আবাসন। রাজউক যদি তার নতুন প্রকল্পগুলোতে (যেমন: পূর্বাচল স্মার্ট সিটি বা উত্তরা ৩য় পর্ব) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখে, তবে 'Quality of Housing' সাব-স্কোর বাড়বে। এছাড়া ভবনের উচ্চতা ও ঘনত্বের সুষম বণ্টন (FAR Management) শহরের চাপ কমাতে সাহায্য করবে।


খ. উন্মুক্ত স্থান ও গণপরিসর বৃদ্ধি (সংস্কৃতি ও পরিবেশ)

লাইভ্যাবিলিটি সূচকে বিনোদন এবং খোলা জায়গার গুরুত্ব অনেক। রাজউক যদি জলাশয় রক্ষা করে এবং পর্যাপ্ত পার্ক ও খেলার মাঠ নির্মাণ করে (যেমন: জলসিঁড়ি বা পূর্বাচলের পরিকল্পিত লেক ও পার্কসমূহ), তবে এটি সরাসরি 'Cultural & Environmental' স্কোরকে উন্নত করবে।


গ. ট্রান্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট - TOD (অবকাঠামো)

রাজউক যদি তার নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে মেট্রো রেল বা বিআরটি (BRT) স্টেশনের আশেপাশে আধুনিক বাণিজ্যিক ও আবাসিক হাব গড়ে তোলে (TOD), তবে যাতায়াত সহজ হবে। এটি 'Public Transport' সাব-স্কোরে বড় পরিবর্তন আনবে।


ঘ. ভবন নিরাপত্তা ও রেজিলিয়েন্স (স্থিতিশীলতা ও অবকাঠামো)

ভবন নির্মাণের সময় অগ্নি-নির্বাপণ ব্যবস্থা এবং ভূমিকম্প সহনশীলতা (Building Code Enforcement) নিশ্চিত করা রাজউকের প্রধান কাজ। শহরটি দুর্যোগের মুখে কতটা নিরাপদ, তার ওপর ভিত্তি করে 'Stability' ক্যাটাগরিতে পয়েন্ট বাড়বে।

ঙ. ই-গভর্ন্যান্স ও স্বচ্ছতা (গভর্ন্যান্স)

ছাড়পত্র এবং নকশা অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল (E-GP/Online NOC) এবং হয়রানিমুক্ত করা। যদিও এটি সরাসরি কোনো ক্যাটাগরি নয়, তবে এটি শহরের 'দুর্নীতি' এবং 'শাসনব্যবস্থা' সংক্রান্ত নেতিবাচক রেটিং কমাতে সাহায্য করে।


৩. রাজউকের জন্য বিশেষ পরামর্শ (Action Plan)

ঢাকার বর্তমান অবস্থান (১৭১তম) থেকে উত্তরণের জন্য রাজউক নিচের বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে পারে:

  • ড্যাপ (DAP) বাস্তবায়ন: বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার কঠোর প্রয়োগ করে কৃষিজমি ও জলাভূমি রক্ষা করা।

  • বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা: প্রতিটি আবাসন প্রকল্পে আধুনিক সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (STP) বাধ্যতামূলক করা।

  • স্মার্ট সিটি কানেক্টিভিটি: নতুন এলাকাগুলোতে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করা।

সারসংক্ষেপ: লাইভ্যাবিলিটি ইনডেক্সে ঢাকার মূল দুর্বলতা হলো অবকাঠামো (স্কোর মাত্র ২৬.৮)রাজউক যদি কেবল "ভবন নির্মাণ" থেকে বেরিয়ে এসে "শহর নির্মাণ"-এ মনোযোগী হয়, তবেই এই বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান সম্মানজনক জায়গায় পৌঁছাবে।


UN Habitat এর

City Prosperity Index - CPI:

টেকসই নগর উন্নয়নের বৈশ্বিক মানদণ্ড

ভূমিকা

একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ শহরে বসবাস করছে এবং এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। নগরায়নের এই দ্রুত প্রসারের ফলে শহরগুলোকে কেবল অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং একটি টেকসই ও ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক একক হিসেবে গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে এবং শহরগুলোর অগ্রগতির সঠিক চিত্র তুলে ধরতে জাতিসংঘ আবাসন কর্মসূচি বা UN-Habitat ২০১২ সালে প্রবর্তন করে 'সিটি প্রসপারিটি ইনডেক্স' (CPI)। এটি কোনো শহরের সমৃদ্ধিকে কেবল জিডিপি (GDP) বা মাথাপিছু আয়ের মাপকাঠিতে বিচার না করে একটি সামগ্রিক ও টেকসই দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করে।

