জিডিপিঃবাজেটঃরাজস্ব আয়ঃনন-ট্যাক্স রেভিনিউ : সার্কভুক্ত ও নন-সার্কভুক্ত ১০টি দেশ(৮)

ক) সার্কভুক্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক চিত্র (২০২৪-২৫)

২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য সার্কভুক্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক তথ্যের একটি তুলনামূলক ছক নিচে দেওয়া হলো। তথ্যগুলো বিলিয়ন ডলারে (USD Billion) রূপান্তর করা হয়েছে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের জন্য ২০২৪-২৫ একটি চলমান অর্থবছর (জুলাই-জুন), ভারতের জন্য এটি এপ্রিল-মার্চ। তথ্যগুলো বাজেট প্রাক্কলন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর (ADB, IMF, World Bank) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংকলিত।

দেশ মোট জিডিপি (B$) বাজেট (B$) জিডিপি-বাজেট অনুপাত (b%) মোট রাজস্ব আয় (B$) রাজস্ব-বাজেট অনুপাত (B%) নন-রেভিনিউ সংস্থান* (B$) নন-রেভিনিউ বাজেট অনুপাত (B%) সরকারি মোট ঋণ (B$)
বাংলাদেশ ৪৫৫.০০ ৬৮.০০ ১৪.৯% ৪৫.৭০ ৬৭.২% ২২.৩০ ৩২.৮% ১৮৪.৪০
ভারত ৩,৯৪০.০০ ৫৭৬.০০ ১৪.৬% ৩৮৩.০০ ৬৬.৫% ১৯৩.০০ ৩৩.৫% ৩,৩৫০.০০
পাকিস্তান ৪১০.৯৬ ৬৫.০০ ১৫.৮% ৬৪.০০ ৯৮.৪%** ১.০০ ১.৫% ২৭৫.০০
শ্রীলঙ্কা ৮৪.৫০ ১৩.৫০ ১৬.০% ১০.৮০ ৮০.০% ২.৭০ ২০.০% ৯০.০০
নেপাল ৪৩.৫০ ১৩.৬০ ৩১.২% ৯.৪০ ৬৯.১% ৪.২০ ৩০.৯% ১৮.৫০
ভুটান ৩.০০ ১.১০ ৩৬.৬% ০.৭০ ৬৩.৬% ০.৪০ ৩৬.৪% ২.৯৫
মালদ্বীপ ৭.২০ ৩.৫০ ৪৮.৬% ২.৪০ ৬৮.৫% ১.১০ ৩১.৪% ৪.৫০

তথ্য বিশ্লেষণ ও গুরুত্বপূর্ণ নোট:

১. বাংলাদেশ প্রসঙ্গ:

  • জিডিপি: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর হয়ে ৫.১% থেকে ৫.৪% এর মধ্যে থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

  • রাজস্ব ও ঋণ: বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনো দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। মোট ঋণের একটি বড় অংশ বর্তমানে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া হচ্ছে।

২. ব্যখ্যা (টার্মিনোলজি):

  • নন-রেভিনিউ সোর্স (Non-Revenue Source): এটি মূলত বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়পত্র এবং বৈদেশিক ঋণ অন্তর্ভুক্ত।

  • রাজস্ব-বাজেট অনুপাত: একটি দেশ তার বাজেটের কত শতাংশ নিজস্ব আয় (কর ও অন্যান্য ফি) দিয়ে মেটাতে পারে তার সূচক।

  • সরকারি মোট ঋণ: এটি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সমষ্টি। ভারতের ঋণের পরিমাণ বিশাল মনে হলেও তাদের জিডিপির তুলনায় তা স্থিতিশীল।

৩. সীমাবদ্ধতা: আফগানিস্তানের প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া না যাওয়ায় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এছাড়া ডলারের বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণে মূল স্থানীয় মুদ্রার হিসাবের সাথে ডলারের পরিমাণে সামান্য তারতম্য হতে পারে।

 

খ)বৈশ্বিক অর্থনৈতিক তুলনামূলক চিত্র (২০২৪-২৬ প্রক্ষেপণ)

একটি দেশের অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি এবং এর ভবিষ্যৎ গতিপথ বোঝার জন্য জিডিপি, বাজেট, রাজস্ব এবং ঋণের এই তুলনামূলক উপাত্তগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নিচে আপনার চাহিদামতো দেশগুলোর বিস্তারিত অর্থনৈতিক চিত্র একটি সমন্বিত ছকে উপস্থাপন করা হলো।

(উপাত্তগুলো মার্কিন ডলারে এবং জিডিপির শতাংশ হিসেবে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর প্রক্ষেপণের ভিত্তিতে সাজানো)

