পজিটিভ পিস ইনডেক্স: টেকসই শান্তি ও সমৃদ্ধির নীল নকশা (২)

ভূমিকা

শান্তি কী? সাধারণ অর্থে আমরা মনে করি যুদ্ধ বা সংঘাতের অনুপস্থিতিই শান্তি। কিন্তু আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে এই ধারণাকে বলা হয় 'নেতিবাচক শান্তি' (Negative Peace)। প্রকৃত এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি কেবল অস্ত্রের নীরবতায় নয়, বরং সমাজের সুদৃঢ় কাঠামোর ওপর নির্ভর করে। এই গভীর ও ইতিবাচক ধারণাকেই বলা হয় 'পজিটিভ পিস' (Positive Peace)। ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (IEP) প্রবর্তিত এই সূচকটি একটি দেশের এমন সব প্রতিষ্ঠান এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিমাপ করে, যা কেবল সহিংসতা কমায় না, বরং সমাজকে সমৃদ্ধ ও স্থিতিস্থাপক করে তোলে।

পজিটিভ পিস-এর ভিত্তি: ৮টি স্তম্ভ ও ২৪টি নির্দেশক

পজিটিভ পিস ইনডেক্স মূলত ৮টি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি স্তম্ভের কার্যকারিতা বোঝার জন্য তিনটি করে মোট ২৪টি উপ-সূচক বা ইন্ডিকেটর ব্যবহার করা হয়। এই সূচকগুলো ১ থেকে ৫ এর স্কেলে পরিমাপ করা হয়, যেখানে ১ হলো শ্রেষ্ঠ এবং ৫ হলো দুর্বলতম অবস্থা।

নিচে পজিটিভ পিস ইনডেক্সের পূর্ণাঙ্গ কাঠামোটি ছক আকারে উপস্থাপন করা হলো:





পজিটিভ পিস ইনডেক্স: ২৪টি ইন্ডিকেটর ও স্কোরিং কাঠামো

ক্রম ৮টি মূল স্তম্ভ (Pillars) ২৪টি উপ-সূচক (Indicators) স্কোরিং ভিত্তি
সুশাসন ১. সরকারি কার্যকারিতা, ২. আইনের শাসন, ৩. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রশাসনিক দক্ষতা ও ন্যায়বিচার
দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ৪. সরকারি দুর্নীতি, ৫. বিচারিক দুর্নীতি, ৬. নির্বাহী দুর্নীতি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
তথ্যের অবাধ প্রবাহ ৭. প্রেস ফ্রিডম, ৮. মোবাইল সংযোগ, ৯. ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকার তথ্যের স্বচ্ছতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা
ব্যবসায়িক পরিবেশ ১০. মুদ্রাস্ফীতি, ১১. জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ১২. ব্যবসা করার সহজলভ্যতা অর্থনৈতিক সুযোগ ও স্থিতিশীলতা
উচ্চমানের মানবসম্পদ ১৩. মাধ্যমিক শিক্ষা, ১৪. গড় আয়ু, ১৫. বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান
অন্যের অধিকারের স্বীকৃতি ১৬. নারী অধিকার, ১৭. সংখ্যালঘু সুরক্ষা, ১৮. নাগরিক স্বাধীনতা সামাজিক সহনশীলতা ও অধিকার
প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক ১৯. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ২০. বিদেশি সহযোগিতা, ২১. কূটনৈতিক স্থায়িত্ব আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
সম্পদের সুষম বণ্টন ২২. আয় বৈষম্য (Gini), ২৩. দারিদ্র্য বিমোচন, ২৪. মৌলিক সেবার সমতা অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতা

কেন পজিটিভ পিস অপরিহার্য?

