‘সংসদীয় স্থায়ী কমিটি’- জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রকাশের মাধ্যম (২৩)
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ পরিচালনার একটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। মূলত সংসদের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং মন্ত্রণালয়ের তদারকি এই কমিটিগুলোর মাধ্যমেই সম্পাদিত হয়।
নিচে কমিটিগুলোর সংখ্যা, গঠন ও কার্যপ্রণালীর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
১. সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সংখ্যা
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি (Rules of Procedure) অনুযায়ী স্থায়ী কমিটি মূলত তিন ধরনের এবং বর্তমানে সব মিলিয়ে প্রায় ৫০টি স্থায়ী কমিটি রয়েছে:
মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি (৩৯টি): প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি করে কমিটি থাকে (যেমন: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি)।
সংসদ বিষয়ক স্থায়ী কমিটি (১১টি): সংসদের অভ্যন্তরীণ কাজ পরিচালনার জন্য (যেমন: সরকারি হিসাব কমিটি, বিশেষাধিকার কমিটি)।
২. কমিটির গঠন (Composition)
স্থায়ী কমিটিগুলো সংসদের শুরুতেই গঠিত হয়। এদের গঠন কাঠামো নিম্নরূপ:
সদস্য সংখ্যা: সাধারণত প্রতিটি কমিটি ১০ জন সংসদ সদস্য নিয়ে গঠিত হয়।
নির্বাচন: সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে সংসদের ভোটে (সাধারণত সিলেকশন কমিটির মাধ্যমে) এই সদস্যরা নির্বাচিত হন।
সভাপতি: সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে একজন কমিটির সভাপতি (Chairperson) নির্বাচিত হন।
মন্ত্রীর সীমাবদ্ধতা: মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি কোনো মন্ত্রী হতে পারবেন না। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ওই কমিটির সদস্য হিসেবে থাকেন।
রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব: সংসদে বিভিন্ন দলের আসন সংখ্যার আনুপাতিক হারে কমিটিতে সদস্যপদ বণ্টন করা হয়।
৩. কার্যপ্রণালী ও ক্ষমতা (Functions and Powers)
কমিটিগুলো মূলত মন্ত্রণালয়ের ওপর 'চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স' বা নজরদারির কাজ করে।
ক. বিল স্ক্রুটিনি (Bill Scrutiny):
সংসদে কোনো আইন বা 'বিল' উত্থাপন করার পর তা বিস্তারিত পরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটি বিলের প্রতিটি ধারা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনে সংশোধনী বা পরিবর্তনের সুপারিশসহ সংসদে রিপোর্ট পেশ করে।
খ. প্রশাসনিক তদারকি (Administrative Oversight):
মন্ত্রণালয়ের কোনো কাজে অনিয়ম, দুর্নীতি বা গাফিলতি আছে কি না, তা কমিটি পরীক্ষা করে। কমিটি যেকোনো সরকারি কর্মকর্তাকে তলব করতে পারে এবং কোনো নথিপত্র বা ফাইল তলব করার আইনি ক্ষমতা রাখে।
গ. আর্থিক তদারকি (Financial Oversight):
সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কি না তা যাচাই করা। বিশেষ করে সরকারি হিসাব কমিটি (Public Accounts Committee) অডিট রিপোর্টের ভিত্তিতে অনিয়ম শনাক্ত করে।
ঘ. সুপারিশ প্রদান:
মন্ত্রণালয়ের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কমিটি বিভিন্ন সুপারিশ করে। যদিও এই সুপারিশগুলো সরাসরি আইনিভাবে বাধ্যতামূলক নয়, তবে সংসদীয় প্রথা অনুযায়ী সরকার এগুলো আমলে নিতে বাধ্য থাকে।
৪. গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থায়ী কমিটির তালিকা
