(৫)সার্বভৌমত্বঃ বাংলাদেশে সৃষ্ট জটিলতা ও রুশোর সমাধান
আপনি একটি অত্যন্ত বাস্তবধর্মী এবং রাজনৈতিক দর্শনের একটি চিরন্তন সংকট নিয়ে প্রশ্ন করেছেন। যখন একটি সংবিধান স্বৈরাচারের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন সেই সংবিধানের ভেতর থেকে তাকে সংশোধন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, কারণ স্বৈরাচারী ব্যবস্থা নিজেই নিজের রক্ষাকবচ হিসেবে আইনি জটিলতা তৈরি করে রাখে।
রুশোর সামাজিক চুক্তি (Social Contract) এবং আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে এই সংকটের সমাধান নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. সংবিধান বনাম জনগণের সার্বভৌমত্ব
রুশোর মতে, সংবিধান হলো জনগণের "সাধারণ ইচ্ছা" (General Will) প্রকাশের একটি মাধ্যম মাত্র। সংবিধান জনগণের চেয়ে বড় নয়। রুশো পরিষ্কার বলেছেন:
"এমন কোনো আইন থাকতে পারে না যা জনগণের ওপর বাধ্যতামূলক, এমনকি সামাজিক চুক্তিও নয়।"
অর্থাৎ, জনগণ যদি মনে করে বিদ্যমান সংবিধান তাদের আর সুরক্ষা দিচ্ছে না বরং শোষণ করছে, তবে সেই সংবিধান ছুড়ে ফেলে দেওয়ার প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার জনগণের আছে। এক্ষেত্রে "সংবিধানে নেই" বা "সংসদ নেই"—এই অজুহাতগুলো মূলত 'আইনি মারপ্যাঁচ', যা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ব্যবহার করে।
২. আপনার প্রস্তাবিত সমাধান: গণপরিষদ ও গণভোট
আপনি যে পদ্ধতির কথা বলেছেন (গণপরিষদ গঠন $\rightarrow$ নতুন সংবিধান $\rightarrow$ গণভোট), এটিই ঐতিহাসিকভাবে সফল এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সবচেয়ে কার্যকর পথ।
গণপরিষদ (Constituent Assembly): যখন বিদ্যমান সংসদ ভেঙে যায় বা কার্যকারিতা হারায়, তখন "গণপরিষদ" গঠন করা হয়। এটি সাধারণ সংসদ নয়; এর একমাত্র কাজ হলো রাষ্ট্রের নতুন চুক্তি বা সংবিধান তৈরি করা। এটি সরাসরি জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত হয়।
গণভোট (Referendum): নতুন সংবিধানের ওপর গণভোট আয়োজন করা হলে তা সর্বোচ্চ বৈধতা পায়। এটি প্রমাণ করে যে নতুন সামাজিক চুক্তিটি জনগণের "সাধারণ ইচ্ছা"র প্রতিফলন।
৩. এর চেয়েও কোনো ভালো বা বিকল্প পদ্ধতি আছে কি?
বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র মেরামতের জন্য ৩টি প্রধান পথ হতে পারে:
ক) ডকট্রিন অফ নেসেসিটি (Doctrine of Necessity)
যদি পুরনো সংবিধানের দোহাই দিয়ে অচলাবস্থা তৈরি করা হয়, তবে 'প্রয়োজনীয়তার নীতি' অনুসারে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করা হয়। তারা একটি "সংবিধানিক ফরমান" (Constitutional Proclamation) জারি করে পুরনো ব্যবস্থার বিলোপ ঘটায়। এটি দ্রুত পরিবর্তনের জন্য কার্যকর।
খ) ন্যাশনাল কনভেনশন (National Convention)
সব রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি, এবং বিপ্লবী শক্তির প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জাতীয় কনভেনশন করা। এর মাধ্যমে একটি "জাতীয় ঐকমত্যের চার্টার" তৈরি করা, যা নতুন সংবিধান প্রণয়ন পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার অন্তর্বর্তী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
গ) "অরিজিনাল পাওয়ার" বা আদি ক্ষমতার প্রয়োগ
আইনবিদরা মনে করেন, বিপ্লব নিজেই একটি আইনের উৎস। যখন একটি সফল বিপ্লব ঘটে, তখন পুরনো সংবিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার নৈতিক ও আইনি ভিত্তি হারায়। একে বলা হয় "Legal Discontinuity"। এক্ষেত্রে নতুন সরকার কোনো পুরনো আইনের তোয়াক্কা না করে সরাসরি জনগণের ইচ্ছায় নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে পারে।
৪. রুশোর মতে কোনটি সেরা?