পজিটিভ পিস ইনডেক্স কেন একটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তার কিছু বিশেষ কারণ নিচে আলোচনা করা হলো:

১. স্থিতিস্থাপকতা (Resilience): উচ্চ পজিটিভ পিস সমৃদ্ধ দেশগুলো যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক মন্দা বা রাজনৈতিক ধাক্কা কাটিয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তাদের সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে না।

২. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: যেখানে দুর্নীতি কম এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ ভালো, সেখানে বিনিয়োগ বাড়ে। পজিটিভ পিস-এ এগিয়ে থাকা দেশগুলোর মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হার অন্য দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি।

৩. টেকসই উন্নয়ন: পজিটিভ পিস-এর স্তম্ভগুলো সরাসরি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে সহায়তা করে। এটি কেবল বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করে।

বাংলাদেশ ও পজিটিভ পিস-এর চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পজিটিভ পিস ইনডেক্স একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয়। আমাদের দেশে অনেক সময় 'নেতিবাচক শান্তি' বিরাজ করলেও 'পজিটিভ পিস'-এর স্তম্ভগুলো, বিশেষ করে সুশাসন, দুর্নীতি মুক্তি এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ—দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল রয়ে গেছে। ২০২৪-২৫ সালের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা প্রমাণ করেছে যে, যখন পজিটিভ পিস-এর স্তম্ভগুলো দুর্বল থাকে, তখন গ্লোবাল পিস ইনডেক্সেও বড় ধরনের অবনতি ঘটে।

বাংলাদেশ যদি ২০২৬ সালের মধ্যে পজিটিভ পিস ইনডেক্সে উন্নতি করতে চায়, তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির হার কমিয়ে আনা হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ।

উপসংহার

পজিটিভ পিস কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি সুস্থ সমাজের ডিএনএ। এটি আমাদের শেখায় যে, শান্তি কোনো স্থির অবস্থা নয়, বরং এটি অর্জনের জন্য প্রতিদিন প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার করতে হয় এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হয়। কোনো দেশ যদি পজিটিভ পিস-এর এই ৮টি স্তম্ভ শক্তিশালী করতে পারে, তবে সেই দেশে শান্তি হবে চিরস্থায়ী এবং সমৃদ্ধি হবে অনিবার্য।

আমি কি এই রচনার কোনো নির্দিষ্ট অংশকে আরও বিস্তারিত করতে পারি, অথবা ২০২৬ সালে বাংলাদেশের পজিটিভ পিস-এর লক্ষ্যমাত্রা কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে আলোকপাত করব?


পজিটিভ পিস ইনডেক্স (PPI) কেবল একটি পরিসংখ্যানিক তালিকা নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক দর্শন। এটি আমাদের শেখায় যে, শান্তি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সচেতন নির্মাণ। নিচে এর ইতিহাস, দর্শন এবং গ্লোবাল পিস ইনডেক্সের সাথে এর পার্থক্যের বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. পজিটিভ পিস-এর দর্শন (Philosophy)

পজিটিভ পিস-এর মূল দর্শন হলো—"শান্তি মানে কেবল সংঘাতের অনুপস্থিতি নয়, বরং এমন এক কাঠামোর উপস্থিতি যা সংঘাত তৈরি হতেই দেয় না।"

এই দর্শনের জনক হলেন বিখ্যাত শান্তি গবেষক জোহান গ্যালতুং (Johan Galtung)। তিনি ১৯৬০-এর দশকে দুটি ধারণা প্রবর্তন করেন:

  • নেতিবাচক শান্তি (Negative Peace): সরাসরি যুদ্ধের অনুপস্থিতি (যেমন: যুদ্ধবিরতি)। এটি ভঙ্গুর এবং যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।

  • ইতিবাচক শান্তি (Positive Peace): সমাজে ন্যায়বিচার, সাম্য এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি। যেখানে মানুষের অভাব নেই, অবিচার নেই, সেখানেই স্থায়ী শান্তি বিরাজ করে।

IEP-এর দৃষ্টিভঙ্গি: ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (IEP) এই দর্শনকে আধুনিক ডেটা সায়েন্সের সাথে যুক্ত করেছে। তাদের মতে, পজিটিভ পিস হলো একটি সমাজের "রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা" (Immunity)। শরীর সুস্থ থাকলে যেমন রোগ আক্রমণ করতে পারে না, তেমনি পজিটিভ পিস শক্তিশালী থাকলে সমাজে সংঘাত দানা বাঁধতে পারে না।

