একজন এমপির দায়িত্ব ও কার্যাবলী (২২)

বাংলাদেশের সংবিধান এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য বা এমপির ভূমিকা প্রধানত জাতীয় পর্যায়ের। তবে স্থানীয় সরকার ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সাথে তাঁদের সম্পৃক্ততার বিষয়েও নির্দিষ্ট কিছু আইন ও নীতিমালা রয়েছে।

নিচে রেফারেন্সসহ এমপিদের প্রধান কাজগুলোর তালিকা দেওয়া হলো:

১. আইন প্রণয়ন (Legislative Functions)

এটি একজন এমপির প্রধানতম কাজ।

  • বিবরণ: নতুন আইন তৈরি করা, বিদ্যমান আইন সংশোধন বা বাতিল করা।

  • রেফারেন্স: বাংলাদেশ সংবিধানের ৬৫(১) অনুচ্ছেদ। এখানে বলা হয়েছে, "প্রজাতন্ত্রের আইনপ্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত হইবে।"

  • কার্যক্রম: অধিবেশনে বিল উত্থাপন, বিলের ওপর আলোচনা এবং ভোট প্রদান।


২. সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ (Oversight Functions)

সরকার বা নির্বাহী বিভাগ ঠিকমতো কাজ করছে কি না তা তদারকি করা।

  • বিবরণ: প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়কে জবাবদিহিতার আওতায় আনা।

  • রেফারেন্স: বাংলাদেশ সংবিধানের ৫৫(৩) অনুচ্ছেদ (মন্ত্রিসভা সংসদের নিকট যৌথভাবে দায়ী থাকিবে) এবং সংসদ কার্যপ্রণালী বিধি (Rules of Procedure)

  • কার্যক্রম: সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম বা কার্যক্রম তদন্ত করা এবং রিপোর্ট প্রদান।


৩. জাতীয় বাজেট ও অর্থ অনুমোদন (Financial Functions)

রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয়ের অধিকার সংসদ সদস্যদের হাতে।

  • বিবরণ: বার্ষিক বাজেট অনুমোদন এবং সরকারের কর প্রস্তাব পাস করা।

  • রেফারেন্স: বাংলাদেশ সংবিধানের ৮১ থেকে ৯২ অনুচ্ছেদ (আইনবিভাগীয় অর্থপদ্ধতি)।

  • কার্যক্রম: বাজেটের ওপর বিতর্ক করা এবং গ্রান্ট বা বরাদ্দের দাবিতে ভোট দেওয়া।


৪. স্থানীয় উন্নয়ন ও উপদেষ্টা হিসেবে ভূমিকা (Developmental & Advisory)

আইনত উন্নয়ন কাজ চেয়ারম্যানদের হলেও এমপিদের এখানে সমন্বয়ের ভূমিকা দেওয়া হয়েছে।

  • বিবরণ: উপজেলা পরিষদের কার্যক্রম তদারকি ও উন্নয়ন প্রকল্পে পরামর্শ দেওয়া।

  • রেফারেন্স: উপজেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮ (সংশোধিত ২০১১)-এর ধারা ২৫। এই ধারা অনুযায়ী এমপি সংশ্লিষ্ট উপজেলা পরিষদের 'উপদেষ্টা' হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং পরিষদ তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতে বাধ্য।

  • কার্যক্রম: স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে এডিপি (ADP), টিআর (TR), কাবিখা (KABIKHA) বরাদ্দে সুপারিশ বা ডিও (DO) লেটার প্রদান।


৫. প্রশাসনিক ও বিশেষ দায়িত্ব (Administrative Functions)

বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় তাঁদের আইনি কর্তৃত্ব রয়েছে।

  • বিবরণ: স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল/কলেজ) এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সভাপতি মনোনীত করা বা তদারকি করা।

  • রেফারেন্স: বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি) প্রবিধানমালা, ২০০৯

  • কার্যক্রম: স্থানীয় কলেজ বা মাদ্রাসার প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক তদারকি।


📊 এক নজরে এমপির কাজের পরিধি

কাজের ক্ষেত্র প্রধান রেফারেন্স কাজের ধরণ
আইন প্রণয়ন সংবিধান - অনুচ্ছেদ ৬৫ জাতীয়
বাজেট অনুমোদন সংবিধান - অনুচ্ছেদ ৮৩-৯০ জাতীয়
মন্ত্রণালয় তদারকি সংবিধান - অনুচ্ছেদ ৭৬ (কমিটি) জাতীয়
উপজেলা পরিষদ উপজেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮ স্থানীয় (উপদেষ্টা)
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষা বোর্ড প্রবিধানমালা স্থানীয় (ব্যবস্থাপনা)

⚠️ আইনি সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা:

সংবিধান অনুযায়ী এমপির কাজ মূলত সংসদে। কিন্তু উপজেলা পরিষদ আইন (সংশোধিত ২০১১)-এর মাধ্যমে তাঁদের স্থানীয় প্রশাসনে 'উপদেষ্টা' করে অনেক বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালত (High Court) বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে বলেছে যে, এমপিদের উন্নয়ন কাজে অতি-সক্রিয়তা স্থানীয় সরকার বা চেয়ারম্যানদের ক্ষমতাকে খর্ব করে, যা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী।

Previous
Previous

‘সংসদীয় স্থায়ী কমিটি’- জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রকাশের মাধ্যম (২৩)

Next
Next

এমপি বনাম স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিঃ কর্মক্ষেত্র নির্বাচনে সমস্যা ও সমাধান (২১)