দূর্নীতির ধারণা সূচক বিশ্লেষণ (৪)

ভূমিকাঃ 
প্রতিটি নির্বাচনের আগে রাজঃনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে একটি বাক্য অভিন্ন থাকে— "দুর্নীতি দমন করা হবে।" কিন্তু জনমনে প্রশ্ন থেকে যায়, এই প্রতিশ্রুতি কি কেবলই কথার কথা, নাকি এর পেছনে কোনো বিজ্ঞানসম্মত কর্মপরিকল্পনা আছে? সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (TI) কর্তৃক প্রকাশিত ২০২৫ সালের (যা ২০২৬-এর শুরুতে আলোচিত) ‘দুর্নীতি ধারণা সূচক’ বা সিপিআই আমাদের এক রূঢ় বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ১০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর মাত্র ২৪। যদিও গতবারের চেয়ে ১ পয়েন্ট বেড়েছে, কিন্তু বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমরা এখনো দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় 'লাল তালিকায়' রয়ে গেছি।
প্রতিবছর জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহের বুধবার, অথবা ফেব্রুয়ারির ১ম/২য় সপ্তাহের বুধবার প্রকাশিত হয়ে থাকে। ১৯৯৫ সাল থেকে ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশ এই সূচক প্রকাশ করে আসছে এবং ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশ এ জরিপে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সাধারণত প্রতি ০২/০৩ বছরের তথ্যের গড় হিসাবে এই সূচক প্রকাশ করা হয়ে থাকে। চলমান ১ বছর এবং আগের ১/২ বছর এর তথ্য একত্র করে এই সুচক প্রকাশ করা হয়ে থাকে। যে বছরের চলমান তথ্য থাকে, সে বছরটি প্রতিবেদনের সাথে যুক্ত থাকে, যেমন দুর্নীতির ধারণা সূচক ২০২৫। এটি প্রকাশিত হয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বুধবার।    
২। ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশন্যাল দর্শনঃ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (TI) ১৯৯৩ সালে জার্মানির বার্লিনে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা পিটার আইজেন এর মূল উদ্যোক্তা। টিআই-এর মূল দর্শন হলো— দুর্নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত সমস্যা যা দারিদ্র্য বিমোচন, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের প্রধান অন্তরায়। টিআই বিশ্বাস করে, কেবল সচেতনতা দিয়ে দুর্নীতি দূর করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা। তাদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হলো এই ‘সিপিআই সূচক’, যা বিশ্বজুড়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক ধরণের জনমত তৈরি করে।
৩। দূর্নীতির ধারণা সূচক নির্ণয় ম্যাথোডোলজিঃ 
টিআই কীভাবে এই স্কোর নির্ধারণ করে? তারা সরাসরি নিজেরা তথ্য সংগ্রহ করে না, বরং বিশ্বখ্যাত ১৩টি প্রতিষ্ঠানের জরিপ ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ওপর ভিত্তি করে সূচক তৈরি করে। দুর্নীতি পরিমাপ করা কঠিন কারণ এটি গোপনে ঘটে, তাই টিআই 'পারসেপশন' বা মানুষের ও বিশেষজ্ঞদের ধারণাকে গুরুত্ব দেয়। কোনো দেশকে তালিকায় আসতে হলে অন্তত ৩টি উৎসের তথ্যের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এবার ৮টি উৎস ব্যবহার করা হয়েছে। 


৪। ব্যবহৃত সূচকগুলো মূলত কী পরিমাপ করে?