২. ইতিহাস ও সূচকের যাত্রা

  • সূচনা: জোহান গ্যালতুং ১৯৬০-এর দশকে এই তত্ত্ব দিলেও, এটিকে বৈজ্ঞানিক সূচক বা ইনডেক্সে রূপান্তর করে ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (IEP)

  • চালু হওয়ার সাল: পজিটিভ পিস ইনডেক্স (PPI) আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়।

  • উদ্দেশ্য: গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (GPI) যখন বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়, তখন দেখা গেল অনেক দেশ বর্তমানে শান্ত থাকলেও তাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামো খুব দুর্বল। এই শূন্যতা পূরণের জন্যই ২০১৩ সাল থেকে PPI চালু করা হয় যাতে দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদী টেকসই শান্তির সক্ষমতা মাপা যায়।

৩. গ্লোবাল পিস (GPI) ও পজিটিভ পিস (PPI)-এর পার্থক্য

ক্রম বৈশিষ্ট্য গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (GPI) পজিটিভ পিস ইনডেক্স (PPI)
মূল লক্ষ্য বর্তমান অবস্থা মাপা (দেশের শান্তি এখন কেমন)। সক্ষমতা মাপা (ভবিষ্যতে শান্তি বজায় রাখার শক্তি কেমন)।
দর্শন নেতিবাচক শান্তি: যুদ্ধ, সহিংসতা ও সংঘাতের অনুপস্থিতি। ইতিবাচক শান্তি: প্রতিষ্ঠান ও দৃষ্টিভঙ্গির গুণগত মান।
সূচকের ধরন ৩টি ডোমেইন ও ২৩টি সূচক (খুন, যুদ্ধ, অস্ত্র)। ৮টি স্তম্ভ ও ২৪টি নির্দেশক (সুশাসন, দুর্নীতি, শিক্ষা)।
প্রকৃতি এটি অনেকটা 'থার্মোমিটার'-এর মতো, যা বর্তমান তাপমাত্রা (অশান্তি) মাপায়। এটি অনেকটা 'স্বাস্থ্য পরীক্ষার' মতো, যা দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতা মাপায়।
স্থায়িত্ব এটি দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে (যেমন: হঠাৎ দাঙ্গা)। এটি খুব ধীরে পরিবর্তন হয় (প্রতিষ্ঠান গড়তে সময় লাগে)।
চালু হওয়ার সাল ২০০৭ সাল। ২০১৩ সাল।


কেন দুটিই গুরুত্বপূর্ণ?

ধরা যাক, একটি দেশে কঠোর একনায়কতন্ত্র চলছে। সেখানে ভয়ে কেউ রাস্তায় নামে না, মারামারি নেই। এই দেশটির GPI স্কোর খুব ভালো হতে পারে (কারণ বর্তমানে সহিংসতা নেই)। কিন্তু সেখানে মানুষের অধিকার নেই, সুশাসন নেই—অর্থাৎ তাদের PPI স্কোর খুব খারাপ হবে।

ফলাফল: PPI খারাপ হওয়ার কারণে যেকোনো সময় ওই দেশে গণবিস্ফোরণ ঘটতে পারে (যেমনটি আমরা আরব বসন্ত বা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে দেখেছি)।

সারসংক্ষেপ: GPI আমাদের বলে "আমরা এখন কোথায় আছি", আর PPI আমাদের বলে "আমরা কতদিন টিকে থাকব"

পজিটিভ পিস-এর এই ৮টি স্তম্ভের মধ্যে কোনটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন? আমরা কি সেই স্তম্ভটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে পারি?

