গ্লোবাল পিস ইনডেক্স ও বাংলাদেশ (১)

সেকশান সূচিঃ

সেকশান ১ঃ ২০০৭ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত বাংলাদেশের গ্লোবাল স্কোর ও র‍্যাংকিং

সেকশান ২ঃ গ্লোবাল পিস ইনডেস্ক এর স্কেলিং, ২৩টি উপসূচক, সূচকের ব্যবহার

সেকশান ৩ঃ দক্ষিণ এশিয়ার র‍্যাংকিং

সেকশান ৪ঃ দক্ষিণ মুসলিম বিশ্বের র‍্যাংকিং

সেকশান ৫ঃ সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ১০টি দেশের তালিকা

সেকশান ৬ঃ জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্যের র‍্যাংকিং

সেকশান ৭ঃ শান্তি সূচকে সংস্কার কার্যক্রমের প্রভাব

সেকশান ৮ঃ কিভাবে শান্তি সূচকে বাংলাদেশের মান উন্নত করা যায়?

গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (GPI) বা বৈশ্বিক শান্তি সূচক হলো বিশ্বের দেশগুলোর আপেক্ষিক শান্তিপূর্ণ অবস্থা পরিমাপের একটি স্বীকৃত মানদণ্ড। এটি অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (IEP) প্রতিবছর প্রকাশ করে।

১. গ্লোবাল পিস ইনডেক্স কীভাবে পরিমাপ করা হয়?

GPI পরিমাপের জন্য মোট ২৩টি গুণগত ও পরিমাণগত সূচক ব্যবহার করা হয়। এই সূচকগুলোকে প্রধানত তিনটি মূল ক্ষেত্রে (Domains) ভাগ করা হয়:

  • সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা (Societal Safety and Security): অপরাধের হার, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রভাব এবং সমাজে সহিংসতার ভয়।

  • চলমান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব (Ongoing Domestic and International Conflict): যুদ্ধের সংখ্যা, প্রাণহানি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক।

  • সামরিকীকরণ (Militarization): জিডিপির তুলনায় সামরিক ব্যয়, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা এবং অস্ত্র আমদানি-রপ্তানি।

No1


২. এর মোট স্কোর কত?

GPI-তে স্কোর গণনা করা হয় ১ থেকে ৫-এর মধ্যে।

  • ১ স্কোর: সবচেয়ে বেশি শান্তিপূর্ণ (যতই স্কোরের মান ১-এর দিকে হবে, দেশ তত শান্ত)।

  • ৫ স্কোর: সবচেয়ে কম শান্তিপূর্ণ বা চরম অশান্ত।




৩. পিস ইনডেক্স দ্বারা আসলে কী পরিমাপ করা হয়?

সহজ কথায়, এটি একটি দেশের "নেতিবাচক শান্তি" (Negative Peace) পরিমাপ করে। অর্থাৎ, কোনো দেশে সহিংসতা বা সহিংসতার ভয় কতটা অনুপস্থিত, তা-ই এই ইনডেক্সের মূল ভিত্তি। এটি কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়, বরং নাগরিক নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার একটি সার্বিক চিত্র তুলে ধরে।



৪. ২০০৭ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের র‍্যাঙ্কিং

উল্লেখ্য যে, গ্লোবাল পিস ইনডেক্স ২০০৭ সাল থেকে চালু হয়েছে, তাই এর আগের কোনো ডেটা নেই। ২০২৬ সালের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট সাধারণত বছরের মাঝামাঝি (জুন মাসে) প্রকাশিত হয়, তবে বর্তমান পরিস্থিতি ও ট্রেন্ড অনুযায়ী একটি সম্ভাব্য অবস্থান দেওয়া হলো।



সারণী-০১ঃ ২০০৭ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বৈশ্বিক র‍্যাংকিং

ক্রম বছর র‍্যাঙ্কিং (Rank) স্কোর (Score) অবস্থা/মন্তব্য
২০০৭ ৮৬ ২.২১০ সূচক চালুর প্রথম বছর।
২০০৮ ৯২ ২.৩২৯ -
২০০৯ ৯০ ২.৩৪৮ -
২০১০ ৮৭ ২.৩১৫ -
২০১১ ৮৩ ২.০৩২ -
২০১২ ৯১ ২.০৭৪ -
২০১৩ ১০৫ ২.১৫৯ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অবনতি।
২০১৪ ৯৮ ২.১০৬ -
২০১৫ ৮৪ ২.০৩৮ উল্লেখযোগ্য উন্নতি।
১০ ২০১৬ ৮৩ ২.০৪৫ -
১১ ২০১৭ ৮৪ ২.০৩৫ -
১২ ২০১৮ ৯৩ ২.০৮৪ রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব।
১৩ ২০১৯ ১০১ ২.১২৮ -
১৪ ২০২০ ৯৭ ২.১০২ -
১৫ ২০২১ ৯১ ২.০৬৭ -
১৬ ২০২২ ৯৬ ২.০৬৭ -
১৭ ২০২৩ ৮৮ ২.০৫১ উল্লেখযোগ্য উন্নতি।
১৮ ২০২৪ ৯৩ ২.১২৬ ৫ ধাপ অবনতি।
১৯ ২০২৫ ১২৩ ২.৩১৮ ৩৩ ধাপ বিশাল অবনতি (সবচেয়ে খারাপ স্কোর)। এর কারণ হচ্ছে, জুলাই বিপ্লবকালে সময় সরকারের গণহত্যা ও আইনশৃংখলার অবনতি ।


বিভিন্ন উপসূচকে প্রাপ্ত স্কোরঃ ২০২৫ সাল



গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (GPI) ২০২৫-এর রিপোর্টে বাংলাদেশের স্কোর ও র‍্যাঙ্কিংয়ে বড় ধরনের অবনতি দেখা গেছে। মূলত ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রভাব এই স্কোরে সরাসরি প্রতিফলিত হয়েছে।

GPI-এর ২৩টি সূচককে ৩টি প্রধান ভাগে (Domains) ভাগ করা হয়। নিচে ২০২৫ সালের রিপোর্টে বাংলাদেশের আনুমানিক স্কোর ও বিশ্লেষণ দেওয়া হলো (মনে রাখবেন, ১ হলো সেরা এবং ৫ হলো সবচেয়ে খারাপ স্কোর):

১. ডোমেইন: অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংঘাত (Ongoing Conflict)

এই ডোমেইনে বাংলাদেশের স্কোর তুলনামূলক স্থিতিশীল, তবে সীমান্ত ও রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব আছে।

ক্রম সূচক (Indicator) স্কোর (১-৫) মন্তব্য
অভ্যন্তরীণ সংঘাতের তীব্রতা ৪.০ রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ও দাঙ্গার কারণে অনেক বেশি।
অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে মৃত্যুর সংখ্যা ৩.৫ ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনে প্রাণহানির প্রভাব।
প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্ক ৩.০ সীমান্ত হত্যা ও রোহিঙ্গা সংকটের কারণে মাঝারি।
বাহ্যিক যুদ্ধে মৃত্যুর সংখ্যা ১.০ বাংলাদেশ সরাসরি কোনো বিদেশি যুদ্ধে জড়িত নয়।
অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সংখ্যা ৩.০ -

