রাজস্ব বৃদ্ধি: উন্নয়ন ও আশঙ্কার দ্বৈরথ; এবং ১২টি দেশের ০৪টি প্রধান খাতের বরাদ্দের তুলনামূলক বিশ্লেষণ(৬)
আয়কর বাড়ানো বা রাজস্ব সংগ্রহের হার বৃদ্ধির প্রসঙ্গ উঠলেই সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। বিরোধী দলগুলো অনেক সময় একে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু অর্থনীতির মারপ্যাঁচে এই 'ভয়' যেমন অমূলক নয়, তেমনি রাজস্ব বৃদ্ধির 'সুফল' অত্যন্ত বৈপ্লবিক। রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও বাজেট-জিডিপি অনুপাত শক্তিশালী হওয়ার সাথে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সম্পর্ক নিয়ে নিচে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হলো।
১. সাধারণ মানুষের ভয়ের কারণ: বাস্তবতা বনাম ধারণা
দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের মনে কর বৃদ্ধির কথা শুনলে মূলত তিনটি কারণে ভয়ের সৃষ্টি হয়:
ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস: মধ্যবিত্তের আয় সীমিত। করের বোঝা বাড়লে তাদের হাতে থাকা খরচযোগ্য আয় (Disposable Income) কমে যায়, যা মূল্যস্ফীতির এই যুগে জীবনযাত্রার মানকে ব্যাহত করে।
পরোক্ষ করের বোঝা: সরকার যখন সরাসরি আয়কর বাড়াতে পারে না, তখন ভ্যাট বা আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে সাবান, তেল বা চিনির মতো নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। এর প্রভাব দরিদ্র মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে।
আস্থার সংকট: সাধারণ মানুষ মনে করে, তাদের দেওয়া করের টাকা উন্নয়নের চেয়ে দুর্নীতি, অপচয় বা মেগা প্রকল্পের অহেতুক ব্যয় বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হবে। এই 'আস্থার অভাব' থেকেই করভীতি তৈরি হয়।
২. রাজস্ব বাড়লে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের প্রকৃত লাভ কী?
জিডিপি-বাজেট অনুপাত বাড়লে সরকার যে বাড়তি অর্থ পায়, তা যদি সঠিক খাতে ব্যয় হয়, তবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় সাধারণ মানুষই।
বিনামূল্যে বা সল্পমূল্যে সেবা: উন্নত বিশ্বে করের হার বেশি (৪০-৫০%), কিন্তু সেখানে একজন নাগরিককে সন্তানের পড়াশোনা বা নিজের চিকিৎসার জন্য চিন্তা করতে হয় না। বাংলাদেশে বাজেট-জিডিপি অনুপাত বাড়লে সরকার স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বরাদ্দ দ্বিগুণ করতে পারবে।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: অনুপাত বাড়লে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা এবং বেকার ভাতার পরিমাণ ও পরিধি বাড়ানো সম্ভব হয়, যা সরাসরি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেয়।
অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান: রাজস্ব বাড়লে সরকার শিল্পাঞ্চল ও যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ করতে পারে, যা নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করে।
৩. উন্নত বিশ্বের সাথে একটি তুলনামূলক চিত্র
নিচের ছকটি দেখলে বোঝা যাবে কেন উন্নত দেশের মানুষ কর দিতে ভয় পায় না এবং আমাদের দেশে ভয় পাওয়ার কারণ কী।
| বিষয় | বাংলাদেশ (নিম্ন রাজস্ব-জিডিপি দেশ) | স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ (উচ্চ রাজস্ব-জিডিপি দেশ) |
|---|---|---|