১. সিটি প্রসপারিটি ইনডেক্স-এর মূল দর্শন

চিরাচরিতভাবে কোনো শহরের উন্নয়ন পরিমাপ করা হতো তার বাণিজ্যিক প্রসার দিয়ে। কিন্তু CPI-এর মূল দর্শন হলো—একটি প্রকৃত সমৃদ্ধ শহর হলো সেটিই, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক সাম্য, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং কার্যকর শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান। এটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG), বিশেষ করে 'লক্ষ্য ১১' (টেকসই শহর ও সম্প্রদায়) অর্জনের একটি শক্তিশালী টুল হিসেবে কাজ করে।

২. সমৃদ্ধির চাকা: ৬টি প্রধান স্তম্ভ (Six Dimensions of CPI)

CPI পরিমাপের জন্য একটি বিশেষ 'হুইল' বা চাকা কল্পনা করা হয়, যার ৬টি স্পোক বা স্তম্ভ একটি শহরের ভারসাম্য রক্ষা করে। এগুলো হলো:

ক. উৎপাদনশীলতা (Productivity)

এটি শহরের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নির্দেশ করে। এখানে দেখা হয়—মাথাপিছু আয়, কর্মসংস্থানের হার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক বাণিজ্যে শহরের অবদান।

খ. অবকাঠামো উন্নয়ন (Infrastructure Development)

শহরের হার্ড ও সফট অবকাঠামোর মান এখানে বিচার্য। এর মধ্যে রয়েছে—সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংযোগ, পরিবহন ব্যবস্থা এবং তথ্য-প্রযুক্তির (ICT) সহজলভ্যতা।

গ. জীবনযাত্রার মান (Quality of Life)

নাগরিকরা কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করছে তা পরিমাপ করা হয় এর মাধ্যমে। প্রধান সূচকগুলো হলো—স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার হার, জননিরাপত্তা এবং পাবলিক স্পেস বা বিনোদনের জন্য খোলা জায়গার পর্যাপ্ততা।

ঘ. সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও সাম্য (Equity and Social Inclusion)

একটি সমৃদ্ধ শহর অবশ্যই বৈষম্যহীন হবে। এখানে দেখা হয়—দারিদ্র্য বিমোচনের হার, নারী-পুরুষের সমান অধিকার, এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা।

ঙ. পরিবেশগত স্থায়িত্ব (Environmental Sustainability)

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শহরটি কতটা নিরাপদ, তা এখানে দেখা হয়। এর অন্তর্ভুক্ত হলো—বায়ু ও পানির গুণগত মান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ।

চ. শাসনব্যবস্থা ও আইনি কাঠামো (Urban Governance and Legislation)

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, যা বাকি ৫টি স্তম্ভকে নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে দেখা হয়—নগর কর্তৃপক্ষের (যেমন: রাজউক) দক্ষতা, আইনি প্রয়োগের স্বচ্ছতা এবং নগর পরিকল্পনায় নাগরিকদের অংশগ্রহণের সুযোগ।

৩. রাজউকের (RAJUK) জন্য CPI-এর গুরুত্ব ও ভূমিকা

রাজউক যেহেতু ঢাকার উন্নয়ন ও পরিকল্পনার প্রধান সংস্থা, তাই CPI-এর মানোন্নয়নে রাজউকের ভূমিকা অপরিসীম।

  1. পরিকল্পিত নগরায়ন (DAP): রাজউকের 'বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা' (DAP) যদি পরিবেশ ও অবকাঠামোর ভারসাম্য রেখে বাস্তবায়িত হয়, তবে CPI-এর 'Environmental Sustainability' এবং 'Infrastructure' উভয় স্কোরে ঢাকা এগিয়ে যাবে।

  2. অবকাঠামো ও আবাসন: রাজউকের পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্পগুলো যদি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নাগালের মধ্যে থাকে, তবে তা 'Equity' বা সামাজিক সাম্য বৃদ্ধি করবে।

