‘সামাজিক চুক্তি’- সার্বভৌমত্বের উৎসবিন্দু (১০)

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে সামাজিক চুক্তি (Social Contract) তত্ত্বটিই প্রথম প্রচার করে যে, সার্বভৌমত্ব কোনো ঐশ্বরিক দান নয়, বরং এটি মানুষের নিজেদের মধ্যে করা একটি চুক্তির ফসল। অর্থাৎ, রাষ্ট্র বা সার্বভৌমত্বের আদি ও আসল উৎস হলো জনগণ

সামাজিক চুক্তির প্রধান তিন দার্শনিক—হবস, লক এবং রুশো—সার্বভৌমত্বকে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. থমাস হবস (Thomas Hobbes): নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব

হবসের মতে, রাষ্ট্র গঠনের আগে মানুষ এক 'প্রাকৃতিক রাজ্যে' (State of Nature) বাস করত, যেখানে জীবন ছিল "কদর্য, পাশবিক এবং সংক্ষিপ্ত"। এই অরাজকতা থেকে বাঁচতে মানুষ নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে তাদের সকল ক্ষমতা একজন শাসক বা 'লেভিয়াথান'-এর হাতে তুলে দেয়।

  • সার্বভৌমত্বের প্রকৃতি: হবসের সার্বভৌমত্ব হলো Absolute (নিরঙ্কুশ)। একবার ক্ষমতা দিয়ে দেওয়ার পর জনগণ আর তা ফেরত নিতে পারে না।

  • ইংরেজি রেফারেন্স: তাঁর Leviathan (১৬৫১) গ্রন্থে তিনি বলেন:

    "The Sovereign’s power is inalienable and absolute; without it, society reverts to chaos."

২. জন লক (John Locke): সীমিত সার্বভৌমত্ব ও ট্রাস্টিশিপ

লক মনে করতেন, মানুষ চুক্তির মাধ্যমে সব ক্ষমতা দিয়ে দেয়নি, বরং কেবল বিচার ও আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রকে দিয়েছে। মানুষের 'জীবন, লিবার্টি এবং সম্পত্তি'-র অধিকার রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে।

  • সার্বভৌমত্বের প্রকৃতি: লকের সার্বভৌমত্ব হলো Limited (সীমিত)। রাষ্ট্র যদি জনগণের অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের অধিকার আছে সেই সরকারকে পরিবর্তন বা বিপ্লব করার।

  • ইংরেজি রেফারেন্স: তাঁর Two Treatises of Government (১৬৮৯) গ্রন্থে তিনি বলেন:

    "The end of law is not to abolish or restrain, but to preserve and enlarge freedom."

  • গণতন্ত্রে প্রভাব: লকের এই তত্ত্বই আধুনিক সাংবিধানিক গণতন্ত্রের ভিত্তি।

৩. জঁ-জ্যাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau): জনগণের সার্বভৌমত্ব

রুশোর তত্ত্ব আপনার প্রশ্নের সবচেয়ে কাছাকাছি। তিনি মনে করতেন, সার্বভৌমত্ব কোনো রাজার কাছে নয়, বরং সমাজের সকল মানুষের 'General Will' বা সাধারণ ইচ্ছার মধ্যে নিহিত।

  • সার্বভৌমত্বের প্রকৃতি: সার্বভৌমত্ব হলো Popular (জনগণের)। এটি অবিভাজ্য এবং অপ্রতিস্থাপনযোগ্য।

  • ইংরেজি রেফারেন্স: তাঁর The Social Contract (১৭৬২) গ্রন্থে তিনি লিখেছেন:

    "Sovereignty, being nothing other than the exercise of the general will, can never be alienated."

  • গণভোটের উৎস: রুশোর এই 'সাধারণ ইচ্ছা' থেকেই আজকের গণভোটের ধারণা এসেছে। যখন সংসদ জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়, তখন জনগণ সরাসরি সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়োগ করে।

সামাজিক চুক্তি কি আসলেই সার্বভৌমত্বের মূল উৎস?

