এলিট (ডিপস্টেট) পরিচিতি (১৬)
একটি সমাজের 'এলিট' হিসেবে কারা বিবেচিত হবেন, তা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। তবে মূলগতভাবে, যারা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অবস্থানে থাকেন এবং সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখেন, তারাই এলিট।
বিভিন্ন প্রখ্যাত লেখকের মতামতের ভিত্তিতে এলিটদের একটি বিস্তারিত তালিকা ও ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
১. ভিলফ্রেডো প্যারেটো (Vilfredo Pareto): মনস্তাত্ত্বিক এলিট
প্যারেটোর মতে, এলিট তারা যারা তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে (সেটি রাজনীতি হোক বা চুরি) সর্বোচ্চ দক্ষতা বা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন। তিনি এলিটদের দুটি ভাগে ভাগ করেছেন:
গভর্নিং এলিট (Governing Elite): যারা সরাসরি শাসনকার্যে যুক্ত।
নন-গভর্নিং এলিট (Non-governing Elite): যারা সরাসরি ক্ষমতায় নেই কিন্তু সমাজে ব্যাপক প্রভাবশালী (যেমন: বড় বুদ্ধিজীবী বা শিল্পী)।
রেফারেন্স:The Mind and Society (১৯৩৫)।
২. গেতানো মোসকা (Gaetano Mosca): রাজনৈতিক এলিট
মোসকার মতে, এলিট হলো একটি 'সংগঠিত সংখ্যালঘু' (Organized Minority)। তিনি মনে করেন, এলিট হওয়ার প্রধান যোগ্যতা হলো সাংগঠনিক দক্ষতা।
কারা অন্তর্ভুক্ত: সামরিক বাহিনী, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং আমলাতন্ত্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তার মতে, সাধারণ জনতা অসংগঠিত বলে এই সংগঠিত ক্ষুদ্র গোষ্ঠীটি তাদের ওপর শাসন চালায়।
রেফারেন্স:The Ruling Class (১৮৯৬)।
৩. সি. রাইট মিলস (C. Wright Mills): পাওয়ার এলিট (Power Elite)
মিলস আধুনিক আমেরিকার প্রেক্ষাপটে এলিটদের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এলিটরা কেবল ব্যক্তির গুণ নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিক পদের ফল। তার তালিকায় তিনটি গোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত:
কর্পোরেট রিচ: বড় বড় কোম্পানির সিইও এবং মালিকরা।
পলিটিক্যাল ডিরেক্টরেট: রাষ্ট্রের শীর্ষ নীতিনির্ধারক রাজনীতিবিদ।
ওয়ারলর্ডস: সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ জেনারেলরা।
রেফারেন্স:The Power Elite (১৯৫৬)।
৪. রবার্ট মিশেলস (Robert Michels): সাংগঠনিক এলিট
মিশেলসের মতে, যেকোনো বড় সংগঠন (যেমন রাজনৈতিক দল) শেষ পর্যন্ত একটি ক্ষুদ্র নেতৃত্বের হাতে চলে যায়। একে তিনি 'Iron Law of Oligarchy' বা 'গোষ্ঠীতন্ত্রের লৌহবিধি' বলেছেন।
কারা অন্তর্ভুক্ত: রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা এবং দক্ষ সংগঠকবৃন্দ।
রেফারেন্স:Political Parties (১৯১১)।
৫. থমাস আর. ডাই (Thomas R. Dye): জননীতি নির্ধারণী এলিট
ডাই-এর মতে, এলিটরা হলো তারা যাদের পছন্দ বা 'প্রেফারেন্স' জননীতিতে প্রতিফলিত হয়।
কারা অন্তর্ভুক্ত: থিংক-ট্যাঙ্ক, বড় ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি, মিডিয়া মুঘল এবং উচ্চপদস্থ আমলা। তার মতে, এরা পর্দার আড়ালে থেকে এজেন্ডা সেট করে দেয়।
রেফারেন্স:Understanding Public Policy (১৯৭২)।
এলিট কারা: তত্ত্ব-ভিত্তিক তুলনামূলক ছক
| তাত্ত্বিক | তত্ত্বের নাম | এলিট হিসেবে যারা অন্তর্ভুক্ত | ক্ষমতার উৎস / মূল ভিত্তি |
|---|---|---|---|
| ভিলফ্রেডো প্যারেটো | Circulation of Elites | ১. গভর্নিং এলিট: শাসক গোষ্ঠী। ২. নন-গভর্নিং এলিট: সফল শিল্পী, বুদ্ধিজীবী। |
ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও মনস্তত্ত্ব: যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সেরা (লায়ন ও ফক্স চরিত্র)। |
| গেতানো মোসকা | The Ruling Class | ১। উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা, ২। ধর্মীয় নেতা এবং ৩। দক্ষ আমলা। | সাংগঠনিক শক্তি: অসংগঠিত জনতার ওপর শাসন করার মতো শক্তিশালী সংগঠন। |
| সি. রাইট মিলস | Power Elite | ১. কর্পোরেট রিচ: সিইও/মালিক। ২. ওয়ারলর্ডস: জেনারেল। ৩. পলিটিক্যাল ডিরেক্টরেট: শীর্ষ নেতা। |
প্রাতিষ্ঠানিক পদ: বড় বড় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে আসীন হওয়া। |
| রবার্ট মিশেলস | Iron Law of Oligarchy | ১। রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং ২। দক্ষ দলীয় সংগঠক। | অপরিহার্যতা: বড় সংগঠন চালাতে গেলে ক্ষুদ্র নেতৃত্বের শাসন অনিবার্য হয়ে পড়ে। |
| থমাস আর. ডাই | Policy/Institutional Elite | ১। থিংক-ট্যাঙ্ক বিশেষজ্ঞ, ২। মিডিয়া মালিক, ৩। ফাউন্ডেশন প্রধান এবং ৪। উচ্চপদস্থ আমলা। | পলিসি কন্ট্রোল: যারা পর্দার আড়ালে থেকে সরকারের এজেন্ডা ও নীতি ঠিক করে দেয়। |
সারাংশ: আধুনিক সমাজে এলিট কারা?
উপরোক্ত তাত্ত্বিকদের আলোচনার ভিত্তিতে বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি সমাজের এলিটদের নিম্নোক্ত শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:
রাজনৈতিক এলিট: সরকার প্রধান, মন্ত্রী এবং প্রভাবশালী সংসদ সদস্য।
প্রশাসনিক ও সামরিক এলিট: আমলাতন্ত্রের শীর্ষ কর্মকর্তা (সচিব বা জেনারেল)।
অর্থনৈতিক এলিট: বড় শিল্পপতি, ব্যাংকার এবং ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রধান।
বুদ্ধিবৃত্তিক ও মিডিয়া এলিট: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা অধ্যাপক, থিংক-ট্যাঙ্ক বিশেষজ্ঞ এবং প্রধান মিডিয়া হাউসের সম্পাদক।
সামাজিক এলিট: বংশগত আভিজাত্য বা ধর্মীয় উচ্চস্থানে আসীন ব্যক্তিরা।
সারসংক্ষেপ: বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য
ব্যক্তি বনাম পদ: প্যারেটো এবং মোসকা মনে করতেন এলিট হওয়ার জন্য ব্যক্তিগত গুণ বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রধান। অন্যদিকে, মিলস এবং ডাই মনে করেন, আধুনিক সমাজে এলিট হওয়া নির্ভর করে একজন ব্যক্তি কোন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে আছেন তার ওপর।
প্রকাশ্য বনাম নেপথ্য: রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা সাধারণত প্রকাশ্যে থাকা শাসকদের এলিট বলেন, কিন্তু থমাস ডাই-এর মতো পলিসি বিশ্লেষকরা মনে করেন আসল এলিটরা অনেক সময় পর্দার আড়ালে (যেমন: থিংক-ট্যাঙ্ক বা বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী) অবস্থান করেন।
থমাস আর. ডাই তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "Understanding Public Policy"-তে এলিটদের একটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং বাস্তবসম্মত সংজ্ঞা দিয়েছেন। তাঁর মতে, এলিটরা হলো সমাজের সেই ক্ষুদ্র গোষ্ঠী যারা সম্পদ, ক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং যাদের পছন্দ বা মূল্যবোধই শেষ পর্যন্ত 'জননীতি' হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ডাই-এর মতে এলিট হওয়ার মূল শর্ত হলো বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের (Institution) শীর্ষ পদে থাকা। অর্থাৎ, তাঁর কাছে এলিট মানে কেবল ধনী ব্যক্তি নয়, বরং সেই ব্যক্তি যার হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা আছে।