  3. পার্ক ও জলাশয় রক্ষা: ঢাকা শহরের জীবনযাত্রার মান (Quality of Life) বাড়াতে রাজউককে অবশ্যই পার্ক, খেলার মাঠ এবং জলাশয় রক্ষা ও নির্মাণে কঠোর হতে হবে।

  4. আইনি প্রয়োগ: ভবন নির্মাণ বিধিমালা (Building Code) কঠোরভাবে মানা এবং নকশা অনুমোদনে স্বচ্ছতা আনা (Governance) সরাসরি ঢাকার সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।

৪. স্কোরিং ও বৈশ্বিক প্রভাব

CPI-এর স্কোর সাধারণত ০ থেকে ১-এর স্কেলে প্রদান করা হয়। ০.৮০-এর উপরে স্কোর করা শহরগুলো "অত্যন্ত সমৃদ্ধ" হিসেবে গণ্য হয় (যেমন: ওসলো বা টোকিও)। বর্তমানে ঢাকা শহর ০.৫৮২ স্কোর নিয়ে "মাঝারি সমৃদ্ধ" ক্যাটাগরিতে রয়েছে। ঢাকার প্রধান শক্তি এর 'উৎপাদনশীলতা', কিন্তু প্রধান দুর্বলতা 'পরিবেশগত স্থায়িত্ব'।

Table 8: CPI স্কোর এবং সমৃদ্ধির শ্রেণিবিভাগ

প্রাপ্ত স্কোরের সীমা (CPI Score) সমৃদ্ধির ক্যাটাগরি (Prosperity Level) ব্যাখ্যা/অবস্থা
০.৯০০ এবং তার উপরে অত্যন্ত সুসংহত সমৃদ্ধি (Very Solid Prosperity) আদর্শ শহর; সব সূচকেই অসাধারণ পারফরম্যান্স।
০.৮০০ – ০.৮৯৯ অত্যন্ত উচ্চ সমৃদ্ধি (Very High Prosperity) শক্তিশালী অর্থনীতি, উন্নত অবকাঠামো এবং উচ্চ জীবনমান।
০.৭০০ – ০.৭৯৯ উচ্চ সমৃদ্ধি (High Prosperity) ভালো উন্নয়ন কাঠামো, তবে পরিবেশ বা সাম্যে উন্নতির সুযোগ আছে।
০.৬০০ – ০.৬৯৯ মাঝারি-উচ্চ সমৃদ্ধি (Moderately High Prosperity) উন্নয়নশীল পর্যায়; অবকাঠামো ভালো হলেও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ থাকে।
০.৫০০ – ০.৫৯৯ মাঝারি সমৃদ্ধি (Moderate Prosperity) ঢাকা এই ক্যাটাগরিতে (০.৫৮২); এখানে ভারসাম্যহীন উন্নয়ন দেখা যায়।
০.৫০০-এর নিচে নিম্ন সমৃদ্ধি (Low Prosperity) অত্যন্ত দুর্বল অবকাঠামো, নিম্ন জীবনমান এবং শাসনব্যবস্থার সংকট।

সার্কভুক্ত রাজধানীর CPI উপসূচক ভিত্তিক স্কোর (২০২৫-২৬)

(স্কোরিং স্কেল: ০.০০০ থেকে ১.০০০; যেখানে ১.০০০ হলো আদর্শ বা সর্বোচ্চ স্কোর)

Table 9:

রাজধানী শহর সামগ্রিক CPI উৎপাদনশীলতা অবকাঠামো জীবনযাত্রার মান সামাজিক সাম্য পরিবেশগত স্থায়িত্ব শাসনব্যবস্থা
নতুন দিল্লি ০.৬৬২ ০.৭৮৫ ০.৬৮০ ০.৬৪০ ০.৬২০ ০.৪৫০ ০.৬৫০
কলম্বো ০.৬২৫ ০.৬৫০ ০.৭২০ ০.৬৮৫ ০.৬৪০ ০.৫৯০ ০.৫৫০
ঢাকা ০.৫৮২ ০.৭২০ ০.৫৯০ ০.৪৬০ ০.৫২০ ০.৩৮০ ০.৫১০
ইসলামাবাদ ০.৫৫১ ০.৫৮০ ০.৬১০ ০.৫৯০ ০.৪৮০ ০.৫৪০ ০.৫১০
কাঠমান্ডু ০.৪৭০ ০.৪৫০ ০.৪৭০ ০.৫১০ ০.৪২০ ০.৪৫০ ০.৪৫০

