জননিরাপত্তা ও আইনের শাসনঃ নাগরিকের প্রধান দাবী (১)

ডিপ্যাক (DPAC)

একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সার্থকতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা প্রায়ই 'কল্যাণ রাষ্ট্র' (Welfare State) এবং 'আইনের শাসন'কে (Rule of Law) আলাদা করে দেখি। কিন্তু গভীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, এই দুটি বিষয় আসলে একটি অবিচ্ছেদ্য ধারাক্রম। কল্যাণের প্রথম এবং প্রধান শর্তই হলো নিরাপত্তা ও আইনের শাসন। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেখানে সরাসরি অর্থ সাহায্য বা অন্য যেকোনো জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো নাগরিকের জন্য একটি নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিত করা; কারণ নাগরিকরা তাদের মেধা ও শ্রম দিয়ে নিজেদের জীবনের সংস্থান নিজেরাই করতে সক্ষম, যদি রাষ্ট্র তাদের নির্ভয়ে কাজ করার পরিবেশ দেয়।


দর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আদি ধারণা অনুযায়ী, রাষ্ট্রের প্রাথমিক রূপ ছিল 'নিশাচর প্রহরী' (Night-watchman state)। অর্থাৎ, রাষ্ট্র রাতে এবং দিনে নাগরিকদের পাহারা দেবে যাতে তারা শান্তিতে ঘুমাতে পারে এবং কাজ করতে পারে। থমাস হবস ও জন লকের সামাজিক চুক্তির মূল নির্যাস এটাই—

মানুষ তাদের অধিকারের একটি অংশ রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়েছে কেবল এই গ্যারান্টি পেতে যে, তাদের জীবন ও সম্পত্তি নিরাপদ থাকবে।

সমাজতত্ত্বের ভাষায়,

রাষ্ট্র যখন নিরাপত্তা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে, তখন সেটি আসলে নাগরিকদের জন্য 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' বা সমান সুযোগের ক্ষেত্র তৈরি করে। মানুষ জন্মগতভাবেই উদ্যমী; রাষ্ট্র যদি কেবল অন্যায়কে রুখে দেয় এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে, তবে ব্যক্তি তার সৃজনশীলতা খাটিয়ে নিজের রুটি-রুজির ব্যবস্থা নিজেই করে নেয়।




ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার দর্শন

ইসলামি রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও এই তত্ত্বের জোরালো সমর্থন পাওয়া যায়। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে সুশাসনের মূল ভিত্তিই ছিল সাম্য ও কঠোর আইনের শাসন। ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ও আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের পথপ্রদর্শক ইবনে খালদুন তাঁর 'মুকাদ্দীমা' গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে,

“রাষ্ট্রের টিকে থাকা নির্ভর করে 'আসাবিয়্যাহ' বা সামাজিক সংহতির ওপর, যা কেবল ন্যায়বিচারের মাধ্যমেই সম্ভব। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ না করে কেবল তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তখন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আপনাআপনি চলে আসে

ইবনে খালদুন মনে করতেন,

রাষ্ট্র যখন করের বোঝা বাড়িয়ে বা আইনের শাসন শিথিল করে জুলুমের পথ বেছে নেয়, তখনই সভ্যতার পতন ঘটে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হলো জুলুম ঠেকানো বা নিরাপত্তা দেওয়া; মানুষ তখন নিজের প্রচেষ্টায় রিজিকের সন্ধান করতে পারে।




সামাজিক বাস্তবতা ও উপসংহার

বাস্তবতা হলো, একজন কর্মক্ষম মানুষ রাষ্ট্রের কাছে দয়া বা অনুদান চায় না, সে চায় একটি নির্ভয় কর্মপরিবেশ। রাষ্ট্র যদি অন্নদাতার ভূমিকা নিতে গিয়ে আইনের শাসন ও নিরাপত্তার দায়িত্বে অবহেলা করে, তবে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির সৃষ্টি হয়, যা শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিকেই পঙ্গু করে দেয়। পক্ষান্তরে, রাষ্ট্র যদি একটি কাঠামোগত নিরাপত্তা দিতে পারে, তবে সাধারণ নাগরিকরা তাদের নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে তোলে। সুতরাং, আইনের শাসনই হলো জনকল্যাণের প্রথম সোপান

রাষ্ট্র যখন সফলভাবে নিরাপত্তার ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, তখনই নাগরিকের শ্রমে সমাজ ও অর্থনীতি সত্যিকারের উন্নতির দেখা পায়




Previous
Previous

রাজনীতিবিদদের বিমূর্ত প্রতিশ্রুতি বনাম তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা (২)