টি আই সরাসরি দুর্নীতি মাপতে পারে না (কারণ দুর্নীতি গোপনে হয়), তাই তারা নিচের বিষয়গুলোর 'পারসেপশন' বা ধারণা পরিমাপ করে:

(১). সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ গ্রহণ;

(২). সরকারি কেনাকাটায় দুর্নীতির বিস্তার;

(৩). দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারি পদক্ষেপের কার্যকারিতা;

(৪). দুর্নীতিবাজদের বিচার হওয়ার সম্ভাবনা; এবং

(৫) তথ্য অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা


৫) এই ৮টি সংস্থা তাদের জরিপে মূলত নিচের ০৮টি সূচক পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশের স্কোর নির্ধারণ করেছে:

১. ঘুষ লেনদেন (Bribery): সরকারি সেবা পেতে বা ব্যবসা পরিচালনায় কতটা ঘুষ দিতে হয়।

২. সরকারি অর্থের অপব্যবহার (Diversion of Public Funds): বাজেটের টাকা বা পাবলিক ফান্ড কতটা ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে সরানো হয়।

৩. জনপ্রশাসনে স্বজনপ্রীতি (Nepotism): সরকারি চাকরিতে নিয়োগ বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বা আত্মীয়তাকে প্রাধান্য দেওয়া।

৪. বিচারের আওতায় আনা (Prosecution): দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কি যথাযথ বিচার হয়, নাকি তারা দায়মুক্তি (Impunity) পায়?

৫. রাষ্ট্রীয় দখলদারিত্ব (State Capture): শক্তিশালী গোষ্ঠী বা প্রভাবশালীরা কি নিজেদের স্বার্থে দেশের আইন বা নীতি পরিবর্তন করতে পারে?

৬. তথ্য অধিকার ও স্বচ্ছতা: সাধারণ মানুষ কি সরকারি খরচের হিসাব বা তথ্য সহজে পায়?

৭. হুইসেল ব্লোয়ারদের সুরক্ষা: যারা দুর্নীতির তথ্য ফাঁস করে দেয়, তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা কেমন?

৮. ব্যুরোক্রেটিক জটিলতা (Red Tape): সরকারি কাজে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কি দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করছে?


৬। ২০২৫ দূর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানঃ 
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (TI) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ দুর্নীতি ধারণা সূচক (CPI) ২০২৫ অনুযায়ী, ১৮০টি দেশের মধ্যে তালিকার নিচের দিক থেকে (অর্থাৎ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্রমে) বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম উল্লেখ্য যে, গত বছর (২০২৪ সালের রিপোর্টে) বাংলাদেশ নিচের দিক থেকে ১৪ তম অবস্থানে ছিল, তবে সেই তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশের স্কোর এবং অবস্থানের কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে:
  • প্রাপ্ত স্কোর: ১০০-এর মধ্যে ২৪ (গত বছর এই স্কোর ছিল ২৩)। অর্থাৎ বাংলাদেশ ১ পয়েন্ট উন্নতি করেছে।
  • অবস্থান (নিচের দিক থেকে): ১৩ম।
  • অবস্থান (উপরের দিক থেকে): ১৫০তম (১৮০টি দেশের মধ্যে)।


৭। দূর্নীতির ধারণা সূচকের স্কেলঃ

এই সূচককে ০-১০০ স্কেল প্রকাশ করা হয়। ০ মানে দূর্নীতির সর্বনিম্ন মান, এবং ১০০ সবচেয়ে ক্লিন।

স্কোর ২৪ এর অর্থ কী? ০ থেকে ১০০ স্কেলের মধ্যে যদি কোনো দেশের স্কোর ৫০-এর নিচে থাকে, তবে সেই দেশের দুর্নীতি পরিস্থিতি 'উদ্বেগজনক' হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশের বর্তমান স্কোর (২৪) নির্দেশ করে যে আমাদের দেশে দুর্নীতি এখনো অত্যন্ত প্রকট বা 'ভয়াবহ' (রেড জোন) স্তরে রয়েছে।


