‘লিগ্যালিটি বনাম লেজিটিমেসি’-স্বৈরাচারের গোড়াপত্তন ও অবসান (১১)

১. ভূমিকা (Introduction)

রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইনশাস্ত্রে 'লিগালিটি' এবং 'লেজিটিমেসি' শব্দ দুটি প্রায়ই সমার্থক মনে হলেও এদের মধ্যে এক বিশাল তাত্ত্বিক ব্যবধান রয়েছে। সহজ কথায়, লিগালিটি হলো আইনের কঠোর অনুসরণ, আর লেজিটিমেসি হলো সেই আইনের নৈতিক ভিত্তি বা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন। কোনো শাসন আইনসম্মত বা 'লিগ্যাল' হয়েও 'ইললেজিটিমেট' (অবৈধ) হতে পারে, যা আমরা প্রায়শই বিপ্লবী পরিস্থিতিতে দেখতে পাই।




২. লিগালিটি: আইনের যান্ত্রিক রূপ (The Concept of Legality)

লিগালিটি বা আইনগত বৈধতা বলতে বোঝায় বিদ্যমান সংবিধান বা সংবিধিবদ্ধ আইন অনুযায়ী কোনো কাজ করা। এটি একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া (Formal process)।

  • দার্শনিক ভিত্তি: আইনগত ইতিবাদ বা Legal Positivism-এর প্রবক্তা John Austin এবং Hans Kelsen এই ধারণার প্রধান প্রবক্তা।

  • রেফারেন্স: জন অস্টিন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'The Province of Jurisprudence Determined' (১৮৩২)-এ বলেছেন:

    "Law is the command of the sovereign."

    (আইন হলো সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের আদেশ।)

  • "Legality refers to whether an action or government follows the established black-letter laws and procedures."




৩. লেজিটিমেসি: নৈতিক ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা (The Concept of Legitimacy)

লেজিটিমেসি হলো জনগণের সেই বিশ্বাস যে- শাসন ব্যবস্থাটি ন্যায়সঙ্গত এবং তা মেনে চলা নৈতিক দায়িত্ব। এটি আইনের প্রাণ।

  • দার্শনিক ভিত্তি: প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী Max Weber লেজিটিমেসিকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। তাঁর মতে, কেবল আইন থাকলেই হয় না, জনগণের মনে সেই আইনের প্রতি 'বৈধতার বিশ্বাস' (Belief in legitimacy) থাকতে হয়।

  • রেফারেন্স: ম্যাক্স ওয়েবার তাঁর 'Economy and Society' (১৯২২) গ্রন্থে লিখেছেন:

    "Legitimacy is the foundation of such power as is exercised with the consciousness on the government's part that it has a right to govern and with the recognition by the governed of that right."

  • "Legitimacy is the moral right to rule and the social acceptance of authority by the people."


সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) তাঁর রাজনৈতিক সমাজতত্ত্বে কর্তৃত্ব বা লেজিটিমেসিকে (বৈধতা) তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন। তিনি দেখার চেষ্টা করেছেন যে, মানুষ কেন এবং কীভাবে কোনো শাসকের আদেশ মেনে নেয় বা তাকে বৈধ বলে স্বীকার করে।

ওয়েবার-এর এই তিনটি ভাগ হলো:

১. ঐতিহ্যগত লেজিটিমেসি (Traditional Legitimacy)

এই প্রকার বৈধতা দীর্ঘদিনের প্রথা, রীতি-নীতি এবং ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষ বিশ্বাস করে যে, "যেহেতু এটি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, তাই এটি সঠিক।"

  • ভিত্তি: বংশপরম্পরা, রাজতন্ত্র বা ধর্মীয় রীতিনীতি।

  • উদাহরণ: রাজতন্ত্র (Monarchy), যেখানে রাজার সন্তান রাজা হন। মানুষ রাজার আদেশ মেনে নেয় কারণ তাদের পূর্বপুরুষরাও তা মেনে চলত।

  • উক্তি : "Based on the sanctity of age-old rules and powers."


২. ক্যারিশম্যাটিক লেজিটিমেসি (Charismatic Legitimacy)

এই বৈধতা শাসকের কোনো অসাধারণ ব্যক্তিগত গুণাবলি, বীরত্ব বা জাদুকরী ব্যক্তিত্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। জনগণ যখন নেতার প্রতি মুগ্ধ হয়ে তাকে "ত্রাতা" বা "মহানায়ক" মনে করে, তখন তারা তাকে বৈধতা দেয়।

  • ভিত্তি: নেতার প্রতি অন্ধ ভক্তি এবং তাঁর আদর্শের প্রতি মানুষের আবেগীয় টান।

  • উদাহরণ: মহাত্মা গান্ধী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা নেলসন ম্যান্ডেলার মতো জনপ্রিয় নেতারা। বিপ্লবের সময় সাধারণত এই ধরণের লেজিটিমেসি বেশি দেখা যায়।

  • উক্তি : "Based on the devotion to the exceptional sanctity, heroism, or exemplary character of an individual person."