২. ডোমেইন: নিরাপত্তা ও সুরক্ষা (Safety and Security)

এই ডোমেইনটিতেই বাংলাদেশ ২০২৫ সালে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে।

ক্রম সূচক (Indicator) স্কোর (১-৫) মন্তব্য
রাজনৈতিক অস্থিরতা ৪.৫ বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম খারাপ স্কোর।
রাজনৈতিক সন্ত্রাস সূচক ৪.০ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন।
সহিংস বিক্ষোভের সম্ভাবনা ৪.৫ বড় ধরণের আন্দোলন ও মব জাস্টিসের প্রভাব।
অপরাধের হার (খুন) ২.৫ তুলনামূলক মাঝারি।
সহিংস অপরাধের উপলব্ধি ৩.৫ মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতার বোধ বেড়েছে।
কারাবন্দী জনসংখ্যার হার ২.০ জনসংখ্যার অনুপাতে খুব বেশি নয়।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কর্মকর্তার সংখ্যা ৩.০ জনসংখ্যার অনুপাতে পুলিশের সংখ্যা।
উদ্বাস্তু ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ৪.০ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির প্রভাব।

৩. ডোমেইন: সামরিকীকরণ (Militarization)

এই ডোমেইনে বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে ভালো স্কোর পায়, কারণ আমাদের সামরিক আগ্রাসন বা বিপুল অস্ত্র ভাণ্ডার নেই।

ক্রম সূচক (Indicator) স্কোর (১-৫) মন্তব্য
সামরিক ব্যয় (জিডিপি-র শতাংশ) ১.৫ বাংলাদেশের সামরিক বাজেট তুলনামূলক কম।
সশস্ত্র বাহিনীর সংখ্যা ২.০ জনসংখ্যার অনুপাতে স্থিতিশীল।
পারমাণবিক ও ভারী অস্ত্র ১.৫ বাংলাদেশের কাছে আগ্রাসী ভারী অস্ত্র কম।
অস্ত্র আমদানি ২.৫ মাঝারি।
অস্ত্র রপ্তানি ১.০ বাংলাদেশ অস্ত্র রপ্তানি করে না।
জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে অবদান ১.০ সেরা স্কোর (বাংলাদেশ শীর্ষে)।

প্রধান সমস্যা কোথায় ছিল?

২০২৫ সালের রিপোর্টে বাংলাদেশের মূল সমস্যা ছিল "Safety and Security" ডোমেইনের রাজনৈতিক অস্থিরতা (Political Instability) এবং সহিংস বিক্ষোভ (Violent Demonstrations)। এই দুটি সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৫-এর কাছাকাছি (অর্থাৎ অত্যন্ত খারাপ) হওয়ার কারণে সামগ্রিক র‍্যাঙ্কিং ৩৩ ধাপ নিচে নেমে গেছে।

উপসংহার:

বাংলাদেশের সামরিক সূচকগুলো (Militarization) এখনও অনেক শক্তিশালী এবং ইতিবাচক। কিন্তু অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত সামগ্রিক শান্তি সূচকে বড় উন্নতি করা কঠিন।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: ২০২৫ সালের রিপোর্টে বাংলাদেশের র‍্যাঙ্কিং সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে (১২৩তম), যা এই সূচকের ইতিহাসে বাংলাদেশের সর্বনিম্ন অবস্থান। এর প্রধান কারণ ছিল ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং সে সময়কার জানমালের ব্যাপক ক্ষতি ও রাজনৈতিক পরিবর্তন।


<id="Section 1:">

দক্ষিণ এশিয়ায় গ্লোবাল পিস ইন্ডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থানঃ

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান) গ্লোবাল পিস ইনডেক্স র‍্যাংকিং-এর একটি তুলনামূলক ছক নিচে দেওয়া হলো।

এখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোর (২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫) তথ্যের পাশাপাশি সূচক শুরুর সময়ের একটি চিত্র তুলে ধরা হলো। ২০২৬ সালের পূর্ণাঙ্গ বার্ষিক রিপোর্ট সাধারণত বছরের মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশিত হয়, তাই এখানে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যসমূহ ব্যবহার করা হয়েছে।

সারণী-০২ঃ দক্ষিণ এশিয়ায় গ্লোবাল পিস ইন্ডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থানঃ

ক্রম দেশ ২০২৫ র‍্যাঙ্ক ২০২৪ র‍্যাঙ্ক ২০২৩ র‍্যাঙ্ক দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থান (২০২৫)
ভুটান ২১ ২১ ১৭ ১ম (সবচেয়ে শান্ত)
নেপাল ৭৬ ৮১ ৭৯ ২য়
শ্রীলংকা ৯৭ ১০০ ১০৭ ৩য়
ভারত ১১৫ ১১৬ ১২৬ ৪র্থ
বাংলাদেশ ১২৩ ৯৩ ৮৮ ৫মি
পাকিস্তান ১৪৪ ১৪০ ১৪৬ ৬ষ্ঠ
আফগানিস্তান ১৫৮ ১৬০ ১৬৩ ৭ম (সবচেয়ে অশান্ত)
মালদ্বীপ উল্লেখ নেই* উল্লেখ নেই* উল্লেখ নেই* -

গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণসমূহ:

  • বাংলাদেশ: ২০২৫ সালের রিপোর্টে বাংলাদেশ সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে দেশ এক লাফে ৩৩ ধাপ নিচে নেমে ১২৩তম অবস্থানে চলে এসেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জুলাই-আগস্টের সহিংসতা এই অবনতির প্রধান কারণ হিসেবে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

  • ভুটান: দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটান ধারাবাহিকভাবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এটি বৈশ্বিকভাবেও একটি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে স্বীকৃত।

  • আফগানিস্তান: যদিও আফগানিস্তান দীর্ঘদিন বিশ্বের সবচেয়ে অশান্ত দেশ ছিল, সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের রিপোর্টে ইয়েমেন ও রাশিয়া তাদের নিচে অবস্থান করায় আফগানিস্তানের বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিংয়ে সামান্য পরিবর্তন দেখা গেছে (১৬৩ থেকে ১৫৮)। তবে এটি এখনো দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে অশান্ত দেশ।

  • মালদ্বীপ: গ্লোবাল পিস ইনডেক্স সাধারণত ১৬৩টি দেশ ও অঞ্চলের ওপর করা হয় তথ্যের স্বল্পতা বা ইনডেক্সের নির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়ার কারণে মালদ্বীপকে অনেক সময় এই তালিকার মূল র‍্যাংকিংয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।

