সামাজিক চুক্তিঃ নির্বাচিত এমপিদের বৈধতার উৎস? (১২)
একজন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের জন্য তার ক্ষমতার উৎস, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং ক্ষমতার সীমা অনুধাবন করা অপরিহার্য। এ বিষয়ে এ প্রবন্ধে আলোকপাত করা হয়েছে।
ভূমিকা:
একটি দেশে যখন একদল প্রতিনিধি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে বসেন, তখন অনেক সময় তারা আত্মতৃপ্তিতে ভোগেন যে—ক্ষমতা এখন তাদের হাতে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধ্রুপদী দর্শন বলছে অন্য কথা। ক্ষমতার আসল উৎস এবং এর নৈতিক সীমানা বুঝতে হলে আমাদের ফিরতে হবে মানব সভ্যতার সেই আদি 'সামাজিক চুক্তি'র ইতিহাসে।
ক্ষমতার উৎস: ঐশ্বরিক অধিকার থেকে সামাজিক চুক্তি
মধ্যযুগে বিশ্বাস করা হতো রাজার ক্ষমতা ঈশ্বরের দান (Divine Right of Kings)। কিন্তু সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে থমাস হবস, জন লক এবং জঁ-জ্যাক রুশো এই ধারণা তছনছ করে দেন। তারা প্রমাণ করেন, ক্ষমতা ওপর থেকে আসে না, বরং নিচ থেকে—অর্থাৎ জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে তৈরি হয়।
. আপনারা মালিক নন, আপনারা ‘ট্রাস্টি’ (Trustee):
জন লকের (John Locke) তাঁর 'Two Treatises of Government' গ্রন্থে একটি বৈপ্লবিক কথা বলেছেন। তাঁর মতে, সরকার বা সংসদ হলো জনগণের দেওয়া একটি আমানত বা ‘ট্রাস্ট’। জনগণ তাদের জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার শর্তে শাসকদের হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত করে।
শিক্ষা: এমপিরা জনগণের প্রভু নন, বরং আমানতদার। যদি কোনো সংসদ সদস্য এই আমানতের খেয়ানত করেন, তবে তাত্ত্বিকভাবে তিনি তার পদে থাকার নৈতিক বৈধতা হারান। লকের ভাষায়— "The supreme power remains still in the people."
২. সামাজিক চুক্তি: মৌন সম্মতি ও দায়বদ্ধতা:
যদি কোনো প্রতিনিধি প্রশ্ন করেন— "চুক্তিটি কবে সই হয়েছে?" এর উত্তর হলো জন লকের 'মৌন সম্মতি' (Tacit Consent) তত্ত্ব। আপনি যখন রাষ্ট্রের পাসপোর্ট বহন করেন, আইনসভা থেকে বেতন-ভাতা নেন এবং সংবিধানের শপথ নেন, তখনই আপনি সেই আদি সামাজিক চুক্তিতে সই করেছেন। এই চুক্তি আপনাকে ক্ষমতা দিয়েছে জনকল্যাণের জন্য, ব্যক্তিগত আধিপত্যের জন্য নয়।
৩. লিগ্যালিটি বনাম লেজিটিমেসি: আইনের অক্ষর বনাম মানুষের হৃদয়
ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) তাঁর 'Economy and Society' গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, ক্ষমতার তিনটি উৎস থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো 'আইনগত-যৌক্তিক' (Legal-Rational) বৈধতা। কিন্তু অনেক সময় শাসকরা কেবল আইনের মারপ্যাঁচে (Legality) ক্ষমতায় টিকে থাকতে চান। কিন্তু যদি জনগণের অন্তরে সেই শাসনের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বা 'লেজিটিমেসি' (Legitimacy) না থাকে, তবে সেই ক্ষমতা স্রেফ পুলিশি পাহারায় টিকে থাকা একটি প্রাণহীন কাঠামো মাত্র।
৪. জঁ-জ্যাক রুশোর ‘জেনারেল উইল’ (General Will):