সামাজিকভাবে এবং নৈতিকভাবে— হ্যাঁ। এর কারণগুলো হলো:

  1. সম্মতি (Consent): এই তত্ত্ব অনুযায়ী, জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো শাসন বৈধ নয়। আজকের নির্বাচনে ভোট দেওয়া মূলত সেই আদি সামাজিক চুক্তিরই একটি আধুনিক সংস্করণ।

  2. চুক্তি ভঙ্গ ও বিপ্লব: যেহেতু সার্বভৌমত্ব একটি চুক্তির ফসল, তাই শাসক যদি চুক্তির শর্ত (জননিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা) ভঙ্গ করে, তবে সার্বভৌম ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জনগণের কাছে ফিরে আসে।

    • জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে: যখন পূর্বতন সরকার জনগণের ওপর গুলি চালিয়ে 'সামাজিক চুক্তি' ভঙ্গ করেছে, তখন সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরে এসেছে এবং তারা নতুন করে রাষ্ট্র সংস্কারের ম্যান্ডেট দিয়েছে।

  3. সংবিধান বনাম জনমত: সংবিধান হলো এই চুক্তির একটি লিখিত রূপ। কিন্তু চুক্তির মালিক যেহেতু জনগণ, তাই তারা প্রয়োজনে গণভোটের মাধ্যমে সেই চুক্তি সংশোধন বা পুনর্লিখন করতে পারে।

ঐতিহাসিক ও দার্শনিক সিদ্ধান্ত

সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব আমাদের শেখায় যে, সংসদ বা সংবিধান সার্বভৌমত্বের 'এজেন্ট' বা প্রতিনিধি মাত্র; আসল 'প্রিন্সিপাল' বা মালিক হলো জনগণ। তাই যখনই কোনো মৌলিক সংকট তৈরি হয়, তখন প্রতিনিধি (সংসদ) নয়, বরং মালিকের (জনগণ) সরাসরি সিদ্ধান্তই (গণভোট) চূড়ান্ত হওয়া উচিত।

"Government is a trust, and the officers of the government are trustees; and both the trust and the trustees are created for the benefit of the people."Henry Clay


সার্বভৌমত্বের মালিকানাঃ চার্চ থেকে জনগণ

মানবসভ্যতায় সার্বভৌমত্বের এই রূপান্তর একটি দীর্ঘ এবং রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস। এটি মূলত "ঐশ্বরিক অধিকার" (Divine Right) থেকে "জনগণের সম্মতি" (Consent of the People)-তে উত্তরণের গল্প। এই বিবর্তনকে তিনটি প্রধান ধাপে ব্যাখ্যা করা যায়:

১. চার্চ ও রাজতন্ত্রের নিরঙ্কুশ শাসন (The Era of Divine Right)

মধ্যযুগে ইউরোপে ধারণা করা হতো যে, রাজার ক্ষমতা সরাসরি ঈশ্বরের কাছ থেকে আসে। একে বলা হতো 'Divine Right of Kings'। পোপ বা চার্চ ছিল ঈশ্বরের প্রতিনিধি, তাই রাজার ক্ষমতা বৈধ করার চাবিকাঠি ছিল চার্চের হাতে।

  • দার্শনিক ভিত্তি: রবার্ট ফিলমার (Robert Filmer) তাঁর 'Patriarcha' গ্রন্থে রাজাদের এই ঐশ্বরিক ক্ষমতা সমর্থন করেন।

  • সার্বভৌমত্ব: তখন সার্বভৌমত্ব ছিল ওপর থেকে নিচের দিকে (Top-down)। জনগণ ছিল কেবল 'প্রজা', যাদের কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছিল না।


২. রেনেসাঁ, সেকুলারিজম এবং ওয়েস্টফালিয়া (The Shift to State Sovereignty)

১৬৪৮ সালের 'Peace of Westphalia' ছিল প্রথম বড় পরিবর্তন। এর মাধ্যমে চার্চের রাজনৈতিক ক্ষমতা খর্ব করা হয় এবং রাষ্ট্রকে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

  • ম্যাকিয়াভেলি ও বোঁদা: নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি এবং জঁ বোঁদা সার্বভৌমত্বকে ধর্ম থেকে আলাদা করে রাষ্ট্রের হাতে ন্যস্ত করেন। বোঁদা তাঁর 'Six Books of the Commonwealth' (১৫৭৬) গ্রন্থে বলেন:

    "Sovereignty is the absolute and perpetual power of a republic."