৯। ২০২৬ সালের আলোকে ৮টি সোর্সের বিশ্লেষণঃ 
এ বছর বাংলাদেশের স্কোর ২৪ হওয়ার পেছনে ৮টি প্রধান বৈশ্বিক উৎসের তথ্য কাজ করেছে। এই উৎসগুলো আমাদের প্রশাসনের আটটি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষতস্থানকে নির্দেশ করছে:
১. আইনের শাসন (WJP): এখানে আমাদের স্কোর সর্বনিম্ন (১৬)। এর মানে হলো অপরাধী রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলে আইন তার ওপর কাজ করে না।
২. ব্যবসায়িক বাধা (EIU): এই সূচকের ২০ স্কোর বলছে, বড় বিনিয়োগ বা ব্যবসা শুরু করতে এখনো পর্দার আড়ালে বড় অংকের লেনদেন করতে হয়।
৩. কাঠামোগত পরিবর্তন (Bertelsmann): ১৬ স্কোর নির্দেশ করছে যে, আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার এখনো কাগুজে কলমেই সীমাবদ্ধ।
৪. ব্যবসায়িক ঝুঁকি (Global Insight): ২২ স্কোর বলছে, রপ্তানি-আমদানি ও কাস্টমস বিভাগে দুর্নীতি এখনো সাধারণ বিষয়।
৫. রাজনৈতিক দুর্নীতি (PRS Group): ২৪ স্কোর প্রমাণ করে যে, রাজনীতি ও অর্থ এখনো একে অপরের পরিপূরক হয়ে আছে।
৬. প্রশাসনিক দক্ষতা (World Bank): ২৮ স্কোর ইঙ্গিত দেয় যে, সরকারি দপ্তরের সেবা পেতে জনগণকে এখনো ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
৭. গণতান্ত্রিক স্পেস (V-Dem): ৩৪ স্কোর কিছুটা ইতিবাচক, যা ইঙ্গিত দেয় যে মানুষ এখন দুর্নীতি নিয়ে কথা বলতে পারছে, যদিও তা পর্যাপ্ত নয়।
৮. নির্বাহী মতামত (WEF): ৩১ স্কোর বলছে বেসরকারি খাতের ডিজিটালাইজেশন কিছুটা হলেও স্বচ্ছতা এনেছে।


৯। করণীয়: এখন থেকেই যা করা প্রয়োজন
দলগুলো যখন ইশতেহার সাজাচ্ছে, তখন কেবল ‘দুর্নীতিমুক্ত দেশ’ গড়ার স্লোগান দিলেই চলবে না। এই ৮টি সূচকের মান বাড়াতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে:
  • দুদকের পূর্ণ স্বাধীনতা: দুর্নীতি দমন কমিশনকে সরকারি প্রভাবমুক্ত করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মতো শক্তিশালী করতে হবে।
  • সম্পদ বিবরণী প্রকাশ: প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি—সবার সম্পদের হিসাব প্রতি বছর অনলাইনে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা: যারা দুর্নীতির তথ্য ফাঁস করবেন, তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে এবং তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ডিজিটাল ইকোসিস্টেম: ভূমি অফিস, পাসপোর্ট, কাস্টমস ও টেন্ডার প্রক্রিয়া শতভাগ পেপারলেস ও মানুষের স্পর্শমুক্ত করতে হবে।
  • বিচারের সংস্কৃতি: দুর্নীতিবাজদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বয়কট করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।


১০। উপসংহার
১ পয়েন্টের উন্নতি (২৩ থেকে ২৪) আশাব্যঞ্জক হতে পারে, কিন্তু তা সন্তুষ্টির কারণ নয়। দলগুলোর ইশতেহারে যদি এই ৮টি বৈশ্বিক সূচক উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ না থাকে, তবে দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি আবারো কেবল নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার কৌশল হিসেবেই থেকে যাবে। জনগণের দাবি এখন একটাই— প্রতিশ্রুতি নয়, এবার চাই কাঠামোগত স্বচ্ছতা।

রেফারেন্সঃ
১) ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশন্যাল বাংলাদেশ (টি আই বি) এর দলিলাদি 
২) এ আই।  
Previous
Previous

বাংলাদেশের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির বিবর্তন (১৯৭৩–২০২৪) (৫)

Next
Next

জাতীয় নেতৃত্বের বক্তব্য মূল্যায়নের ০৮ চলক (৩)