পজিটিভ পিস ইনডেক্স (PPI) যেহেতু একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়, তাই এর র‍্যাঙ্কিং গ্লোবাল পিস ইনডেক্সের (GPI) মতো অত দ্রুত পরিবর্তন হয় না। তবে গত এক দশকে বাংলাদেশের সুশাসন, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সূচকগুলোয় ধারাবাহিক চ্যালেঞ্জ থাকায় স্কোর ও র‍্যাঙ্কিংয়ে বিশেষ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।

নিচে ২০১৩ সাল (সূচকটি চালুর বছর) থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের পজিটিভ পিস ইনডেক্স (PPI) এর একটি তুলনামূলক ছক দেওয়া হলো:

পজিটিভ পিস ইনডেক্স (PPI): বাংলাদেশের র‍্যাঙ্কিং ও স্কোর (২০১৩–২০২৫)


সারণী-০২ঃ পজিটিভ পিস ইন্ডেক্স এ বাংলাদেশের স্কোর ও র‍্যাংকিং

ক্রম বছর বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিং (Rank) স্কোর (Score) অবস্থা / মন্তব্য
২০১৩ ১১০ ৩.২৩১ সূচকটির প্রথম আনুষ্ঠানিক যাত্রা।
২০১৪ ১০৮ ৩.২১৫ সামান্য উন্নতি।
২০১৫ ১০৯ ৩.২২০ স্থিতিশীল।
২০১৬ ১১২ ৩.২৬৫ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে সামান্য অবনতি।
২০১৭ ১১৪ ৩.২৮২ -
২০১৮ ১১৭ ৩.৩১৪ সুশাসন ও দুর্নীতি সূচকে অবনতির প্রভাব।
২০১৯ ১২১ ৩.৩৮৫ -
২০২০ ১১৯ ৩.৩৭০ কিছুটা স্থিতিশীলতা।
২০২১ ১২১ ৩.৪০২ -
১০ ২০২২ ১২১ ৩.৪০৯ -
১১ ২০২৩ ১২০ ৩.৪০১ -
১২ ২০২৪ ১২৪ ৩.৪৭৫ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দুর্নীতি সূচকে প্রভাব।
১৩ ২০২৫ ১২৮ ৩.৫২২ প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতা ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জ।

তথ্য বিশ্লেষণ:

  • স্কোরিং পদ্ধতি: মনে রাখবেন, পজিটিভ পিস ইনডেক্সেও স্কোর ১ থেকে ৫ এর মধ্যে হয়। স্কোর যত বেশি (যেমন: ৩.৫২২), প্রাতিষ্ঠানিক শান্তি ও কাঠামো তত দুর্বল


  • ধারাবাহিক অবনতি: ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ১১০তম অবস্থানে থাকলেও ২০২৫ সালে এসে ১২৮তম অবস্থানে পৌঁছেছে। এর অর্থ হলো গত ১২ বছরে বাংলাদেশের পজিটিভ পিস-এর স্তম্ভগুলো (বিশেষ করে সুশাসন, দুর্নীতি মুক্তি এবং নাগরিক স্বাধীনতা) কাঙ্ক্ষিত হারে শক্তিশালী হয়নি।


  • GPI বনাম PPI: বাংলাদেশের গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (GPI) র‍্যাঙ্কিং মাঝে মাঝে অনেক ভালো হলেও (যেমন ২০২৩-এ ৮৮তম), পজিটিভ পিস ইনডেক্স সবসময়ই ১২০-এর আশেপাশে থেকেছে। এটি নির্দেশ করে যে বাংলাদেশের শান্তির ভিত্তি সবসময়ই কিছুটা ভঙ্গুর ছিল।

২০২৫ সালের বিশেষ প্রেক্ষাপট:

২০২৫ সালের রিপোর্টে বাংলাদেশের পজিটিভ পিস র‍্যাঙ্কিং ১২৮তম হওয়া মানে হলো, বর্তমানে আমাদের ৮টি স্তম্ভের মধ্যে 'সরকারের সুশাসন', 'দুর্নীতির নিম্ন হার' এবং 'নাগরিক অধিকার'—এই তিনটি ক্ষেত্রে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের চেয়ে আমরা পিছিয়ে আছি।


অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের কার্যক্রম ও পজিটিভ পিস ইন্ডেস্ক র‍্যাঙ্কিং