  • ফলাফল: ক্ষমতা পোপের হাত থেকে সম্রাটের হাতে গেল, কিন্তু তখনও জনগণের হাতে আসেনি।


৩. সামাজিক চুক্তি ও জনগণের সার্বভৌমত্ব (The Rise of Popular Sovereignty)

প্রকৃত রূপান্তর ঘটে ১৭শ ও ১৮শ শতাব্দীতে জন লক এবং রুশোর হাত ধরে। তারা দাবি করেন, সার্বভৌমত্বের উৎস ঈশ্বর নন, বরং সাধারণ মানুষ।

  • জন লক (John Locke): ১৬৮৮ সালের ইংল্যান্ডের 'গৌরবময় বিপ্লব'-এর প্রেক্ষাপটে লক তাঁর 'Two Treatises of Government' (১৬৮৯) গ্রন্থে লিখলেন:

    "The supreme power remains still in the people."

    তিনিই প্রথম বলেন, শাসক যদি জনগণের অধিকার রক্ষা না করে, তবে জনগণ তাকে হঠানোর অধিকার রাখে। এটিই রাজতন্ত্রের কফিনে প্রথম পেরেক।

  • জঁ-জ্যাক রুশো (J.J. Rousseau): ১৭৬২ সালে রুশো তাঁর 'The Social Contract' গ্রন্থে চূড়ান্ত ঘোষণা দিলেন:

    "Sovereignty, being nothing other than the exercise of the general will, can never be alienated."

    রুশোর এই 'General Will' বা সাধারণ ইচ্ছার ধারণাটিই ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) মূল জ্বালানি ছিল, যেখানে স্লোগান ছিল— "সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তির নয়, বরং জাতির (Nation)।"


৪. আধুনিক রূপান্তর: সংবিধান ও ভোটাধিকার

ফরাসি এবং আমেরিকান বিপ্লবের পর সার্বভৌমত্ব সরাসরি জনগণের হাতে আসে। তবে এই সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের জন্য একটি কাঠামোর প্রয়োজন ছিল, যা হলো 'সংবিধান'

  • অ্যালবার্ট ভেন ডাইসি (A.V. Dicey): তিনি আইনগত এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের মধ্যে পার্থক্য দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, সংসদ আইনগতভাবে সার্বভৌম হলেও তার পেছনে থাকা ভোটাররা (জনগণ) হলো রাজনৈতিকভাবে সার্বভৌম

    "The political sovereign of the State is the electorate."

    A.V. Dicey, Introduction to the Study of the Law of the Constitution (১৮৮৫)


ঐতিহাসিক বিবর্তনের সারসংক্ষেপ

ক্রম সময়কাল সার্বভৌমত্বের ধরণ শক্তির উৎস মূল ধারণা
মধ্যযুগ ঐশ্বরিক (Divine) ঈশ্বর/চার্চ রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধি।
১৬শ-১৭শ শতক রাষ্ট্রীয় (State) রাজতন্ত্র/সম্রাট রাষ্ট্র চার্চ থেকে মুক্ত, কিন্তু রাজা চূড়ান্ত।
১৮শ শতক-বর্তমান জনপ্রিয় (Popular) জনগণ শাসন ক্ষমতা জনগণের সম্মতির ফসল।