পরামর্শ: ২০২৫ সালের র‍্যাংকিং মূলত ২০২৪ সালের ঘটনাবলির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এই অবস্থানে কতটা উন্নতি করবে, তা নির্ভর করছে বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা সূচকগুলোর উন্নয়নের ওপর।


গ্লোবাল পিস ইন্ডেক্স (বিশ্ব শান্তি সূচক) এর ডোমেইন ও সূচকসমূহঃ

গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (GPI) পরিমাপের জন্য যে ২৩টি সূচক ব্যবহার করা হয়, সেগুলোকে মূলত ৩টি প্রধান ডোমেইন বা ক্ষেত্রে ভাগ করা হয়েছে। নিচে এই সূচকগুলোর বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হলো:

১. চলমান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব (Ongoing Domestic and International Conflict)

এই ডোমেইনটি একটি দেশের ভেতরে বা বাইরে যুদ্ধের প্রভাব এবং সীমানা সংঘাত পরিমাপ করে।

  1. অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বের সংখ্যা ও সময়কাল: দেশ কতগুলো যুদ্ধে জড়িত এবং তা কতদিন ধরে চলছে।

  2. বাহ্যিক দ্বন্দ্বে মৃত্যুর সংখ্যা: বিদেশি যুদ্ধে ওই দেশের কতজন মারা গেছেন।

  3. অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে মৃত্যুর সংখ্যা: দেশের ভেতরের সশস্ত্র সংঘাতে মৃত্যুর হার।

  4. সংগঠিত অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের তীব্রতা: দেশের ভেতরে বিদ্রোহ বা গৃহযুদ্ধের তীব্রতা কতটা।

  5. প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক: পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক ও সীমান্ত সম্পর্ক কেমন।

  6. বাহ্যিক সংঘাতের ভূমিকা: আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন বা যুদ্ধে দেশের অংশগ্রহণের মাত্রা।


২. সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা (Societal Safety and Security)

এটি সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনের নিরাপত্তা এবং অপরাধের মাত্রা নির্দেশ করে।

7. সমাজে অপরাধের মাত্রা (Perceived Criminality): মানুষ নিজেকে কতটা নিরাপদ মনে করে।

8. নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও পুলিশের সংখ্যা: প্রতি ১ লাখ মানুষের বিপরীতে পুলিশ সদস্যের অনুপাত।

9. খুনের হার (Homicide Rate): প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে খুনের সংখ্যা।

10. কারাবন্দী জনসংখ্যার হার: দেশের মোট জনসংখ্যার কত শতাংশ কারাগারে আছে।

11. সহজেই ছোট অস্ত্রের প্রাপ্যতা: সাধারণ মানুষের হাতে সহজে আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছানোর সুযোগ।

12. রাজনৈতিক অস্থিরতা (Political Instability): সরকারের স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক সংকটের সম্ভাবনা।

13. রাজনৈতিক সন্ত্রাস (Political Terror): রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের উপস্থিতি।

14. সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রভাব: সন্ত্রাসবাদের কারণে জানমালের ক্ষতির পরিমাণ।

15. সহিংস বিক্ষোভের সম্ভাবনা: রাজনৈতিক বা সামাজিক কারণে বড় ধরনের আন্দোলনের আশঙ্কা।

16. শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা: যুদ্ধের কারণে কত মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়েছে।


৩. সামরিকীকরণ (Militarization)

একটি দেশ কত বেশি সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে বা অস্ত্রের পেছনে খরচ করছে, তা এখানে দেখা হয়।

17. জিডিপির শতাংশ হিসেবে সামরিক ব্যয়: দেশের আয়ের কত অংশ সামরিক খাতে খরচ হয়।

18. সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা: প্রতি ১ লাখ নাগরিকের বিপরীতে সামরিক কর্মীর সংখ্যা।

19. অস্ত্র আমদানি (Imports): অন্য দেশ থেকে কী পরিমাণ মারণাস্ত্র কেনা হচ্ছে।

20. অস্ত্র রপ্তানি (Exports): অন্য দেশে কী পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি করা হচ্ছে।

21. জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে অবদান: আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় সৈন্য ও আর্থিক সহায়তার পরিমাণ।

22. পারমাণবিক ও ভারী অস্ত্রের সক্ষমতা: দেশের হাতে থাকা বিধ্বংসী অস্ত্রের পরিমাণ।

23. জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের জন্য আর্থিক অনুদান: জাতিসংঘকে দেওয়া ফান্ডের পরিমাণ।


সূচকগুলো কীভাবে গণনা করা হয়?

  • উৎস: এই তথ্যগুলো প্রধানত ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (EIU), সিপরি (SIPRI), জাতিসংঘ (UNHCR/UNODC) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল থেকে সংগ্রহ করা হয়।

  • ওজন (Weighting): অভ্যন্তরীণ শান্তির সূচকগুলোর গুরুত্ব ৬০% এবং বাহ্যিক শান্তির সূচকগুলোর গুরুত্ব ৪০% ধরা হয়।

  • গড় স্কোর: ২৩টি সূচকের প্রত্যেকটিকে ১ (সেরা) থেকে ৫ (সবচেয়ে খারাপ) স্কেলে মান দিয়ে একটি গড় স্কোর বের করা হয়।


আপনি কি বাংলাদেশের ২০২৫ সালের অবনতির পেছনে এই ২৩টি সূচকের মধ্যে কোনগুলো সবথেকে বেশি ভূমিকা রেখেছে তা জানতে চান?

গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (GPI) ২০২৫-এর রিপোর্টে বাংলাদেশের ৩৩ ধাপ অবনতির (৯৩তম থেকে ১২৩তম) পেছনে ২৩টি সূচকের মধ্যে কয়েকটি নির্দিষ্ট সূচক সবথেকে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। মূলত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ডামাডোল এই সূচকগুলোতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

নিচে ওই ২৩টি সূচকের মধ্যে যেগুলোতে সবথেকে বেশি অবনতি হয়েছে তার তালিকা দেওয়া হলো:

১. সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ডোমেইন (সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত)

এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবথেকে বড় ধাক্কা খেয়েছে। বিশেষ করে নিচের সূচকগুলো ছিল মূখ্য:

  • রাজনৈতিক অস্থিরতা (Political Instability): শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের মধ্যবর্তী সময়ে যে শাসনতান্ত্রিক শূন্যতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা এই সূচককে চরমভাবে নিচে নামিয়ে দিয়েছে।

  • সহিংস বিক্ষোভের সম্ভাবনা (Likelihood of Violent Demonstrations): জুলাই-আগস্টে দেশজুড়ে চলা আন্দোলন এবং পুলিশের সাথে সংঘর্ষের কারণে এই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর অনেক বেড়ে গেছে (যা নেতিবাচক)।

  • রাজনৈতিক সন্ত্রাস (Political Terror): আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দমন-পীড়ন, অতিরিক্ত বল প্রয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক সহিংসতার কারণে এই সূচকে বড় অবনতি ঘটেছে।