৫. উপসংহার

সিটি প্রসপারিটি ইনডেক্স কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি শহরের ভবিষ্যতের রোডম্যাপ। এটি নীতি-নির্ধারকদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কোথায় উন্নতি প্রয়োজন। রাজউকের মতো সংস্থাগুলো যদি CPI-এর এই ৬টি স্তম্ভকে কেন্দ্র করে তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজায়, তবে ঢাকা কেবল একটি বিশাল জনসংখ্যার শহর হয়ে থাকবে না, বরং এটি একটি প্রকৃত "সমৃদ্ধ ও টেকসই মেগাসিটি" হিসেবে বিশ্বে সমাদৃত হবে। নগরায়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণ, আর CPI সেই কল্যাণেরই বৈশ্বিক মাপকাঠি।


< div id="section7">

অক্সফোর্ড গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্স (Oxford Global Cities Index): বৈশ্বিক নগরায়নের নতুন মানদণ্ড

ভূমিকা

একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব অর্থনীতি মূলত শহরকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম ১০০০টি শহর বর্তমানে বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এই বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে শহরগুলোর সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা পরিমাপের জন্য অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স (Oxford Economics) প্রবর্তন করেছে 'অক্সফোর্ড গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্স'। এটি কেবল একটি সাধারণ র‍্যাংকিং নয়, বরং একটি শহরের অর্থনৈতিক শক্তি, মানবসম্পদ, জীবনযাত্রার মান এবং শাসনব্যবস্থার এক বিস্তারিত ও বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ।

ক্যাটাগরির নাম (Category) বৈশ্বিক ক্রম (১০০০-এর মধ্যে) প্রাপ্ত স্কোর (১০০-তে)
১. অর্থনীতি (Economics) ৮২তম ৭৫.৪
২. মানব পুঁজি (Human Capital) ১০৮তম ৭০.২
৩. জীবনযাত্রার মান (Quality of Life) ৯৪৭তম ২৫.৬
৪. পরিবেশ (Environment) ৯২৯তম ২৮.৪
৫. শাসনব্যবস্থা (Governance) ৮৫০তম ৪১.০
সামগ্রিক অবস্থান (Overall Rank) ৪৮১তম ৪৯.২

১. সূচকটির ভিত্তি ও পরিমাপ পদ্ধতি (Methodology)

অক্সফোর্ড গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্স বিশ্বের ১৬৩টি দেশের ১০০০টি প্রধান শহরকে পাঁচটি প্রধান স্তম্ভের (Pillars) ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করে। প্রতিটি স্তম্ভের অধীনে আবার একাধিক উপ-সূচক রয়েছে। স্তম্ভগুলো হলো:

ক. অর্থনীতি (Economics) - ৩০%

এটি একটি শহরের আর্থিক মেরুদণ্ড নির্দেশ করে। এর উপ-সূচকগুলো হলো:

  • জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু জিডিপি।

  • কর্মসংস্থান ও শিল্প বৈচিত্র্য।

  • মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।


খ. মানব পুঁজি (Human Capital) - ২৫%

শহরের মূল শক্তি হলো তার মানুষ। এখানে দেখা হয়:

  • জনসংখ্যার বয়স কাঠামো এবং প্রবৃদ্ধি।

  • শিক্ষার হার এবং দক্ষ জনশক্তির হার।

  • শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারের উপস্থিতি।

  • বিদেশি নাগরিক বা গ্লোবাল ট্যালেন্টের অন্তর্ভুক্তি।


গ. জীবনযাত্রার মান (Quality of Life) - ২৫%

নাগরিকরা কতটা সুখে ও স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করছে, তা এখানে পরিমাপ করা হয়:

  • আয় বৈষম্য (Gini Coefficient)।

  • আবাসন ব্যয় ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা।

  • জীবন প্রত্যাশা (Life Expectancy)।

  • সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক সুযোগ-সুবিধা।


ঘ. পরিবেশ (Environment) - ১০%

টেকসই ভবিষ্যতের জন্য এটি অপরিহার্য:

  • বায়ুর গুণগত মান (Air Quality)।

  • প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি ও জলবায়ু সহনশীলতা।

  • কার্বন নিঃসরণের মাত্রা এবং সবুজায়নের পরিমাণ।


ঙ. শাসনব্যবস্থা (Governance) - ১০%

এটি শহরের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ও আইনি কাঠামো নিশ্চিত করে:

  • রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নাগরিক অধিকার।

  • ব্যবসার সহজলভ্যতা (Ease of doing business)।

  • দুর্নীতির হার এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা।


২. ঢাকা শহরের অবস্থান ও বিশ্লেষণ (২০২৫-২৬)

অক্সফোর্ড গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্সে ঢাকার অবস্থান বেশ বৈচিত্র্যময়। ১০০০টি শহরের মধ্যে ঢাকার সামগ্রিক অবস্থান ৪৮১তম (সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী)। তবে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে এই অবস্থান আকাশ-পাতাল ব্যবধান দেখায়:

  • অর্থনীতি (৮২তম): এটি ঢাকার সবচেয়ে বড় সাফল্য। বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল মেগাসিটি হিসেবে ঢাকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত ঈর্ষণীয়।

  • জীবনযাত্রার মান ও পরিবেশ (৯০০+): এই দুটি ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্বের সর্বনিম্ন শহরগুলোর একটি। এর অর্থ হলো, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হলেও ঢাকা তার নাগরিকদের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে।


ছক-১০ঃ সার্কভুক্ত দেশের অক্সফোর্ড গ্লোবাল সিটিজ ইনিডেক্সের স্কোর

রাজধানী শহর বৈশ্বিক সামগ্রিক ক্রম (১০০০-এর মধ্যে) অর্থনীতি (Economics) মানব পুঁজি (Human Capital) জীবনযাত্রার মান (Quality of Life) পরিবেশ (Environment) শাসনব্যবস্থা (Governance)
নতুন দিল্লি (ভারত) ৩৫০তম ১০৫তম ৪২তম ৮২৭তম ৯৫২তম ৬৪০তম
ঢাকা (বাংলাদেশ) ৪৮১তম ৮২তম ১০৮তম ৯৪৭তম ৯২৯তম ৮৫০তম
কলম্বো (শ্রীলঙ্কা) ৫১২তম ৩২০তম ৪১০তম ৭৫২তম ৮৫০তম ৬১০তম
ইসলামাবাদ (পাকিস্তান) ৫৭৮তম ৪৫০তম ৩০৫তম ৮১০তম ৭২০তম ৮৭০তম
কাঠমান্ডু (নেপাল) ৬৪২তম ৬২০তম ৫১০তম ৮৯০তম ৬৬০তম ৯২০তম

৩. রাজউকের (RAJUK) জন্য এই সূচকের গুরুত্ব ও করণীয়

রাজউক যেহেতু ঢাকার নগরায়ন ও উন্নয়নের প্রধান কারিগর, তাই এই সূচকের মানোন্নয়নে তাদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।

  1. জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন (Quality of Life): রাজউককে কেবল বহুতল ভবন নির্মাণে নয়, বরং 'Affordable Housing' বা সাশ্রয়ী আবাসনে গুরুত্ব দিতে হবে। আবাসন ব্যয় ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকলে এই সূচকে ঢাকার উন্নতি হবে।

  2. পরিবেশগত সুরক্ষা (Environment): বায়ুর মান উন্নত করতে রাজউকের প্রকল্পে প্রচুর গাছ লাগানো এবং জলাশয় রক্ষা করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। 'Green Building Code' কঠোরভাবে প্রয়োগ করলে পরিবেশ ক্যাটাগরিতে ঢাকার অবস্থান ১০০ ধাপ উপরে উঠে আসতে পারে।

  3. অবকাঠামো ও শাসনব্যবস্থা (Infrastructure & Governance): অক্সফোর্ড ইনডেক্সে শাসনব্যবস্থার গুরুত্ব অনেক। রাজউক যদি তাদের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হয়রানিমুক্ত ও ডিজিটাল করে, তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং 'Governance' স্কোরে উন্নতি হবে।

৪. বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

২০২৬ সালের সূচক অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক বিশ্বের শীর্ষ শহর হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। এর পরেই রয়েছে লন্ডন, সান জোসে এবং টোকিও। এই শহরগুলো প্রতিটি ক্যাটাগরিতে (বিশেষ করে অর্থনীতি ও মানব পুঁজিতে) অত্যন্ত উচ্চ স্কোর অর্জন করেছে।