| বাজেট-জিডিপি অনুপাত | ১২.৫% - ১৩% | ৪৫% - ৫২% |
| শিক্ষা ব্যয় | উচ্চমানের শিক্ষার জন্য প্রাইভেট কোচিং/বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুল খরচ। | প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় সম্পূর্ণ ফ্রি। |
| স্বাস্থ্যসেবা | ক্যান্সারের মতো রোগের চিকিৎসায় পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। | রাষ্ট্র কর্তৃক উন্নতমানের ফ্রি চিকিৎসা নিশ্চিত। |
| ভয় ও আস্থা | মানুষ মনে করে কর দিলে সে তার প্রতিদান পাবে না। | মানুষ মনে করে কর দেওয়া মানে নিজের ভবিষ্যৎ বিমা করা। |
৪. বিরোধী দলের ভূমিকা ও রাজনৈতিক অর্থনীতি
একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দল কেবল কর বৃদ্ধির বিরোধিতাই করবে না, বরং সেই করের টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং কাদের ওপর কর আরোপ করা হচ্ছে—তার স্বচ্ছতা দাবি করবে।
ধনীদের ওপর কর: রাজস্ব বাড়ানোর অর্থ কেবল মধ্যবিত্তের পকেট কাটা নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হয় যখন সরকার ধনীদের ওপর "প্রগ্রেসিভ ট্যাক্স" বা উচ্চহারে কর আরোপ করে সেই টাকা দরিদ্রদের কল্যাণে ব্যয় করে।
সুশাসন নিশ্চিত করা: যদি সরকার প্রমাণ করতে পারে যে করের প্রতিটি টাকা স্বচ্ছভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে সাধারণ মানুষের ভীতি দূর হবে এবং বিরোধী দলের সমালোচনার সুযোগও কমে যাবে।
উপসংহার
রাজস্ব আয় বা বাজেট-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি কোনো ভীতিকর বিষয় নয়, বরং এটি একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের ভয় দূর করার একমাত্র উপায় হলো 'বিনিময়ে সেবা নিশ্চিত করা'। যখন একজন নাগরিক দেখবেন যে ট্যাক্স দেওয়ার ফলে তার সন্তানের স্কুলের বেতন লাগছে না কিংবা হাসপাতালে তাকে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে না, তখন তিনি স্বত:স্ফূর্তভাবেই কর দিতে উৎসাহিত হবেন।
সরকারের উচিত করের হার না বাড়িয়ে 'করের আওতা' বাড়ানো এবং বিত্তশালীদের থেকে ন্যায্য কর আদায় করা। তবেই বাজেট-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির সুফল প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।
বিভিন্ন দেশের খাতভিত্তিক বরাদ্দ (জিডিপির % হিসেবে)
বিভিন্ন দেশের উন্নয়ন দর্শন এবং নাগরিক সেবার মান বোঝার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে জিডিপির তুলনায় বরাদ্দের হার বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি। নিচে আপনার চাহিদামতো দেশগুলোর একটি তুলনামূলক ছক ও এর প্রভাব আলোচনা করা হলো।
(উপাত্তগুলো সাম্প্রতিক গড় প্রক্ষেপণ ও বিশ্বব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত)
| ক্রম | দেশের নাম | বাজেট-জিডিপি অনুপাত (%) | শিক্ষা (GDP %) | স্বাস্থ্য (GDP %) | অবকাঠামো (GDP %) | বিশেষ বৈশিষ্ট্য / প্রভাব |
|---|---|---|---|---|---|---|
| ১ | বাংলাদেশ | ১২.৫% - ১৩.০% | ১.৭% - ১.৮% | ০.৭% - ০.৮% | ১.৫% - ২.০% | বাজেট ছোট হওয়ায় নাগরিক সেবা খাতে বরাদ্দ বিশ্বের সর্বনিম্ন হারগুলোর একটি। |
| ২ | ভারত | ১৪.৫% - ১৫.৫% | ২.৯% - ৩.০% | ২.১% | ৩.৩% | মেগা প্রজেক্ট এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোয় ব্যাপক বিনিয়োগ বৃদ্ধি। |