  • সমাজে অপরাধের মাত্রা ও ভয় (Perceived Criminality): গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাময়িক অবনতি এবং থানায় পুলিশের অনুপস্থিতির ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার অভাব বোধ বাড়ে, যা এই সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

২. চলমান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব ডোমেইন

  • অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে মৃত্যুর সংখ্যা (Deaths from Internal Conflict): ২০২৪ সালের আন্দোলনে সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১,০০০ এবং জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গত কয়েক দশকের মধ্যে এক বছরে এত বেশি অভ্যন্তরীণ মৃত্যু আগে দেখা যায়নি, যা বাংলাদেশের র‍্যাঙ্কিং কমিয়ে দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

  • সংগঠিত অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের তীব্রতা (Intensity of Organized Internal Conflict): আন্দোলন ও গণ-অভূত্থানকে সূচকের ভাষায় একটি বড় মাপের অভ্যন্তরীণ সংঘাত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

৩. সামরিকীকরণ (Militarization)

  • জিডিপির শতাংশ হিসেবে সামরিক ব্যয়: ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে সামরিক ব্যয় এবং নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দের ভারসাম্যও এই সূচকে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। তবে নিরাপত্তা ডোমেইনের তুলনায় এর প্রভাব ছিল কম।

সারাংশ: কেন এই অবনতি?

২০২৫ সালের ইনডেক্সটি মূলত ২০২৪ সালের পুরো সময়কালকে বিশ্লেষণ করেছে। ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (IEP)-এর মতে, ১৩.২% স্কোর অবনতি হয়েছে বাংলাদেশের, যা এই সূচকের ইতিহাসে কোনো দেশের জন্য এক বছরে অন্যতম বড় ধস। মূলত রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং এর সাথে যুক্ত জানমালের ক্ষতিই বাংলাদেশকেও ভারত বা নেপালের নিচেই নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (১২৮তম) কাছাকাছি অবস্থানে নামিয়ে এনেছে।

 

আপনি কি ২০২৬ সালে বাংলাদেশের অবস্থান আবার আগের জায়গায় ফিরে আসার সম্ভাবনা বা চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে জানতে চান?

২০২৬ সালে বাংলাদেশের গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (GPI) র‍্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি করার সম্ভাবনা এবং একই সাথে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, তা নিচের বিশ্লেষণ থেকে বোঝা সম্ভব:

উন্নতির সম্ভাবনা (Possibilities of Recovery)

বাংলাদেশ যদি ২০২৬ সালের রিপোর্টে (যা সাধারণত ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৬-এর শুরুর তথ্য নিয়ে তৈরি হয়) ভালো করতে চায়, তবে নিচের সূচকগুলোতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে হবে:

  • রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা (Political Stability): অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের রোডম্যাপ নিশ্চিত করতে পারে এবং বড় ধরনের কোনো সংঘাত ছাড়াই রাজনৈতিক কার্যক্রম সচল থাকে, তবে এই সূচকে বড় লাফ দেওয়ার সুযোগ আছে।

  • সহিংস বিক্ষোভ হ্রাস (Decrease in Violent Demonstrations): ২০২৪ সালের মতো দেশব্যাপী বড় কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ যদি ২০২৫-২৬ সালে না ঘটে, তবে এই সূচকটি দ্রুত উন্নতি করবে।

  • জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে অবদান: বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই এই সূচকে খুব ভালো স্কোর করে। যদি শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও বাড়ে বা স্থিতিশীল থাকে, তবে তা র‍্যাঙ্কিং পুনরদ্ধারে সাহায্য করবে।

  • আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পুনরুদ্ধার: পুলিশ বাহিনী এবং বিচারিক ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে যদি সমাজে অপরাধের মাত্রা (Perceived Criminality) কমানো যায়, তবে সামাজিক নিরাপত্তা ডোমেইনে স্কোর উন্নত হবে।

প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ (Key Challenges)

র‍্যাঙ্কিংয়ে আগের অবস্থানে (যেমন: ২০২৩ সালের ৮৮তম অবস্থানে) ফিরে যাওয়াটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে কারণ:

  • সংগঠিত অপরাধ ও মব জাস্টিস: সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে 'মব জাস্টিস' বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এটি যদি ২০২৬ সালের রিপোর্টিং সময়ের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে "রাজনৈতিক সন্ত্রাস""সমাজে অপরাধের মাত্রা" সূচকগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব থেকে যাবে।

  • পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি: খাগড়াছড়ি বা রাঙ্গামাটির মতো এলাকাগুলোতে যদি জাতিগত বা অভ্যন্তরীণ সংঘাতের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বেশি আসে, তবে তা "অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের তীব্রতা" সূচকে নেতিবাচক নম্বর যোগ করবে।

  • অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতি: যদিও এটি সরাসরি পিস ইনডেক্সের সূচক নয়, তবে অর্থনৈতিক সংকট পরোক্ষভাবে "রাজনৈতিক অস্থিরতা""সহিংস বিক্ষোভের সম্ভাবনা" বাড়িয়ে দেয়।

  • রোহিংগা ইস্যু: মিয়ানমার সীমান্তের অস্থিরতা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলার অবনতি আন্তর্জাতিক সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা—উভয় ক্ষেত্রেই ঝুঁকি তৈরি করে।

২০২৬-এর জন্য পূর্বাভাস

ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (IEP) সাধারণত খুব রক্ষণশীলভাবে ডেটা বিশ্লেষণ করে। ২০২৫ সালের ১২৩তম অবস্থান থেকে এক বছরেই আগের ৮৮তম অবস্থানে ফিরে আসা কঠিন হতে পারে। তবে পরিস্থিতি শান্ত থাকলে বাংলাদেশ ১০০ থেকে ১১০ এর মধ্যে ফিরে আসার জোরালো সম্ভাবনা রাখে।

মুসলিম বিশ্বের উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর পিস ইনডেক্স র‍্যাঙ্কিং

গ্লোবাল পিস ইনডেক্সে (GPI) মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাধারণত কাতার, কুয়েত বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো এই তালিকায় অনেক উপরে থাকে। অন্যদিকে, গৃহযুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতায় থাকা দেশগুলো (যেমন: ইয়েমেন বা সিরিয়া) তালিকার একদম নিচের দিকে অবস্থান করে।

মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম স্থিতিশীল এবং উন্নত অর্থনীতির দেশ। পজিটিভ পিস ইনডেক্স (PPI) এবং গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (GPI)—উভয় ক্ষেত্রেই মালয়েশিয়া ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফর্ম করে আসছে। মালয়েশিয়ার স্কোর (২.০৯২) নির্দেশ করে যে তাদের সমাজ যেকোনো অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক ধাক্কা সামলানোর জন্য অত্যন্ত প্রস্তুত। বাংলাদেশ যদি পজিটিভ পিস-এর স্তম্ভগুলো মজবুত করতে চায়, তবে মালয়েশিয়ার 'বিজনেস এনভায়রনমেন্ট' এবং 'হিউম্যান ক্যাপিটাল' মডেলটি একটি উদাহরণ হতে পারে।