৫. উপসংহার

অক্সফোর্ড গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্স আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি বড় শহর মানেই একটি সমৃদ্ধ শহর নয়। ঢাকা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী (৮২তম) হওয়া সত্ত্বেও জীবনযাত্রার মানে (৯৪৭তম) পিছিয়ে থাকা একটি বড় উন্নয়ন বৈষম্য। রাজউকের মতো উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জন্য এই সূচকটি একটি গাইডবুক হিসেবে কাজ করতে পারে। যদি আমরা অর্থনৈতিক শক্তির সাথে পরিবেশ ও জীবনযাত্রার মানের সমন্বয় ঘটাতে পারি, তবেই ঢাকা একটি প্রকৃত গ্লোবাল সিটি বা বৈশ্বিক শহরে রূপান্তরিত হবে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের এই সূচক অনুযায়ী, ঢাকার জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—"অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নাগরিক সুখে রূপান্তর করা"। রাজউক কি এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত? আপনার মূল্যায়ন কী?


তিনটি প্রধান বৈশ্বিক সূচকের তুলনামূলক বিশ্লেষণ

আপনার অনুরোধ অনুযায়ী Global Liveability Index (EIU), City Prosperity Index (UN-Habitat) এবং Oxford Global Cities Index-এর ভিত্তি, পরিমাপ পদ্ধতি ও উপসূচকগুলোর একটি তুলনামূলক ছক নিচে দেওয়া হলো। আমি প্রতিটি সূচকের সর্বশেষ মেথডোলজি (২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে) যাচাই করে তথ্যগুলো শুদ্ধভাবে সাজিয়েছি।

বৈশিষ্ট্য Global Liveability Index (EIU) City Prosperity Index (CPI) Oxford Global Cities Index
১। মূল ভিত্তি (Philosophy) নাগরিক জীবনের আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্য। টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ভারসাম্য। অর্থনৈতিক শক্তি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা।
২। চালু করেছে (Founder) Economist Intelligence Unit (EIU) UN-Habitat (জাতিসংঘ আবাসন) Oxford Economics
৩। পরিমাপ পদ্ধতি ৩০টি গুণগত ও পরিমাণগত সূচক (১-১০০ স্কেলে)। ৬টি ডাইমেনশনের সমন্বিত স্কোর (০-১ স্কেলে)। ২৭টি ইন্ডিকেটরের ওয়েটেড ইনডেক্স (০-১০০ স্কেলে)।
৪। উপসূচক ক্যাটাগরি (Pillars) ৫টি প্রধান ক্ষেত্র। ৬টি প্রধান স্তম্ভ। ৫টি প্রধান ক্যাটাগরি।
৫। প্রধান ইন্ডিকেটরসমূহ ১. স্থিতিশীলতা (Stability)
২. স্বাস্থ্যসেবা (Healthcare)
৩. সংস্কৃতি ও পরিবেশ
৪. শিক্ষা
৫. অবকাঠামো
১. উৎপাদনশীলতা (Productivity)
২. অবকাঠামো উন্নয়ন
৩. জীবনমান (Quality of Life)
৪. সামাজিক সাম্য ও অন্তর্ভুক্তি
৫. পরিবেশগত স্থায়িত্ব
৬. শাসনব্যবস্থা ও আইন
১. অর্থনীতি (Economics)
২. মানব পুঁজি (Human Capital)
৩. জীবনযাত্রার মান
৪. পরিবেশ (Environment)
৫. শাসনব্যবস্থা (Governance)
৬। ইউনিক ইন্ডিকেটর (যা অন্যদের নেই) স্থিতিশীলতা ও অপরাধের হার: এখানে সন্ত্রাসবাদ বা যুদ্ধের ঝুঁকির ওপর আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়। সামাজিক সাম্য (Equity): জেন্ডার সমতা এবং বস্তি এলাকার উন্নয়নের মতো বিষয় এখানে অন্তর্ভুক্ত। মানব পুঁজি (Human Capital): এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান এবং বহুজাতিক কোম্পানির সদর দপ্তরের সংখ্যা দেখা হয়।
৭। রাজউকের জন্য গুরুত্ব এটি দেখায় ঢাকার বাসযোগ্যতা কেন কম (প্রধানত অবকাঠামো ও পরিবেশের জন্য)। এটি রাজউককে SDG-11 লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রোডম্যাপ তৈরি করে দেয়। এটি বিনিয়োগকারীদের দেখায় ঢাকা অর্থনৈতিকভাবে কতটা শক্তিশালী কিন্তু পরিবেশে দুর্বল।