ফরাসি দার্শনিক রুশো তাঁর 'The Social Contract' গ্রন্থে বলেছেন, সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তির নয়, বরং জনগণের সামষ্টিক ইচ্ছা বা 'জেনারেল উইল'-এর হাতে। সংসদ যদি জনগণের এই সামষ্টিক আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো আইন তৈরি করে, তবে সেই আইন সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। কারণ স্রষ্টা (জনগণ) কখনোই সৃষ্টি (সংসদ)-এর নিচে থাকতে পারে না।
৫. ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা: চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স:
সার্বভৌমত্ব মানেই স্বেচ্ছাচারিতা নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মঁতেস্কু (Montesquieu) ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির মাধ্যমে শিখিয়েছেন যে, আইনসভার ক্ষমতা নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। ক্ষমতার সীমাহীন চর্চা সর্বদাই স্বৈরতন্ত্রের দিকে নিয়ে যায়।
উপসংহার:
নবনির্বাচিত এমপিদের মনে রাখা প্রয়োজন, সংসদ ভবনের চেয়ারটি কোনো স্থায়ী সিংহাসন নয়। এটি একটি সামাজিক চুক্তির দলিল। এই চুক্তির মূল শর্ত হলো—জনগণের সেবা এবং অধিকার রক্ষা। যখনই কোনো আইন বা পদক্ষেপ এই চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে, তখনই জনগণের হাতে সেই ক্ষমতা 'প্রত্যাবর্তন' করার প্রাকৃতিক অধিকার (Right to Revolt) ফিরে আসে।
ইতিহাস সাক্ষী, যে শাসকরা লিগ্যালিটির দোহাই দিয়ে লেজিটিমেসিকে উপেক্ষা করেছেন, সময় তাদের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছে। তাই ক্ষমতার গুমর ছেড়ে সামাজিক চুক্তির মহান আদর্শে ফিরে আসাই হোক আজকের দিনের শপথ।
-
সামাজিক চুক্তি (Social Contract) কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক চুক্তির মতো কাগজ-কলমে সই করা কোনো দলিল নয় যে, বর্তমান নির্বাচিত এমপি বা রাজনীতিবিদরা বলবেন যে "আমরা তো সই করিনি।" এটি একটি 'তাত্ত্বিক ও নৈতিক কাঠামো', যা রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে।
এমপিদের এই যুক্তির বিপরীতে দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিকরা যেভাবে উত্তর দিয়েছেন, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. চুক্তিটি আসলে কখন হয়েছে? (The Timing of the Contract)
সামাজিক চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট তারিখে (যেমন ১লা জানুয়ারি) হয়নি। এটি একটি বিমূর্ত ধারণা (Abstract Concept)।
দার্শনিক উত্তর: জন লক এবং রুশোর মতে, যখনই একদল মানুষ অরাজকতা ত্যাগ করে একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনে একমত হয়েছে, তখনই এই চুক্তি কার্যকর হয়েছে। এটি একটি 'অবিরাম প্রক্রিয়া' (Continuous Process)। যখনই একজন নাগরিক রাষ্ট্রের সুবিধা (নিরাপত্তা, রাস্তাঘাট, বিচার) গ্রহণ করেন, তিনি প্রকারান্তরে এই চুক্তিতে সই করেন।
২. চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী পক্ষ কারা? (The Parties Involved)
চুক্তিটি কোনো ব্যক্তি বিশেষের সাথে রাজার নয়, বরং "সবার সাথে সবার" (Everyone with everyone else)।
রেফারেন্স (Thomas Hobbes): তাঁর Leviathan (১৬৫১) গ্রন্থে তিনি লিখেছেন:
"A Commonwealth is said to be instituted when a multitude of men do agree, and covenant, every one with every one."