নিচে বাংলাদেশ এবং মুসলিম বিশ্বের উল্লেখযোগ্য কিছু দেশের ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের র‍্যাঙ্কিং তুলনামূলক ছকে দেওয়া হলো:

 

সারণী-০৩ মুসলিম বিশ্বের উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর পিস ইনডেক্স র‍্যাঙ্কিং

ক্রম দেশ ২০২৫ র‍্যাঙ্ক ২০২৪ র‍্যাঙ্ক ২০২৩ র‍্যাঙ্ক অবস্থান পরিবর্তন (২৪-২৫)
কুয়েত ২৫ ২৫ ৩৫ অপরিবর্তিত
কাতার ২৯ ২৯ ২১ অপরিবর্তিত
ওমান ৩৭ ৩৭ ৪৮ অপরিবর্তিত
সংযুক্ত আরব আমিরাত ৪৪ ৪৪ ৭৫ অপরিবর্তিত
ইন্দোনেশিয়া ৪৮ ৪৮ ৫৩ অপরিবর্তিত
মালয়েশিয়া ১০* ১০ ১৯ -
সৌদি আরব ১০২ ১০২ ১১৯ অপরিবর্তিত
মিশর ১১২ ১১২ ১২১ অপরিবর্তিত
ভারত (তুলনার জন্য) ১১৫ ১১৬ ১২৬ +১ (উন্নতি)
বাংলাদেশ ১২৩ ৯৩ ৮৮ -৩৩ (অবনতি)
তুরস্ক ১৪৩ ১৪৭ ১৪৭ +৪ (উন্নতি)
পাকিস্তান ১৪৪ ১৪০ ১৪৬ -৪ (অবনতি)
ইরাক ১৫০ ১৫১ ১৫৪ +১ (উন্নতি)
আফগানিস্তান ১৫৮ ১৬০ ১৬৩ +২ (উন্নতি)
ইয়েমেন ১৫৯ ১৬৩ ১৬২ +৪ (উন্নতি)

কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ:

১. বাংলাদেশের অবস্থান: ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশ মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে মধ্যম সারির একটি ভালো অবস্থানে ছিল। তবে ২০২৫ সালের রিপোর্টে বাংলাদেশ এক লাফে ১২৩তম অবস্থানে নেমে যাওয়ায় অনেক মুসলিম দেশের (যেমন: সৌদি আরব বা মিশর) নিচে চলে গেছে।

২. শীর্ষ মুসলিম দেশ: কুয়েত, কাতার এবং ওমান ধারাবাহিকভাবে মুসলিম বিশ্বের মধ্যে সবথেকে শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।

৩. তুরস্ক ও পাকিস্তান: তুরস্ক গত কয়েক বছর ধরে তালিকার বেশ নিচের দিকে থাকলেও ২০২৫ সালে কিছুটা উন্নতির আভাস দিয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান বাংলাদেশের মতোই দক্ষিণ এশীয় ও মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে নিচের সারিতে অবস্থান করছে।

৪. ইয়েমেন ও আফগানিস্তান: এই দেশগুলো তালিকার তলানিতে থাকলেও গত বছরের তুলনায় তাদের র‍্যাঙ্কিংয়ে সামান্য উন্নতি দেখা গেছে, যেখানে বাংলাদেশের বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে।

কেন মালয়েশিয়া এত ভালো অবস্থানে?

মালয়েশিয়ার এই সাফল্যের পেছনে পজিটিভ পিস-এর ৩টি স্তম্ভ প্রধান ভূমিকা পালন করছে:

১. ব্যবসায়িক পরিবেশ (Sound Business Environment): মালয়েশিয়ার ইকোনমি অত্যন্ত ডাইনামিক। ডিজিটাল ইকোনমি এবং হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে তাদের বিনিয়োগ অনেক বেশি, যা এই সূচকটিকে শক্তিশালী করেছে।

২. উচ্চমানের মানবসম্পদ (High Human Capital): তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মান দক্ষিণ এশিয়ার যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক উন্নত। কারিগরি শিক্ষার প্রসার তাদের এই স্তম্ভে উচ্চ স্কোর এনে দিয়েছে।

৩. সুশাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও তাদের প্রশাসনিক কাঠামো বা বিচার বিভাগ ভেঙে পড়েনি। এই 'ইনস্টিটিউশনাল স্ট্যাবিলিটি' তাদের পজিটিভ পিসকে মজবুত রেখেছে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: গ্লোবাল পিস ইনডেক্স ২০২৫-এর এই র‍্যাঙ্কিং মূলত ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বাংলাদেশের এই পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ হিসেবে ওই বছর চলা তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলন ও জানমালের ক্ষতিকে দায়ী করা হয়েছে।


বিশ্বের শীর্ষ ১০টি শান্তিপূর্ণ দেশ (২০২৩-২০২৫):

বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ১০টি দেশ সাধারণত ইউরোপ এবং ওশেনিয়া অঞ্চল থেকে হয়ে থাকে। আইসল্যান্ড ২০০৮ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে এই তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে।

নিচে ২০২৫ সালের র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের স্কোর ও র‍্যাঙ্ক দেওয়া হলো:

ক্রম দেশ ২০২৫ র‍্যাঙ্ক ২০২৫ স্কোর ২০২৪ র‍্যাঙ্ক ২০২৪ স্কোর ২০২৩ র‍্যাঙ্ক ২০২৩ স্কোর
আইসল্যান্ড ১.১১২ ১.১১২ ১.১২৪
আয়ারল্যান্ড ১.১৩০ ১.১৩০ ১.৩১২
অস্ট্রিয়া ১.১৭৫ ১.১৭৫ ১.৩১৬
নিউজিল্যান্ড ১.২৩৪ ১.২৩৪ ১.৩১৩
ডেনমার্ক ১.২৫৩ ১.২৫৩ ১.৩১০
পর্তুগাল ১.৩২১ ১.৩২১ ১.৩৩৩
স্লোভেনিয়া ১.৩২৮ ১.৩২৮ ১.৩৩৪
সুইজারল্যান্ড ১.৩৫০ ১.৩৫০ ১০ ১.৩৩৯
কানাডা ১.৩৪৫ ১১ ১.৩৪৫ ১১ ১.৩৫০
১০ সিঙ্গাপুর ১০ ১.৩৪৭ ১.৩৪৭ ১.৩৩২

কিছু লক্ষ্যণীয় বিষয়:

  • আইসল্যান্ডের আধিপত্য: আইসল্যান্ড গত ১৭ বছর ধরে বিশ্বের এক নম্বর শান্তিপূর্ণ দেশ। তাদের কোনো নিজস্ব সেনাবাহিনী নেই এবং অপরাধের হার নগণ্য।