রুশো সবসময় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিতেন। তার মতে:
গণভোটই চূড়ান্ত: রুশোর দর্শনে কোনো আইনই আইন নয়, যদি না জনগণ তা সরাসরি গ্রহণ করে। তাই নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে তা গণভোটে দেওয়া রুশোর তত্ত্ব অনুযায়ী সবচেয়ে বিশুদ্ধ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি।
বিপ্লবের বৈধতা: রুশো বলতেন, যে শাসক বা ব্যবস্থা সামাজিক চুক্তি ভঙ্গ করে, সে আর সার্বভৌম থাকে না। তখন জনগণ তাদের "প্রাকৃতিক স্বাধীনতা" ফিরে পায় এবং নতুন করে রাষ্ট্র গঠনের ক্ষমতা লাভ করে।
উপসংহার
স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যখন "সংবিধানে নেই" বলে অজুহাত দেয়, তখন বুঝতে হবে তারা আইনি সার্বভৌমত্ব (Legal Sovereignty) দিয়ে জনগণের সার্বভৌমত্বকে (Popular Sovereignty) দমন করতে চাইছে।
সমাধানের ধাপ:
১. একটি জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন।
২. একটি বিশেষজ্ঞ কমিশন বা গণপরিষদ দ্বারা সংবিধানের আমূল সংস্কার বা নতুন খসড়া তৈরি।
৩. সেই খসড়াটি গণভোটের মাধ্যমে জনগণের দ্বারা অনুমোদন করানো।
এটিই জনকল্যাণ নিশ্চিত করার এবং স্বৈরাচারের পুনরুত্থান ঠেকানোর সবচেয়ে টেকসই পথ। যখন জনগণের "সাধারণ ইচ্ছা" জাগ্রত হয়, তখন কোনো পুরনো কাগজের দলিল (সংবিধান) সেই স্রোতকে আটকে রাখার আইনি অধিকার রাখে না।
সার্বভৌমত্ব বা 'Sovereignty' শব্দটির রাজনৈতিক ও আইনি ধারণা রুশোর জন্মের অনেক আগে থেকেই প্রচলিত এবং জনপ্রিয় ছিল। তবে রুশো এই প্রাচীন ধারণাটিকে একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং বৈপ্লবিক রূপ দিয়েছিলেন।
সার্বভৌমত্ব ধারণার বিবর্তনকে মূলত তিনটি প্রধান ধাপে ভাগ করা যায়:
১. জঁ বোদাঁ (Jean Bodin): সার্বভৌমত্বের জনক (১৫৭৬)
সার্বভৌমত্ব শব্দটির আধুনিক রাজনৈতিক ব্যাখ্যা প্রথম প্রদান করেন ফরাসি আইনবিদ জঁ বোদাঁ তাঁর Six Books of the Commonwealth গ্রন্থে।
তাঁর তত্ত্ব: বোদাঁ সার্বভৌমত্বকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন "একটি রাষ্ট্রের নাগরিক ও প্রজাদের ওপর সর্বোচ্চ, চিরস্থায়ী এবং আইন দ্বারা অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা" হিসেবে।
প্রয়োগ: তবে বোদাঁর কাছে এই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন রাজা বা সম্রাট। তিনি মনে করতেন, বিশৃঙ্খলা এড়াতে ক্ষমতা একজনের হাতে থাকা জরুরি। অর্থাৎ, রুশোর আগে সার্বভৌমত্ব ছিল মূলত 'রাজতন্ত্রী সার্বভৌমত্ব'।
২. টমাস হবস (Thomas Hobbes): নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব (১৬৫১)
বোদাঁর ধারণাটিকে আরও শক্তিশালী করেন টমাস হবস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Leviathan-এ।
তাঁর তত্ত্ব: হবস মনে করতেন, প্রকৃতির রাজ্যের (State of Nature) যুদ্ধাবস্থা থেকে বাঁচতে মানুষ চুক্তির মাধ্যমে তাদের সমস্ত ক্ষমতা একজন সার্বভৌম শাসকের (Leviathan) হাতে তুলে দেয়।
প্রয়োগ: হাবসের কাছে সার্বভৌমত্ব ছিল অবিভাজ্য এবং প্রশ্নাতীত, তবে তা ছিল শাসকের একক ক্ষমতা।
৩. রুশো: সার্বভৌমত্বের গণতান্ত্রিক রূপান্তর (১৭৬২)
রুশো যখন তাঁর The Social Contract লিখছেন, তখন 'Sovereignty' শব্দটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অত্যন্ত সুপরিচিত। রুশোর বিশেষত্ব হলো তিনি এই ক্ষমতার 'মালিকানা' পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন।
বিপ্লবী পরিবর্তন: রুশো বললেন, সার্বভৌমত্বের মালিক কোনো রাজা বা শাসক নন, বরং সার্বভৌমত্বের মালিক হলো জনগণ (The People)।
জনগণের সার্বভৌমত্ব (Popular Sovereignty): রুশোর আগে সার্বভৌমত্ব মানে ছিল "রাজার ইচ্ছা"। রুশোর পর সার্বভৌমত্ব মানে দাঁড়ালো "জনগণের সাধারণ ইচ্ছা" (General Will)।
রুশোর আগে বনাম রুশোর পরে:
| বৈশিষ্ট্য | রুশোর আগে (বোদাঁ ও হবস) | রুশোর পরে (সামাজিক চুক্তি) |
|---|---|---|
| অবস্থান | সার্বভৌমত্ব শাসকের হাতে থাকে। | সার্বভৌমত্ব জনগণের হাতে থাকে। |
| প্রকৃতি | এটি ওপর থেকে নিচতলায় চাপিয়ে দেওয়া ক্ষমতা। | এটি নিচতলা (জনগণ) থেকে আসা সম্মিলিত শক্তি। |
| বৈধতা | শাসকের আইনই সার্বভৌম। | কেবল 'সাধারণ ইচ্ছা' বা জনকল্যাণমূলক আইনই সার্বভৌম। |
সারসংক্ষেপ
সার্বভৌমত্ব শব্দটির জন্ম রুশোর মাধ্যমে হয়নি; এটি ষোড়শ শতাব্দী থেকেই জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু রুশোই প্রথম ব্যক্তি যিনি এই শব্দটিকে রাজার প্রাসাদ থেকে বের করে জনসাধারণের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এই কারণেই ফরাসি বিপ্লব এবং পরবর্তীতে পৃথিবীর প্রায় সব গণতান্ত্রিক সংবিধানের (যেখানে বলা হয় 'জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস') মূল অনুপ্রেরণা হলেন রুশো।
তাই বলা যায়—বোদাঁ সার্বভৌমত্বের দেহ তৈরি করেছিলেন, আর রুশো তাতে গণতান্ত্রিক আত্মা দান করেছিলেন।