(একটি রাষ্ট্র তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন জনগণের এক বিশাল অংশ নিজেদের মধ্যে প্রতিজ্ঞা করে—প্রত্যেকে প্রত্যেকের সাথে।)
বর্তমান প্রেক্ষাপট: এখানে এমপিরা কোনো পক্ষ নন, তারা স্রেফ জনগণের নিয়োগকৃত 'ম্যানেজার' বা 'ট্রাস্টি' মাত্র। আসল চুক্তিটি হয়েছে জনগণের নিজেদের মধ্যে।
৩. এমপিদের অস্বীকার ও "পূর্বপুরুষদের চুক্তি" প্রসঙ্গ
যদি কোনো এমপি বলেন "আমি চুক্তি করিনি", তবে তার জবাবে জন লক (John Locke) এবং সক্রেটিস-এর 'ট্যাসিট কনসেন্ট' (Tacit Consent) বা 'মৌন সম্মতি' তত্ত্বটি ব্যবহার করা যায়।
ক. মৌন সম্মতি তত্ত্ব (The Theory of Tacit Consent)
জন লক তাঁর Second Treatise of Government (১৬৮৯) গ্রন্থে স্পষ্টভাবে বলেছেন:
"Every man, that hath any possessions, or enjoyment, of any part of the dominions of any government, doth thereby give his tacit consent."
(যে ব্যক্তিই কোনো সরকারের অধীনে থাকা ভূখণ্ডের সামান্যতম অংশ ভোগ করে বা সেখানে বসবাস করে, সে তার মাধ্যমে সরকারকে মৌন সম্মতি প্রদান করে।)
যুক্তি: এমপিরা যখন এই রাষ্ট্রের পাসপোর্ট ব্যবহার করেন, এই রাষ্ট্রের সংসদ ভবনে বসেন এবং রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, তখন তারা অটোমেটিক্যালি এই চুক্তিতে আবদ্ধ হন। এটি তাদের পূর্বপুরুষদের করা চুক্তি নয়, এটি তাদের প্রতিদিনের কাজ দ্বারা নবায়নকৃত চুক্তি।
খ. ডেভিড হিউম (David Hume) ও সামাজিক ধারাবাহিকতা
হিউম যদিও চুক্তির ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, কিন্তু তিনি সমাজতাত্ত্বিক বিচারে 'স্বার্থ ও উপযোগিতা' (Utility)-কে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর মতে, সমাজ টিকে থাকার স্বার্থেই এই চুক্তি বা বাধ্যবাধকতা প্রজন্মান্তরে বজায় থাকে।
৪. চুক্তির বিষয়বস্তু কী কী ছিল?
চুক্তির মূল শর্ত ছিল খুব সহজ: "আমি আমার প্রাকৃতিক স্বাধীনতা বিসর্জন দিচ্ছি এই শর্তে যে, রাষ্ট্র আমার নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকার রক্ষা করবে।"
জন লকের মতে: চুক্তির মূল বিষয় ছিল 'Life, Liberty, and Estate' (জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তি) রক্ষা করা।
বিপ্লবের অধিকার (Right to Revolt): লক আরও বলেছেন, যদি রাষ্ট্র বা এমপিরা (ট্রাস্টিরা) এই নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় বা জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়, তবে চুক্তি ভেঙে যায় এবং জনগণ তাদের ক্ষমতা ফেরত পায়।
৫. এমপিদের জন্য টিভি আলোচনার উপযোগী পয়েন্ট:
যদি কোনো এমপি এই চুক্তি অস্বীকার করেন, আপনি তাকে এভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন:
On Accountability: "According to John Locke, you are not the masters, but the Trustees. A trust doesn't need a signature on every page; it exists as long as you exercise the people's power."
On Tacit Consent: "By sitting in this Parliament and taking an oath under the Constitution, you have given your 'Tacit Consent' to the Social Contract. You cannot enjoy the privileges of the state while denying your obligations to the People."
On Popular Will (Rousseau): "Rousseau argued that 'The people is the sovereign.' If you deny the social contract, you deny your own legitimacy to represent the people."
উপসংহার
এমপিদের বোঝা উচিত যে, তারা এই চুক্তির 'স্রষ্টা' নন, তারা এই চুক্তির 'সৃষ্টি'। তারা যদি দাবি করেন যে তারা কোনো চুক্তিতে নেই, তবে তাত্ত্বিকভাবে তারা তাদের সংসদ সদস্য পদের বৈধতাও হারিয়ে ফেলেন। কারণ, তারা যে ভোট পেয়েছেন, সেই ভোট প্রদানই ছিল জনগণের পক্ষ থেকে চুক্তির একটি প্রকাশ্য রূপ (Express Consent)।
-
Description text goes here
-
Description text goes here