  • স্কোর বিশ্লেষণ: মনে রাখবেন, স্কোর যত ১-এর কাছাকাছি, দেশটি তত বেশি শান্তিপূর্ণ। উপরের সবগুলো দেশের স্কোর ১.৪-এর নিচে, যা অত্যন্ত উচ্চ শান্তির (Very High Peace) সংকেত দেয়।

  • আঞ্চলিক আধিপত্য: শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে ৭টিই ইউরোপের দেশ। এশিয়ায় একমাত্র সিঙ্গাপুর এবং উত্তর আমেরিকায় কানাডা শীর্ষ দশে জায়গা ধরে রেখেছে।

  • কানাডার উন্নতি: ২০২৪ সালে ১১তম অবস্থানে থাকলেও ২০২৫ সালের রিপোর্টে কানাডা শীর্ষ ১০-এ ফিরে এসেছে।

জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য ০৫টি রাষ্ট্রের ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের স্কোর ও র‍্যাংক

ক্রম দেশ ২০২৫ র‍্যাঙ্ক ২০২৫ স্কোর ২০২৪ র‍্যাঙ্ক ২০২৪ স্কোর ২০২৩ র‍্যাঙ্ক ২০২৩ স্কোর
আইসল্যান্ড (EU) ১.১১২ ১.১১২ ১.১২৪
আয়ারল্যান্ড (EU) ১.১৩০ ১.১৩০ ১.৩১২
অস্ট্রিয়া (EU) ১.১৭৫ ১.১৭৫ ১.৩১৬
জার্মানি (EU) ১৫ ১.৩৯২ ২০ ১.৩৯২ ১৫ ১.৪৫৬
ফ্রান্স (P5) ৮৬ ২.০০৩ ৮৬ ২.০০৩ ৬৭ ১.৯৩৯
যুক্তরাজ্য (P5) ৮৯ ২.০২৯ ৮৯ ২.০২৯ ৩৭ ১.৬৯৩
চীন (P5) ৯১ ২.০৩৩ ৮৮ ২.০১১ ৮০ ২.০০৯
যুক্তরাষ্ট্র (P5) ১২৮ ২.৩৯৮ ১৩২ ২.৩৯৮ ১৩১ ২.৪৪৮
রাশিয়া (P5) ১৫৭ ৩.৩২২ ১৫৭ ৩.৩২২ ১৫৮ ৩.৪৪২

বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ:

  • ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) শ্রেষ্ঠত্ব: আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড এবং অস্ট্রিয়া শুধু ইইউ-তে নয়, বরং সারা বিশ্বেই শান্তির শীর্ষে রয়েছে। জার্মানিও ধারাবাহিকভাবে শীর্ষ ২০-এর মধ্যে অবস্থান করছে।

  • যুক্তরাজ্যের বড় পতন: ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্য ৩৭তম অবস্থানে থাকলেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তা এক লাফে ৮৯তম অবস্থানে নেমে গেছে। এর পেছনে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সূচকের অবনতি কাজ করেছে।

  • যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: বিশ্বের সবথেকে শক্তিশালী দেশ হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ১২৮তম (২০২৫) অবস্থানে রয়েছে, যা বাংলাদেশের (১২৩তম) থেকেও নিচে। দেশটিতে রাজনৈতিক মেরুকরণ, গান ভায়োলেন্স বা বন্দুক হামলা এবং নাগরিক অসন্তোষ এর প্রধান কারণ।

  • রাশিয়া ও যুদ্ধ: ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে রাশিয়ার স্কোর সবথেকে খারাপ (৩.৩২২) এবং দেশটি তালিকার একদম শেষ প্রান্তে অবস্থান করছে।

  • চীনের স্থিতিশীলতা: চীন সাধারণত ৯০-এর আশেপাশে অবস্থান করছে। তাদের সামরিকীকরণ বেশি হলেও অভ্যন্তরীণ অপরাধের হার কম থাকায় র‍্যাঙ্কিং খুব বেশি নিচে নামেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকা কি একই অর্থ প্রকাশ করে?

যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের পিস ইনডেক্সে পিছিয়ে থাকার কারণ ও অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় যে, কেন একটি দেশ শান্তি সূচকে নিচে থাকা সত্ত্বেও মানুষের কাছে স্বপ্নের গন্তব্য হয়।

না, উভয়ের পিছিয়ে থাকার কারণ ও প্রেক্ষাপট একদম ভিন্ন:

  • যুক্তরাষ্ট্রের কারণ (পদ্ধতিগত ও বৈশ্বিক): যুক্তরাষ্ট্রের স্কোর খারাপ হওয়ার প্রধান কারণ হলো তাদের অতিরিক্ত সামরিকায়ন (Militarization)। তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র রপ্তানিকারক এবং সরাসরি বহু আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বে জড়িত। এছাড়া দেশের ভেতর ব্যক্তিগত পর্যায়ে অস্ত্রের সহজলভ্যতা (Gun Violence) এবং উচ্চ অপরাধের হার (Homicide Rate) তাদের স্কোর কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র "শান্তি বজায় রাখতে গিয়ে অশান্তি" ও "অভ্যন্তরীণ সামাজিক সহিংসতায়" জর্জরিত।


  • বাংলাদেশের কারণ (সাময়িক ও রাজনৈতিক): বাংলাদেশের ২০২৫ সালের অবনতি মূলত "রাজনৈতিক অস্থিরতা""সহিংস বিক্ষোভ"-এর ওপর ভিত্তি করে। এটি একটি ক্রান্তিকালীন সময়ের প্রতিফলন। বাংলাদেশের সামরিক ব্যয় বা আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বে জড়িত হওয়ার হার যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক কম।

২. শান্তি সূচকে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও কেন সকলে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চায়?

শান্তি সূচক (Peace Index) একটি দেশের সামগ্রিক জীবনের মানের কেবল একটি দিক (সহিংসতা ও যুদ্ধ) তুলে ধরে। কিন্তু মানুষ যখন অভিবাসনের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তারা "পজিটিভ পিস" (Positive Peace) এবং অর্থনৈতিক সুযোগকে বেশি গুরুত্ব দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো:

  • অর্থনৈতিক সুযোগ ও উচ্চ মজুরি: যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি। সেখানে কাজের সুযোগ, ব্যবসার পরিবেশ এবং আয়ের হার বাংলাদেশ বা অনেক শান্তিপূর্ণ দেশের চেয়েও অনেক বেশি।


  • শিক্ষা ও গবেষণা: বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্রে। উচ্চশিক্ষার জন্য এটিই এক নম্বর পছন্দ।


  • আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকার: শান্তি সূচকে স্কোর কম থাকলেও, সাধারণ নাগরিকের অধিকার রক্ষা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিচারিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা অনেক দেশের তুলনায় সেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী।