নিচে তাঁর বইয়ের নির্দিষ্ট অধ্যায় এবং বিষয়বস্তু অনুযায়ী আলোচনা দেওয়া হলো (পৃষ্ঠা নম্বর মূলত ১৫তম আন্তর্জাতিক সংস্করণ বা তার কাছাকাছি সংস্করণের ভিত্তিতে দেওয়া):
১. এলিটদের পরিচয় ও সংজ্ঞা (অধ্যায় ২: Models of Politics)
ডাই এই অধ্যায়ের "Elite Theory" অংশে এলিটদের পরিচয় বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
আলোচ্য বিষয়: তিনি এখানে দেখিয়েছেন যে নীতি ওপর থেকে নিচে (Top-down) প্রবাহিত হয়। এলিটরা মূলত সমাজের উচ্চবিত্ত অংশ থেকে আসে যারা সাধারণ মানুষের (Mass) চেয়ে বেশি তথ্য ও ক্ষমতার অধিকারী।
কারা অন্তর্ভুক্ত: ডাই এখানে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সিইও এবং সম্পদশালী ব্যক্তিদের এলিট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
পৃষ্ঠা নম্বর: পৃষ্ঠা ২০ থেকে ২৩ (সংস্করণ ভেদে ১-২ পৃষ্ঠা এদিক ওদিক হতে পারে)।
২. এজেন্ডা সেটিং ও নেপথ্যের এলিট (অধ্যায় ৩: The Policy-making Process)
এই অধ্যায়ে ডাই আলোচনা করেছেন যে কীভাবে কিছু বিশেষ গোষ্ঠী বা ব্যক্তি সরকারের এজেন্ডা নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে তিনি "Proximate Policy Makers" এবং নেপথ্যের এলিটদের কথা বলেছেন।
কারা অন্তর্ভুক্ত:
থিংক-ট্যাঙ্ক (Think Tanks): যেমন- ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন বা কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস।
ফাউন্ডেশন প্রধান: যেমন- ফোর্ড ফাউন্ডেশন বা রকফেলার ফাউন্ডেশনের শীর্ষ ব্যক্তি।
মিডিয়া মুঘল: বড় মিডিয়া হাউসের মালিক ও সম্পাদকগণ।
পৃষ্ঠা নম্বর: পৃষ্ঠা ৩৮ থেকে ৫৪ (বিশেষ করে ৫২-৫৩ পৃষ্ঠায় থিংক-ট্যাঙ্ক এলিটদের কথা বলা হয়েছে)।
৩. আমলাতান্ত্রিক এলিট (অধ্যায় ৩-এর শেষাংশ ও বাস্তবায়ন অংশ)
ডাই এখানে দেখিয়েছেন যে নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের চেয়েও অনেক সময় স্থায়ী আমলারা বেশি শক্তিশালী এলিট হিসেবে আবির্ভূত হন।
কারা অন্তর্ভুক্ত: সরকারের উচ্চপদস্থ সিভিল সার্ভেন্ট বা আমলা (Bureaucrats)। ডাই-এর মতে, এরাই মূলত নীতিকে রূপদান করেন।
পৃষ্ঠা নম্বর: পৃষ্ঠা ৫৬ থেকে ৬০।
ডাই-এর এলিটদের প্রধান বৈশিষ্ট্য (সারাংশ)
ডাই তাঁর বইয়ের বিভিন্ন অংশে এলিটদের যে বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরেছেন, তা হলো:
ক্ষুদ্র গোষ্ঠী: এরা সংখ্যার দিক দিয়ে অত্যন্ত কম কিন্তু ক্ষমতার দিক দিয়ে অসীম।
উচ্চবিত্ত পটভূমি: এরা সাধারণত সমাজের সচ্ছল এবং শিক্ষিত পরিবার থেকে আসে।
ঐক্যবদ্ধ মূল্যবোধ: এলিটদের মধ্যে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় একটি চমৎকার ঐক্য থাকে।
ধীর পরিবর্তন (Incrementalism): তারা হঠাৎ বড় পরিবর্তন চায় না, বরং ধীরে ধীরে পরিবর্তনের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: থমাস ডাই-এর এই বইটির পাশাপাশি তাঁর অন্য একটি বিখ্যাত বই "Who’s Running America?"-তে তিনি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নাম ধরে ধরে আমেরিকার ৫০০০-৭০০০ জন এলিটের তালিকা প্রকাশ করেছিলেন। তবে আপনার প্রয়োজনীয় "Understanding Public Policy" বইতে তিনি মূলত এলিটদের প্রাতিষ্ঠানিক পদমর্যাদাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।