৩. আইনগত-যৌক্তিক লেজিটিমেসি (Legal-Rational Legitimacy)

আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর ভিত্তি হলো এই লেজিটিমেসি। এখানে মানুষ কোনো ব্যক্তি বা ঐতিহ্যের প্রতি অনুগত থাকে না, বরং একটি সুনির্দিষ্ট আইন, নিয়ম এবং সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকে।

  • ভিত্তি: সংবিধান, লিখিত আইন এবং আমলাতান্ত্রিক কাঠামো। এখানে শাসকও আইনের অধীন।

  • উদাহরণ: আধুনিক গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা বা আমলাতন্ত্র। আমরা যখন কোনো অফিসারের আদেশ মানি, তখন সেই ব্যক্তিকে নয় বরং তাঁর পদের আইনি ক্ষমতাকে সম্মান করি।

  • উক্তি: "Based on the belief in the legality of enacted rules and the right of those elevated to authority under such rules to issue commands."


জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশের সাথে এর সংযোগ:

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে একটি চমৎকার বিশ্লেষণ করা যায়:

  • স্বৈরাচারী শাসনের শেষ দিকে তারা কেবল 'আইনগত' (Legal-Rational) দোহাই দিচ্ছিল, কিন্তু তাদের 'ক্যারিশম্যাটিক' বা প্রকৃত 'জন-লেজিটিমেসি' হারিয়ে গিয়েছিল।

  • জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যখন ছাত্র-জনতা রাজপথে নামে, তখন তারা পুরনো আইনকে চ্যালেঞ্জ করে এক ধরণের 'বিপ্লবী লেজিটিমেসি' (যা ক্যারিশম্যাটিক লেজিটিমেসির একটি রূপ) তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত পুরনো কাঠামোর পতন ঘটায়।

এখন চ্যালেঞ্জ হলো, এই বৈপ্লবিক ম্যান্ডেটকে কীভাবে একটি স্থায়ী Legal-Rational (আইনগত-যৌক্তিক) কাঠামোতে বা নতুন সংবিধানে রূপান্তর করা যায়।


৪. লিগালিটি বনাম লেজিটিমেসি: সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু

যখন একটি সরকার জনগণের ম্যান্ডেট হারিয়েও পুরনো আইনের দোহাই দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকে, তখন লিগালিটি ও লেজিটিমেসির মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়।

  • বিখ্যাত দার্শনিক বিতর্ক: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর Carl Schmitt এবং Hans Kelsen-এর মধ্যে এই বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। কার্ল শ্মিট তাঁর 'Legality and Legitimacy' (১৯৩২) গ্রন্থে যুক্তি দেন যে, সংকটের সময় কেবল 'লিগালিটি' দিয়ে রাষ্ট্র বাঁচে না, তখন জনগণের 'লেজিটিমেসি' বা আকাঙ্ক্ষাই চূড়ান্ত হয়।

  • রেফারেন্স (Carl Schmitt):

    "A system of legality is a functionalist system of points and procedures, but legitimacy is the substance of power."

    (আইনগত বৈধতা হলো স্রেফ কিছু পদ্ধতি ও নিয়মের সমষ্টি, কিন্তু লেজিটিমেসি বা জন-গ্রহণযোগ্যতা হলো ক্ষমতার আসল নির্যাস।)

৫. বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন ৬৯% মানুষের গণভোটের আকাঙ্ক্ষা বা 'জুলাই সনদ' নিয়ে বিতর্ক হয়, তখন রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়শই 'লিগালিটি' বা বর্তমান সংবিধানের দোহাই দেয়। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থান নিজেই একটি 'Extra-Constitutional' বা সংবিধান-বহির্ভূত ঘটনা, যা নতুন 'Revolutionary Legitimacy' বা বৈপ্লবিক বৈধতা তৈরি করেছে।

  • দার্শনিক রেফারেন্স (Thomas Jefferson):

    "The law of self-preservation is higher than the written laws."

    (আত্মরক্ষার আইন (বা জাতির টিকে থাকার আকাঙ্ক্ষা) লিখিত আইনের চেয়েও উঁচুতে অবস্থান করে।)

৬. উপসংহার: কোনটি চূড়ান্ত?

চুড়ান্ত বিচারে, লেজিটিমেসি বা জনগণের সমর্থন ছাড়া লিগালিটি বা আইন হলো একটি প্রাণহীন কঙ্কাল। ইতিহাসে দেখা গেছে, যখনই কোনো আইন বা সংবিধান জনগণের আকাঙ্ক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক হয়েছে, তখন সেই আইন ভেঙে পড়েছে। কারণ— "Power is not mere obedience to laws; it is the trust of the people."

চুম্বক অংশ (Quick Reference):

১. "Legal is what is on paper; Legitimate is what is in the heart of the people."

২. "A dictator can have legality, but never legitimacy."

৩. রেফারেন্স: হার্ভার্ডের অধ্যাপক Samuel Huntington-এর মতে, যখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের আকাঙ্ক্ষার সাথে খাপ খাওয়াতে পারে না, তখন লিগালিটি অর্থহীন হয়ে পড়ে।


Reference:

০১। Economy and Society (In German: Wirtschaft und Gesellschaft), Max Weber (1922)

  • Chpater: "The Types of Legitimate Domination"

২। The legality and Legitimacy (1932), Carl Schmitt.

Previous
Previous

সামাজিক চুক্তিঃ নির্বাচিত এমপিদের বৈধতার উৎস? (১২)

Next
Next

‘সামাজিক চুক্তি’- সার্বভৌমত্বের উৎসবিন্দু (১০)