দেশের নাম মোট জিডিপি (ট্রিলিয়ন $) মোট বাজেট ($ জিডিপির %) জিডিপি-রাজস্ব অনুপাত (%) জিডিপি-নন-রাজস্ব অনুপাত (%) সরকারি মোট ঋণ (জিডিপির %) এর মধ্যে বিদেশী ঋণ (%)
বাংলাদেশ ০.৪৭ ১২.৫% - ১৩.০% ৮.৫% - ৯.০% ১.০% - ১.৫% ৩৯.০% ১৬.৫%
ভারত ৩.৯৫ ১৫.০% ১১.৫% ২.০% ৮২.০% ৫.০%
পাকিস্তান ০.৩৮ ১২.৫% ৯.০% ১.৫% ৭৭.৫% ৩৫.০%
ভুটান ০.০০৩ ৩০.৫% ১৬.০% ৮.৫% ১২০.০% ৮০.০%+
নরওয়ে ০.৫৫ ৪৯.৫% ৪০.৫% ৫.০% ৩৮.০% ৩.৫%
সুইডেন ০.৬২ ৪৮.৫% ৪২.৫% ৪.০% ৩১.৫% ৫.০%
ডেনমার্ক ০.৪১ ৫০.০% ৪৫.০% ৪.৫% ৩০.০% ৪.০%
দেশের নাম মোট জিডিপি (ট্রিলিয়ন $) মোট বাজেট ($ জিডিপির %) জিডিপি-রাজস্ব অনুপাত (%) জিডিপি-নন-রাজস্ব অনুপাত (%) সরকারি মোট ঋণ (জিডিপির %) এর মধ্যে বিদেশী ঋণ (%)
যুক্তরাষ্ট্র ২৮.৭ ৩৩.৫% ২৪.৫% ২.০% ১২২.০% ২৬.০%
যুক্তরাজ্য ৩.৫ ৪৪.৫% ৩৬.৫% ৩.৫% ১০০.০% ২৮.০%
মালয়েশিয়া ০.৪৭ ২৫.০% ১৫.৫% ৪.৫% ৬২.০% ৩.০%
সিঙ্গাপুর ০.৫২ ১৮.৫% ১৪.০% ৪.৫% ১৬৫.০%* ৫.০%
চীন ১৮.৫ ২৫.৫% ১৮.৫% ৫.০% ৮৩.০% ৪.০%
জাপান ৪.২ ৩৯.৫% ৩৪.০% ৩.০% ২৫৫.০% ৪.৫%

উপরের তথ্য-ছকের সাথে মোট সরকারী ঋণ, বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ও জিডিপির সাথে আনুপাতিক হার দেখানো হলোঃ

দেশের নাম মোট সরকারি ঋণ (জিডিপির %) মোট ঋণের পরিমাণ (বিলিয়ন মার্কিন ডলারে) বৈদেশিক ঋণ (জিডিপির %) বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ (বিলিয়ন মার্কিন ডলারে)
বাংলাদেশ ৩৯.০% ১৮৩.৩ ১৬.৫% ৭৭.৫
ভারত ৮২.০% ৩,২৩৯.০ ৫.০% ১৯৭.৫
পাকিস্তান ৭৭.৫% ২৯৪.৫ ৩৫.০% ১৩৩.০
ভুটান ১২০.০% ৩.৬ ৮০.০% ২.৪
চীন ৮৩.০% ১৫,৩৫৫.০ ৪.০% ৭৪০.০
যুক্তরাষ্ট্র ১২২.০% ৩৫,০১৪.০ ২৬.০% ৭,৪৬২.০
যুক্তরাজ্য ১০০.০% ৩,৫০০.০ ২৮.০% ৯৮০.০
দেশের নাম মোট সরকারি ঋণ (জিডিপির %) মোট ঋণের পরিমাণ (বিলিয়ন মার্কিন ডলারে) বৈদেশিক ঋণ (জিডিপির %) বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ (বিলিয়ন মার্কিন ডলারে)
নরওয়ে ৩৮.০% ২০৯.০ ৩.৫% ১৯.২
সুইডেন ৩১.৫% ১৯৫.৩ ৫.০% ৩১.০
ডেনমার্ক ৩০.০% ১২৩.০ ৪.০% ১৬.৪
মালয়েশিয়া ৬২.০% ২৯১.৪ ৩.০% ১৪.১
সিঙ্গাপুর ১৬৫.০% ৮৫৮.০ ৫.০% ২৬.০
জাপান ২৫৫.০% ১০,৭১০.০ ৪.৫% ১৮৯.০

এই উপাত্তগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ:

১. জিডিপি-রাজস্ব অনুপাত (Tax-to-GDP Ratio)