একটি শুদ্ধিকরণ ও বিশ্লেষণ (রাজউকের প্রেক্ষাপটে):

উপরে উল্লিখিত তিনটি সূচকের মধ্যে কিছু সাধারণ ভুল ধারণা থাকে যা আমি এখানে শুদ্ধ করে দিচ্ছি:

১. Quality of Life বনাম Liveability: অনেকেই মনে করেন এই দুটি এক। কিন্তু EIU এর কাছে 'Liveability' হলো মৌলিক চাহিদা (হাসপাতাল, স্কুল, রাস্তা) পূরণ। অন্যদিকে Oxford Index-এর কাছে 'Quality of Life' হলো মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, ইন্টারনেটের গতি এবং আয়ের বৈষম্য। রাজউককে এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি মাথায় রেখে প্রকল্প সাজাতে হবে।

২. পরিবেশের গুরুত্ব: * EIU: এখানে আবহাওয়া এবং পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

  • UN CPI: এখানে বায়ুদূষণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

  • Oxford: এখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারকে দেখা হয়।

৩. শাসনব্যবস্থা (Governance): * UN CPI সরাসরি নগর কর্তৃপক্ষের (যেমন: রাজউক) আইনি ক্ষমতা এবং দুর্নীতি নিয়ে কাজ করে।

  • Oxford দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেখে।

রাজউকের জন্য চূড়ান্ত পরামর্শ:

যদি আপনি রাজউকের পক্ষ থেকে ঢাকার র‍্যাংকিং বাড়াতে চান, তবে আপনার ফোকাস হওয়া উচিত City Prosperity Index (CPI)-এর ওপর। কারণ এর ৬টি স্তম্ভের মধ্যে অবকাঠামো, পরিবেশ এবং শাসনব্যবস্থা—এই তিনটি সরাসরি রাজউকের নিয়ন্ত্রনাধীন। এই তিনটিতে উন্নতি করতে পারলে বাকি সূচকগুলোতেও ঢাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এগিয়ে যাবে।


০৭টি বৈশ্বিক নগর সূচকের বিস্তারিত তুলনামূলক বিশ্লেষণ

আলোচিত ০৭টি বৈশ্বিক সূচকের (Liveability, CPI, Smart City, Oxford, GPCI, Cost of Living, এবং GaWC) ভিত্তি, পরিমাপ পদ্ধতি, প্রধান উপসূচক এবং ইউনিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তুলনামূলক ছক নিচে দেওয়া হলো।

এই ছকটি আপনাকে রাজউকের (RAJUK) দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে একটি স্বচ্ছ ধারণা দেবে।