  • পজিটিভ পিস (Positive Peace): ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (IEP) অনুযায়ী, একটি দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা শক্তিশালী তাকে 'পজিটিভ পিস' বলে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো (ব্যাংক, আদালত, প্রযুক্তি) এতই শক্তিশালী যে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মানুষ সেখানে নিজেকে নিরাপদ বোধ করে।


  • দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা: ২০২৪ সালে বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তা বিরল। মানুষ এমন এক জায়গায় থাকতে চায় যেখানে রাতারাতি শাসনব্যবস্থা বা জীবনযাত্রা বদলে যাওয়ার ভয় কম।

সারাংশ:

পিস ইনডেক্স আপনাকে বলছে কোথায় "মারামারি বা অশান্তি" কম, কিন্তু এটি আপনাকে বলছে না যে কোথায় "বেশি টাকা আয় করা যায়" বা "জীবনমানের সুযোগ বেশি"। অভিবাসীরা সাধারণত অশান্তির চেয়ে সুযোগকে (Opportunity) বেশি প্রাধান্য দেয়।


শান্তি সূচকে উন্নতি কেন জরুরি এবং কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত সে সম্পর্কে আমার বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:


গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (GPI) বা শান্তি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত করা কেবল একটি আন্তর্জাতিক সম্মাননার বিষয় নয়, বরং এটি দেশের টেকসই উন্নয়ন ও নাগরিকদের সুন্দর জীবনের জন্য অপরিহার্য। ২০২৫ সালের রিপোর্টে বাংলাদেশের ১২৩তম অবস্থানে নেমে যাওয়া একটি সতর্কবার্তা।

কেন শান্তি সূচকে উন্নতি করা জরুরি? (Importance)

১. বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণ: বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে পুঁজি বিনিয়োগের আগে সেই দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি যাচাই করেন। র‍্যাঙ্কিং ভালো থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ে, যা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।

২. পর্যটন শিল্পের বিকাশ: পর্যটকরা সবসময় নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ দেশে ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন। র‍্যাঙ্কিং উন্নত হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে এবং পর্যটন খাত থেকে আয় বাড়বে।

৩. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG): জাতিসংঘের ১৬ নম্বর লক্ষ্যমাত্রা হলো "শান্তি, ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান"। এটি অর্জনে পিস ইনডেক্সে উন্নতি করা বাধ্যতামূলক।

৪. মস্তিষ্ক পাচার (Brain Drain) রোধ: দেশ শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ হলে মেধাবী তরুণরা বিদেশে স্থায়ী হওয়ার পরিবর্তে দেশে থেকে দেশের উন্নয়নে কাজ করার উৎসাহ পাবে।

উন্নতির জন্য প্রস্তাবিত পদক্ষেপসমূহ (Proposed Steps)

পিস ইনডেক্সের ২৩টি সূচকের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারে:


১. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সহনশীলতা

  • সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি: ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বন্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে যাতে বড় ধরনের কোনো সহিংস বিক্ষোভ বা মব জাস্টিস না ঘটে।

  • গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা: নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।


২. আইনশৃঙ্খলা ও বিচার বিভাগীয় সংস্কার

  • পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়ন: পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একটি জনবান্ধব ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সমাজে অপরাধের ভয় কমাতে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করা প্রয়োজন।

  • দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা: মামলা জট কমিয়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে হবে। নাগরিকরা যখন দেখবে অপরাধ করলে দ্রুত শাস্তি হয়, তখন সহিংসতার হার এমনিতেই কমে আসবে।


৩. সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি

  • সহিংস বিক্ষোভ প্রতিরোধ: মানুষের ক্ষোভ নিরসনের জন্য গণতান্ত্রিক পথ খোলা রাখা, যাতে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি না হয়।

  • পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সীমান্ত নিরাপত্তা: পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নিরসনে শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সীমান্ত সমস্যা কূটনৈতিকভাবে সমাধান করা।


৪. আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও ভূমিকা

  • শান্তি রক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখা: জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের যে গৌরবময় ভূমিকা আছে, তা আরও শক্তিশালী করতে হবে।

  • রোহিঙ্গা সংকটের কূটনৈতিক সমাধান: এই বিশাল শরণার্থী জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য একটি ঝুঁকি। আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা জরুরি।


৫. তথ্য ও স্বচ্ছতা

  • সঠিক তথ্যের প্রবাহ: অনেক সময় ভুল তথ্য বা গুজবের কারণে দেশে দাঙ্গা বা অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। সাইবার নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং সঠিক তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করা শান্তি বজায় রাখতে সহায়ক হবে।


আমার অভিমত:

শান্তি কোনো ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বিষয় নয়; এটি একটি সমাজের ভেতর থেকে আসা স্বতঃস্ফূর্ত অবস্থা। বাংলাদেশ যদি তার "প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো" (Institutional Structure) শক্তিশালী করতে পারে, তবে ২০২৬ বা ২০২৭ সালের মধ্যেই আগের মতো ১০০-র নিচে বা তারও উন্নত অবস্থানে ফিরে আসা সম্ভব।


গ্লোবাল পিস ইনডেক্সের (GPI) এর উপর পুলিশ সংস্কার এবং নির্বাচনী সংস্কার এর প্রভাবঃ

গ্লোবাল পিস ইনডেক্সের (GPI) ২৩টি সূচকের মধ্যে অন্তত ১০-১২টি সূচকের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।


বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুলিশ সংস্কার এবং নির্বাচনী সংস্কার—এই দুটি বিষয়ই গ্লোবাল পিস ইনডেক্সের (GPI) ২৩টি সূচকের মধ্যে অন্তত ১০-১২টি সূচকের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ২০২৬ সালের সূচকে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটাতে এই সংস্কারগুলো কীভাবে কাজ করবে, তার একটি বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:

১. পুলিশ সংস্কারের প্রভাব (Impact of Police Reform)

পুলিশ বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার পিস ইনডেক্সের "Societal Safety and Security" ডোমেইনকে আমূল বদলে দিতে পারে:

  • সমাজে অপরাধের মাত্রা (Perceived Criminality): পুলিশ যদি রাজনৈতিক হাতিয়ার না হয়ে পেশাদার বাহিনী হিসেবে কাজ করে, তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার বোধ বাড়বে। পিস ইনডেক্সে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

  • রাজনৈতিক সন্ত্রাস (Political Terror): পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো বিষয়গুলো বন্ধ হলে এই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর অনেক উন্নত হবে।

  • সহিংস বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ: পুলিশ যদি দমন-পীড়নের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ (Crowd Control) করতে শেখে, তবে आंदोलনের সময় প্রাণহানি কমবে, যা সরাসরি "অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে মৃত্যুর সংখ্যা" সূচককে ইতিবাচক করবে।

২. নির্বাচনী সংস্কারের প্রভাব (Impact of Electoral Reform)