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই অনুপাত। উন্নত দেশগুলোতে (যেমন ডেনমার্ক বা নরওয়ে) এটি ৪০% এর উপরে। অর্থাৎ তারা জিডিপির বড় অংশ কর হিসেবে পায় বলে নাগরিকদের জন্য বিশাল বাজেট (৫০%) দিতে পারে। বাংলাদেশে এটি ৯% এর নিচে থাকায় বাজেটের আকারও ছোট রাখতে হয়।

২. রাজস্ব বনাম নন-রাজস্ব আয়

নন-রাজস্ব আয় (যেমন ফি, টোল, লাভাংশ) সাধারণ জনগণের ওপর সরাসরি করের চাপ ছাড়াই বাজেট বাড়াতে সাহায্য করে। ভুটান বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো এই খাতে ভালো করছে। বাংলাদেশ এই খাতে এখনও বেশ পিছিয়ে।

৩. সরকারি ঋণ ও বিদেশী ঋণ

জাপান: বিশ্বের সর্বোচ্চ ঋণগ্রস্ত দেশ হলেও তাদের বিদেশী ঋণ খুবই কম (মাত্র ৪.৫%)। তাদের প্রায় সব ঋণই তাদের নিজেদের জনগণের কাছ থেকে নেওয়া।

ভুটান ও পাকিস্তান: এদের বিদেশী ঋণের অনুপাত অনেক বেশি, যা তাদের অর্থনীতিকে বাইরের চাপের মুখে ফেলে দেয়।

বাংলাদেশ: বাংলাদেশের বিদেশী ঋণ এখনও ঝুঁকিমুক্ত সীমার (১৬.৫%) মধ্যে আছে, তবে ঋণ পরিশোধের কিস্তি (Interest payment) বাজেটের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।

৪. অনুন্নতি ও সুশাসনের যোগসূত্র

ছক থেকে দেখা যায়, যেসব দেশের জিডিপি-রাজস্ব অনুপাত বেশি, তাদের সুশাসন সূচক এবং মানব উন্নয়ন সূচকও বেশি। দুর্নীতি কম থাকলে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দেয়, ফলে রাজস্ব বাড়ে এবং সরকার শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে বেশি খরচ করতে পারে।

৫. টাকার অংক বনাম শতাংশ (শক্তির পার্থক্য):

যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ শুনলে মনে হবে তা বিশাল (৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার), কিন্তু তাদের বিশাল জিডিপির কারণে তারা এই ঋণ বহন করতে সক্ষম। অন্যদিকে, ভুটানের ঋণের অংক মাত্র ৩.৬ বিলিয়ন ডলার হলেও তাদের ছোট অর্থনীতির জন্য এটি বিশাল বোঝা (১২০%)।

৬. বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকি (Foreign Debt Risk):

সংসদে আলোচনার সময় এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। দেখুন— জাপানের ঋণ জিডিপির ২৫৫% হলেও তাদের বৈদেশিক ঋণ মাত্র ৪.৫%। অর্থাৎ জাপান তাদের নিজেদের মানুষের কাছে ঋণী, বাইরে নয়। কিন্তু পাকিস্তানভুটানের বৈদেশিক ঋণের অনুপাত অনেক বেশি (৩৫% ও ৮০%)। যখন কোনো দেশের বৈদেশিক ঋণ বেশি থাকে, তখন বিশ্ববাজারের অস্থিরতা বা ডলারের দাম বাড়লে সেই দেশ দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

৭. বাংলাদেশের অবস্থান:

বাংলাদেশের সরকারি ঋণ (৩৯%) এবং বৈদেশিক ঋণ (১৬.৫%) দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এখনও নিয়ন্ত্রিত সীমার মধ্যে রয়েছে। তবে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ এবং ঋণের বিপরীতে সুদের কিস্তি পরিশোধের চাপ (Debt Service Ratio) সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পাওয়াটি একটি চিন্তার বিষয়।

সংসদীয় বক্তব্যের জন্য একটি পরামর্শ:

সংসদ সদস্যগণ যখন এই উপাত্তগুলো নিয়ে কথা বলবেন, তখন তারা এটি উল্লেখ করতে পারেন যে— "কেবল ঋণ নিয়ে বাজেট বড় করা কোনো সমাধান নয়, বরং জিডিপি-রাজস্ব অনুপাত ভারতের (১১.৫%) বা মালয়েশিয়ার (১৫.৫%) পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া জরুরি।" এটিই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার মূল পথ।


Previous
Previous

জিডিপিঃবাজেটঃ রাজস্ব আয়ঃ সুশাসন অনুপাত বৃদ্ধিতে করণীয় (৯)

Next
Next

রেফারেন্সঃ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক(৭)