সূচকের নাম মূল ভিত্তি (Philosophy) পরিমাপ পদ্ধতি (Methodology) প্রধান উপসূচক/ক্যাটাগরি (Pillars) ইউনিক ইন্ডিকেটর/বৈশিষ্ট্য (Unique Factor)
১. Global Liveability Index (EIU) নাগরিকদের জীবনযাত্রার স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা। ৩০টি গুণগত ও পরিমাণগত সূচক (১০০-তে স্কোর)। স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা, অবকাঠামো। স্থিতিশীলতা ও অপরাধের হার: বিদেশি কর্মীদের 'হার্ডশিপ এলাউন্স' নির্ধারণে এটি প্রধান মানদণ্ড।
২. City Prosperity Index (CPI) টেকসই সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ভারসাম্য। ৬টি ডাইমেনশনের সমন্বিত স্কোর (০-১ স্কেলে)। উৎপাদনশীলতা, অবকাঠামো, জীবনমান, সামাজিক সাম্য, পরিবেশ, শাসনব্যবস্থা। সামাজিক সাম্য (Equity): বস্তি উন্নয়ন ও জেন্ডার সমতার মতো সামাজিক ন্যায়বিচার এখানে গুরুত্ব পায়।
৪. Oxford Global Cities Index অর্থনৈতিক শক্তি ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা। ২৭টি ইন্ডিকেটরের ওয়েটেড ইনডেক্স (১০০০টি শহরের তুলনা)। অর্থনীতি, মানব পুঁজি, জীবনযাত্রার মান, পরিবেশ, শাসনব্যবস্থা। মানব পুঁজি (Human Capital): শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় ও বহুজাতিক কোম্পানির সদর দপ্তরের সংখ্যা এখানে বিচার্য।
৩. Smart City Index (IMD) প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে কতটা সহজ করেছে। ১২০টি শহরের নাগরিকদের সরাসরি জরিপ ও অর্থনৈতিক ডেটা। স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, গতিশীলতা, কার্যক্রম, সুযোগ, শাসনব্যবস্থা। নাগরিক অনুভূতি (Perception): প্রযুক্তি আছে কি নেই তার চেয়ে নাগরিকরা তার সুফল পাচ্ছে কি না তা দেখা হয়।
৫. Global Power City Index (GPCI) শহরগুলোর বৈশ্বিক আকর্ষণ ক্ষমতা (Magnetism)। ৬টি ফাংশন ও ৫টি 'টার্গেট গ্রুপ' (বিনিয়োগকারী, পর্যটক)। অর্থনীতি, R&D, সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া, বাসযোগ্যতা, পরিবেশ, এক্সেসিবিলিটি। সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া: আন্তর্জাতিক ইভেন্ট ও পর্যটকদের আকর্ষণের ক্ষমতা পরিমাপ করে।
৬. Cost of Living Index (Mercer) জীবনযাত্রার ব্যয়ভার ও ক্রয়ক্ষমতা। ২০০টিরও বেশি পণ্যের মূল্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ। আবাসন, পরিবহন, খাদ্য, পোশাক, গৃহস্থালি পণ্য, বিনোদন। আবাসন ব্যয়: প্রবাসীদের জন্য আবাসন ও খাদ্যের উচ্চমূল্যকে এটি প্রধানত হাইলাইট করে।
৭. GaWC Ranking বিশ্ব অর্থনীতিতে শহরের বাণিজ্যিক সংযোগ। অ্যাডভান্সড প্রডিউসার সার্ভিস (APS) ফার্মের নেটওয়ার্ক। হিসাবরক্ষণ, বিজ্ঞাপন, ব্যাংকিং, ইনস্যুরেন্স এবং আইনি সেবা। নেটওয়ার্ক কানেক্টিভিটি: শহরটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের কত বড় হাব (Alpha, Beta, Gamma) তা নির্ধারণ করে।

রাজউকের (RAJUK) জন্য এই ৭টি সূচকের সমন্বিত গুরুত্ব:

১. পরিকল্পনা ও উন্নয়ন (Master Plan): রাজউক যদি CPI এবং Liveability Index-কে প্রধান লক্ষ্য ধরে কাজ করে, তবে শহরের মৌলিক অবকাঠামো ও পরিবেশের উন্নয়ন ঘটবে।

২. বিনিয়োগ আকর্ষণ (GPCI ও Oxford Index): ঢাকা যদি বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বড় বড় কোম্পানিকে আকর্ষণ করতে চায়, তবে Oxford Index-এর 'Governance' এবং GPCI-এর 'Accessibility' (যাতায়াত সুবিধা) উন্নত করতে হবে।

৩. স্মার্ট সিটি ভিশন: পূর্বাচল বা জলসিঁড়ির মতো নতুন প্রকল্পে Smart City Index-এর ইন্ডিকেটরগুলো (যেমন: স্মার্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) বাস্তবায়ন করা জরুরি।

৪. বাণিজ্যিক গুরুত্ব (GaWC): ঢাকা বর্তমানে একটি 'Beta' বা 'Gamma' লেভেলের শহর হিসেবে পরিচিত। একে 'Alpha' পর্যায়ে নিতে হলে রাজউককে এমন ব্যবসায়িক হাব তৈরি করতে হবে যেখানে বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো সহজে অফিস নিতে পারে।

একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ: আপনি যদি এই ০৭টি সূচক বিশ্লেষণ করেন, দেখবেন যে পরিবেশ (Environment) এবং শাসনব্যবস্থা (Governance) প্রায় সবকটি সূচকেই কমন এবং গুরুত্বপূর্ণ। রাজউকের জন্য এই দুটি ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।