উপসংহার

চার্চ বা সম্রাটের সার্বভৌমত্ব ছিল 'বলপ্রয়োগ' এবং 'ধর্মের' ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু আধুনিক যুগে তা রূপান্তরিত হয়েছে 'যুক্তি' এবং 'সামাজিক চুক্তির' ভিত্তিতে। আজকের দিনে যখন আমরা 'গণভোট' বা 'নির্বাচনের' কথা বলি, তখন আমরা আসলে রুশো এবং লকের সেই তত্ত্বকেই চর্চা করি যা প্রমাণ করে যে— পৃথিবীর কোনো শাসক বা সংবিধান জনগণের ইচ্ছার ঊর্ধ্বে নয়।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে, জুলাই অভ্যুত্থান মূলত এই ঐতিহাসিক সত্যকেই পুনপ্রতিষ্ঠিত করেছে: "যখন প্রাতিষ্ঠানিক সার্বভৌমত্ব (সংসদ/সংবিধান) ব্যর্থ হয়, তখন প্রকৃত সার্বভৌমত্ব তার আদি উৎস অর্থাৎ জনগণের কাছে ফিরে আসে।"



  • বিষয়টি অত্যন্ত গভীর এবং এটি একটি রাষ্ট্রের 'বৈপ্লবিক মুহূর্ত' (Revolutionary Moment)'সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা' (Constitutional Continuity)-র মধ্যকার চিরায়ত দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে এসেছে।

    জুলাই অভ্যুত্থান বা 'জুলাই সনদ' পরবর্তী পরিস্থিতিতে গণভোটের আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর (যেমন বিএনপি) সাংবিধানিক অবস্থানের মধ্যে যে বৈপরীত্য, তা দার্শনিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা হলো:

    ১. দার্শনিক প্রেক্ষাপট: 'লিগালিটি' বনাম 'লেজিটিমেসি'

    রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বৈধতা (Legality) এবং যৌক্তিকতা (Legitimacy) দুটি আলাদা বিষয়।

    • বিপ্লবের অধিকার (Right to Revolution): জন লক এবং থমাস জেফারসনের মতে, যখন একটি সরকার স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে এবং জনগণের অধিকার হরণ করে, তখন জনগণের অধিকার আছে সেই সরকারকে হঠানোর। জুলাই অভ্যুত্থান ছিল সেই 'বিপ্লবের অধিকার'-এর প্রয়োগ।

    • সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস: যখন একটি বিপ্লব সফল হয়, তখন বিদ্যমান সংবিধান কার্যত স্থগিত বা গৌণ হয়ে পড়ে। কারণ বিপ্লব নিজেই একটি নতুন 'সার্বভৌমত্বের উৎস' তৈরি করে। একে বলা হয় Original Constituent Power

    • দ্বন্দ্ব: বিএনপি যখন সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে, তারা মূলত 'লিগালিটি' বা আইনের অক্ষরের কথা বলছে। অন্যদিকে, ৬৯% মানুষের গণভোটের আকাঙ্ক্ষা হলো 'লেজিটিমেসি' বা জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট। দার্শনিক দৃষ্টিতে, বিপ্লব পরবর্তী সময়ে জনগণের সরাসরি ইচ্ছাই (গণভোট) চূড়ান্ত হওয়ার কথা।

    ২. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: 'ডকট্রিন অফ নেসেসিটি' (প্রয়োজনীয়তার তত্ত্ব)

    ইতিহাসে দেখা গেছে, অনেক সময় সংবিধান লঙ্ঘন করেই বৃহত্তর জনস্বার্থে পরিবর্তন আনা হয়।

    • ১৯৭১-এর উদাহরণ: বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Proclamation of Independence) তৎকালীন পাকিস্তানের সংবিধান মেনে হয়নি। সেটি ছিল একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