বর্তমান সংস্কার কার্যক্রম বাংলাদেশের পজিটিভ পিস ইনডেক্স (PPI)-এ ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না, সে বিষয়ে একটি বিশ্লেষণ ও মতামত নিচে তুলে ধরছিঃ


বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে 'পজিটিভ পিস'-এর স্তম্ভগুলো নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সংস্কারগুলো যদি সফল হয়, তবে ২০২৬ বা ২০২৭ সালের রিপোর্টে বাংলাদেশ বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটাতে পারে।

ইতিবাচক ফলাফলের কারণঃ

পজিটিভ পিস-এর ৮টি স্তম্ভের মধ্যে বর্তমানে যে প্রধান ৩টি স্তম্ভে কাজ হচ্ছে, তা সরাসরি র‍্যাঙ্কিং বদলে দিতে পারে:

১. সুশাসন ও আইনের শাসন (Well-functioning Government):

বর্তমানে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং জনপ্রশাসন সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা যদি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তবে 'সুশাসন' স্তম্ভে বাংলাদেশের স্কোর দ্রুত উন্নত হবে। পজিটিভ পিস-এর জন্য এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।

২. দুর্নীতি দমন (Low Levels of Corruption):

বাংলাদেশ গত এক দশকে এই একটি স্তম্ভে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে ছিল। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং আর্থিক খাতের (বিশেষ করে ব্যাংক ও রাজস্ব) সংস্কারগুলো যদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে, তবে পজিটিভ পিস স্কোরে বড় পরিবর্তন আসবে।

৩. তথ্যের অবাধ প্রবাহ (Free Flow of Information):

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং ডিজিটাল আইনের মতো বাধাগুলো দূর করার যে প্রক্রিয়া চলছে, তা সরাসরি 'ফ্রি ফ্লো অফ ইনফরমেশন' সূচককে উন্নত করবে। এটি বিশ্বদরবারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে।

বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ বা ঝুঁকি (The Risks)

তবে র‍্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি হওয়া কেবল সংস্কারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না; কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে:

  • আর্থিক স্থিতিশীলতা (Business Environment): মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি যদি স্থিতিশীল না হয়, তবে 'ব্যবসায়িক পরিবেশ' স্তম্ভটি দুর্বল হয়ে পড়বে, যা সামগ্রিক স্কোরকে টেনে নিচে নামাতে পারে।

  • সামাজিক মেরুকরণ: পজিটিভ পিস-এর একটি স্তম্ভ হলো 'অন্যের অধিকারের স্বীকৃতি'। যদি সমাজে অসহিষ্ণুতা বা মব জাস্টিস অব্যাহত থাকে, তবে এই সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে যেতে পারে।

  • সময়ক্ষেপণ: পজিটিভ পিস ইনডেক্সের তথ্যগুলো সাধারণত এক বছর আগের পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। তাই ২০২৪ বা ২৫-এর সংস্কারের পূর্ণ ফল হয়তো ২০২৬ বা ২০২৭ সালের রিপোর্টে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে।

চূড়ান্ত মতামত

বাংলাদেশ এখন "ভঙ্গুর স্থিতি" থেকে "টেকসই ভিত্তি" গড়ার পথে রয়েছে। গত ১২ বছরের PPI ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের শান্তির ভিত্তি ছিল বালির ওপর দাঁড়িয়ে—যা একটু ধাক্কাতেই (২০২৪-এর অস্থিরতা) ধসে পড়েছিল।

বর্তমান সংস্কারগুলো যদি শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন না হয়ে 'সিস্টেম পরিবর্তন' হয়, তবে বাংলাদেশ খুব শীঘ্রই পজিটিভ পিস ইনডেক্সে ১২৮তম অবস্থান থেকে ১০০-এর নিচে চলে আসার ক্ষমতা রাখে। এটি হলে বাংলাদেশ কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি রোল মডেল হয়ে দাঁড়াবে।


Previous
Previous

বৈশ্বিক ১২টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে বাংলাদেশ এর অবস্থান (৩)

Next
Next

গ্লোবাল পিস ইনডেক্স ও বাংলাদেশ (১)