নির্বাচন কেন্দ্রিক অস্থিরতা বাংলাদেশের পিস ইনডেক্স খারাপ হওয়ার অন্যতম ঐতিহাসিক কারণ। নির্বাচনী সংস্কার সফল হলে:

  • রাজনৈতিক অস্থিরতা (Political Instability): একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী কাঠামো থাকলে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় যে ভয়াবহ অনিশ্চয়তা ও সংঘাত তৈরি হয়, তা কমে যাবে। এটি GPI-এর অন্যতম শক্তিশালী সূচক।

  • সহিংস বিক্ষোভের সম্ভাবনা: নির্বাচন নিয়ে যখন মানুষের মধ্যে ক্ষোভ থাকে না, তখন রাজপথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা কমে আসে।

  • প্রতিষ্ঠানিক সক্ষমতা (Positive Peace): নির্বাচনী সংস্কার সফল হওয়া মানে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হওয়া। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান সহিংসতা দমনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে।

ক্রম সংস্কারের ক্ষেত্র পিস ইনডেক্সে প্রভাব (সূচক) সম্ভাব্য ফলাফল
পুলিশ সংস্কার নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও পুলিশের সংখ্যা, অপরাধের হার, রাজনৈতিক সন্ত্রাস। উচ্চ উন্নতি: যদি পুলিশ জনবান্ধব হয় এবং বিচারহীনতা দূর হয়।
নির্বাচনী সংস্কার রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংস বিক্ষোভ। দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা: যদি ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি শান্তিপূর্ণ পথ তৈরি হয়।
বিচারিক সংস্কার কারাবন্দী জনসংখ্যার হার, মব জাস্টিস। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: যদি হয়রানিমূলক মামলা ও মব জাস্টিস বন্ধ হয়।

পর্যবেক্ষণ:

২০২৬ সালের পিস ইনডেক্স মূলত ২০২৫ সালের পুরো পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে। যদি এই সংস্কারগুলো দৃশ্যমান হয় এবং ২০২৫ সালে বড় ধরনের কোনো গণ-সহিংসতা না ঘটে, তবে বাংলাদেশ ১২৩তম অবস্থান থেকে ১০০-র নিচে (সম্ভবত ৯০-৯৫-এর ঘরে) ফিরে আসার জোরালো সম্ভাবনা রাখে।

তবে একটি বড় ঝুঁকি হলো—সংস্কার চলাকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যদি অবনতি ঘটে বা 'পাওয়ার ভ্যাকুয়াম' তৈরি হয়, তবে র‍্যাঙ্কিংয়ে আশানুরূপ উন্নতি বিলম্বিত হতে পারে।


বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতিফলন বা জনমত এই সূচকে কোনো প্রভাব ফেলে?

পিস ইনডেক্স বা শান্তি সূচকে সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতিফলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (GPI) অনেকগুলো গাণিতিক ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়, তবে এর বেশ কয়েকটি প্রধান সূচক সরাসরি জনমত এবং মানুষের মানসিক অবস্থার (Perception) ওপর নির্ভর করে।

বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে জনমত যেভাবে পিস ইনডেক্সকে প্রভাবিত করতে পারে, তা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. 'পারসিভড ক্রিমিনালিটি' বা অপরাধের ভয়

GPI-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো—নাগরিকরা নিজের দেশে নিজেকে কতটা নিরাপদ মনে করেন।

  • প্রভাব: যদি সংস্কারের ফলে মানুষ মনে করে যে পুলিশ এখন আগের চেয়ে বেশি নিরপেক্ষ এবং অপরাধীরা বিচার পাচ্ছে, তবে এই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর দ্রুত ভালো হবে।

  • ঝুঁকি: সংস্কার চলাকালীন যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক থাকে এবং মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধের খবর দেখে আতঙ্কিত হয়, তবে র‍্যাঙ্কিংয়ে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

২. রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আস্থার সংকট

ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (IEP) তথ্য সংগ্রহের সময় ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (EIU) মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা নেয়, যারা মূলত জনগণের রাজনৈতিক সন্তুষ্টি পরিমাপ করে।

  • প্রভাব: সংস্কার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী রোডম্যাপ তৈরি হয়, তবে দেশের ভেতর 'রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা' কমে যাবে। মানুষ যখন ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদী হয়, তখন সহিংস বিক্ষোভের হার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে আসে।

৩. মব জাস্টিস ও বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা

বর্তমান সময়ে সংস্কারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো 'মব জাস্টিস' বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া।

  • জনমত ও সূচক: মানুষ যদি মনে করে যে প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব নয়, তখনই তারা আইন হাতে তুলে নেয়। এটি পিস ইনডেক্সের "রাজনৈতিক সন্ত্রাস" এবং "সহিংস বিক্ষোভ" সূচককে সরাসরি প্রভাবিত করে। সংস্কার যদি বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফেরাতে পারে, তবে এই নেতিবাচক প্রবণতা কমে আসবে।


জনমত কেন 'পজিটিভ পিস' (Positive Peace) তৈরিতে জরুরি?

পিস ইনডেক্স তৈরিকারী সংস্থা IEP একটি ধারণার কথা বলে, যাকে বলা হয় "পজিটিভ পিস"। এটি হলো এমন একটি পরিবেশ যেখানে শান্তি কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়, বরং একটি টেকসই সংস্কৃতি। এর আটটি স্তম্ভের মধ্যে একটি হলো "অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান" এবং অন্যটি হলো "উচ্চমানের হিউম্যান ক্যাপিটাল"

  • সংস্কারের ওপর জনগণের আস্থা থাকলে সমাজে অসহিষ্ণুতা কমে।

  • একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বাড়লে অভ্যন্তরীণ সংঘাত (Internal Conflict) হ্রাস পায়।


২০২৬ সালের জন্য চ্যালেঞ্জ:

বর্তমানে বাংলাদেশে একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে সংস্কার নিয়ে "উচ্চ প্রত্যাশা" রয়েছে।

  • আশার দিক: এই উচ্চ প্রত্যাশা দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করছে।

  • ঝুঁকির দিক: যদি সংস্কারের গতি ধীর হয় বা জনমানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হয়, তবে পুনরায় গণ-অসন্তোষ তৈরি হতে পারে, যা ২০২৬ সালের পিস ইনডেক্সে বাংলাদেশকে আবারো পিছিয়ে দিতে পারে।


সারসংক্ষেপ: জনগণের আস্থা হলো সংস্কারের জ্বালানি। মানুষ যদি মনে করে দেশ সঠিক পথে আছে, তবে তারা সহিংসতা থেকে দূরে থাকে, যার সরাসরি প্রতিফলন ঘটে শান্তি সূচকের পয়েন্টে।



Previous
Previous

পজিটিভ পিস ইনডেক্স: টেকসই শান্তি ও সমৃদ্ধির নীল নকশা (২)