কমিটির নামমূল দায়িত্ববিশেষ ক্ষমতাসরকারি হিসাব কমিটি (PAC)অডিট রিপোর্ট ও অর্থের অপচয় রোধ।সবচেয়ে শক্তিশালী আর্থিক কমিটি।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিআইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা তদারকি।অপরাধ দমনে পুলিশকে জবাবদিহি করা।সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটিওয়াসা, বিদ্যুৎ বা রেলওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের লাভ-ক্ষতি দেখা।দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা তদন্ত।বিশেষাধিকার কমিটিসংসদ সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে বিচার করা।সংসদের অভ্যন্তরীণ বিচারিক ক্ষমতা।
একজন এমপির জন্য কমিটির গুরুত্ব:
একজন এমপি যদি মন্ত্রণালয়ের কোনো কমিটিতে থাকেন, তবে তিনি সরাসরি ওই মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারেন। যেমন—আপনি যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য হন, তবে আপনার এলাকার স্কুল-কলেজ সরকারি করার বা মান উন্নয়নের দাবিটি আপনি অত্যন্ত জোরালোভাবে সরাসরি সচিব বা মন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করতে পারবেন।
-
জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি (Rules of Procedure) অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে ৫০টি স্থায়ী কমিটি কার্যকর রয়েছে। এই কমিটিগুলোকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।
নিচে সবকটি কমিটির তালিকা ক্যাটাগরি অনুসারে দেওয়া হলো:
১. সংসদ বিষয়ক স্থায়ী কমিটি (১১টি)
এই কমিটিগুলো সরাসরি সংসদীয় কার্যক্রম, শৃংখলা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।
কার্য-উপদেষ্টা কমিটি: সংসদের অধিবেশনের সময়সূচি ও কার্যসূচি নির্ধারণ।
কার্যপ্রণালী-বিধি কমিটি: সংসদের নিয়ম-কানুন সংশোধন বা পর্যালোচনা।
বিশেষাধিকার কমিটি: সংসদ সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে তা বিচার করা।
সরকারি হিসাব কমিটি (PAC): অডিট রিপোর্ট এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার তদারকি।
সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি: রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের (যেমন: ওয়াসা, ডেসকো) লাভ-ক্ষতি ও দুর্নীতি তদারকি।
সরকারি আশ্বাস কমিটি: সংসদে প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না তা দেখা।
বেসরকারি সদস্য বিল ও প্রস্তাব সম্পর্কিত কমিটি: যারা মন্ত্রী নন, এমন সদস্যদের বিল পর্যালোচনা।
লাইব্রেরি কমিটি: সংসদ লাইব্রেরির ব্যবস্থাপনা।
পিটিশন কমিটি: জনগণের দেওয়া কোনো বিশেষ আবেদন বা পিটিশন পর্যালোচনা।
হাউজ কমিটি: সংসদ সদস্যদের আবাসন ও সুযোগ-সুবিধা তদারকি।
সংসদীয় তদন্ত কমিটি: বিশেষ কোনো অভিযোগ তদন্তের জন্য গঠিত।
২. মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি (৩৯টি)
প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কাজের তদারকি এবং বাজেট ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই কমিটিগুলো কাজ করে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি
এমপির জন্য এই তালিকার গুরুত্ব:
একজন এমপি হিসেবে আপনি কোন কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হতে চান, তা আপনার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাওয়ারফুল কমিটি: স্বরাষ্ট্র, অর্থ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিগুলো অত্যন্ত প্রভাবশালী।
আর্থিক তদারকি: সরকারি হিসাব কমিটি (PAC) সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ কারণ এটি সরাসরি দুর্নীতি শনাক্ত করার ক্ষমতা রাখে।
এলাকার স্বার্থ: আপনার এলাকায় যদি কৃষি বেশি হয়, তবে কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিতে থাকা আপনার জন্য বেশি ফলপ্রসূ।
রেফারেন্সঃ
১) জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি (Rules of Procedure) - সাইট ভিজিট
২) জাতীয় সংসদ সচিবালয় আইন - সাইট ভিজিট