    • অসংগতি: রাজনৈতিক দলগুলো যখন স্বৈরাচার পতনের আন্দোলন করে, তখন তারা সংবিধানের ঊর্ধ্বে গিয়ে 'জনগণ' ও 'বিপ্লব'-কে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হলেই তারা আবার পুরনো সংবিধানের দোহাই দেয় নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ (যেমন দ্রুত নির্বাচন বা পুরনো কাঠামোর সুরক্ষা) হাসিল করতে। একে বলা হয় 'রাজনৈতিক সুবিধাবাদ' (Political Expediency)

    ৩. সামাজিক তত্ত্ব: সামাজিক চুক্তির পুনর্লিখন

    সমাজবিজ্ঞানী এমানুয়েল সিয়েস (Emmanuel Sieyès)-এর মতে, একটি জাতি যখন জেগে ওঠে, তখন তারা পুরনো সব নিয়ম ভেঙে নতুন 'সামাজিক চুক্তি' (Social Contract) তৈরি করার ক্ষমতা রাখে।

    • জুলাই সনদ: এটি একটি নতুন সামাজিক চুক্তির প্রস্তাব। যদি জনগণের বিশাল অংশ (আপনার তথ্যমতে ৬৯%) এর পক্ষে থাকে, তবে সেটিই হলো নতুন সার্বভৌম ইচ্ছা।

    • সংসদীয় রাজনীতির সীমাবদ্ধতা: রাজনৈতিক দলগুলো (বিএনপি জোটসহ) মূলত পুরনো সাংবিধানিক কাঠামোতে অভ্যস্ত। তারা ভয় পায় যে গণভোটের মাধ্যমে যদি নতুন কোনো ব্যবস্থা (যেমন দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ বা ক্ষমতার ভারসাম্য) চলে আসে, তবে তাদের একক আধিপত্য নষ্ট হতে পারে।

    ৪. আইনি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

    আপনার পর্যবেক্ষণ সঠিক যে— যিনি সংবিধান ভেঙে স্বৈরাচার তাড়ানোর আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেন, তিনি যদি আবার সেই পুরনো সংবিধানের দোহাই দিয়ে জনমত (গণভোট) উপেক্ষা করেন, তবে সেখানে একটি 'নৈতিক সংকট' (Moral Crisis) তৈরি হয়।

    • সংবিধানে নেই বনাম সংবিধান তৈরি: সংবিধান কোনো আসমানি কিতাব নয়; এটি মানুষের প্রয়োজনে তৈরি। যদি ৬৯% মানুষ জুলাই সনদের পক্ষে থাকে, তবে সংসদ বা রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হলো সেই আকাঙ্ক্ষাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা, সংবিধানে নেই বলে সেটিকে খারিজ করা নয়।

    • দ্বিমুখী আচরণ: যখন একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা বিপ্লবী সরকার শপথ নেয়, তারা কার্যত সংবিধানের একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে (Extra-constitutional context) কাজ করে। তাই সেই সময় "সংবিধানে নেই" বলে গণভোটকে এড়িয়ে যাওয়া একটি বড় ধরনের যৌক্তিক অসংগতি (Logical Inconsistency)

    উপসংহার

    চুড়ান্ত বিচারে, একটি সফল গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের আকাঙ্ক্ষাই (Public Will) হলো সর্বোচ্চ আইন। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সংবিধানের দোহাই দিয়ে বড় কোনো পরিবর্তন (জুলাই সনদ) আটকে দেয়, তবে তারা মূলত 'বিপ্লবের ম্যান্ডেট' বা 'জুলাই বিপ্লব'-এর মূল স্পিরিটকে অস্বীকার করছে।

    ঐতিহাসিক সত্য হলো: সংবিধান জনগণের জন্য, জনগণ সংবিধানের জন্য নয়। যদি বর্তমান সংবিধান গণআকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে গণভোটই হলো সেই সংবিধানকে সংস্কার বা পুনর্লিখন করার সবচেয়ে গণতান্ত্রিক পথ।

Previous
Previous

‘লিগ্যালিটি বনাম লেজিটিমেসি’-স্বৈরাচারের গোড়াপত্তন ও অবসান (১১)

Next
Next

বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ১০টি গণভোট (৯)