| ৩ | পাকিস্তান | ১২.০% - ১৩.০% | ১.৮% - ২.০% | ০.৮% - ১.০% | ১.২% | ঋণ পরিশোধের চাপ বেশি থাকায় সামাজিক উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ সীমিত। |
| ৪ | ভুটান | ৩০.০% - ৩২.০% | ৬.০% - ৭.০% | ৩.৫% - ৪.০% | ৫.০%+ | দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রদানকারী, যার ফলে নাগরিক সেবা প্রায় ফ্রি। |
| ৫ | চীন | ২৪.০% - ২৬.০% | ৪.০% - ৪.২% | ৫.৪% - ৬.০% | ৫.৫% - ৮.০% | অবকাঠামো ও হাই-টেক গবেষণায় বিনিয়োগ করে বিশ্বের উৎপাদন হাব। |
| ৬ | নরওয়ে | ৪৯.০% - ৫০.০% | ৬.৫% - ৭.০% | ১০.০% - ১১.০% | ৩.০% - ৪.০% | বিশাল বাজেট ও উচ্চ করের বিনিময়ে রাষ্ট্রই নাগরিকদের সব ভার নেয়। |
| ৭ | সুইডেন | ৪৮.০% - ৪৯.৫% | ৭.৫% | ১১.০% | ৩.৫% | উচ্চমানের সামাজিক নিরাপত্তা এবং উদ্ভাবনী অর্থনীতি। |
| ৮ | যুক্তরাষ্ট্র | ৩৩.০% - ৩৪.০% | ৫.৫% - ৬.০% | ১৬.০% - ১৭.০% | ২.৫% | প্রতিরক্ষা ও স্বাস্থ্য গবেষণায় বিশ্বের সর্বোচ্চ ব্যয়কারী দেশ। |
| ৯ | যুক্তরাজ্য | ৪৩.০% - ৪৫.০% | ৪.৫% - ৫.০% | ১০.০% - ১২.০% | ২.০% | জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (NHS) ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসা। |
| ১০ | মালয়েশিয়া | ২৪.০% - ২৫.৫% | ৪.০% - ৪.৫% | ২.৫% - ৩.০% | ৩.০% - ৪.০% | শিল্পায়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর। |
| ১১ | সিঙ্গাপুর | ১৮.০% - ১৯.০% | ৩.০% - ৩.৫% | ৪.৫% - ৫.০% | ৫.০%+ | ছোট দেশ হিসেবে অবকাঠামো ও দক্ষ প্রশাসনে সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ। |
| ১২ | জাপান | ৩৮.০% - ৪০.০% | ৩.৫% | ১১.০% | ৩.৫% | প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ। |
এই বরাদ্দের পার্থক্যের অর্থ কী?
১. শিক্ষা খাত:
ভুটান ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো তাদের জিডিপির একটি বিশাল অংশ (৬-৭%) শিক্ষায় ব্যয় করে। এর ফলে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম অত্যন্ত দক্ষ ও সুশিক্ষিত হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এক্ষেত্রে ২%-এর নিচে অবস্থান করছে, যার ফলে শিক্ষার মানের চেয়ে 'সংখ্যা' (পাস করার হার) বেশি বাড়ছে।
২. স্বাস্থ্য খাত:
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর বরাদ্দ ১০%-এর উপরে। তারা নাগরিকদের জীবনকে সর্বোচ্চ মূল্যবান মনে করে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বরাদ্দ ০.৮% হওয়ায় একজন অসুস্থ রোগীকে তার চিকিৎসার খরচের প্রায় ৭০% নিজের পকেট থেকে দিতে হয় (Out-of-pocket expenditure), যা অনেক পরিবারকে দরিদ্র করে ফেলে।
৩. অবকাঠামো খাত:
সিঙ্গাপুর ও ভুটান অবকাঠামোয় ৫% বা তার বেশি ব্যয় করে কারণ তারা জানে আধুনিক রাস্তা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সরাসরি জিডিপি বাড়াতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশের অবকাঠামো ব্যয় গত দশকে ভালো থাকলেও এখন তা রক্ষণাবেক্ষণ ও টেকসই করার দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
ছকটি ব্যবহারের জন্য কিছু নির্দেশিকা (সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ উপযোগী):
১. বাজেট-জিডিপি ও সেবা খাতের সম্পর্ক: লক্ষ্য করুন, যেসব দেশের বাজেট-জিডিপি অনুপাত বেশি (যেমন নরওয়ে বা যুক্তরাজ্য), তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের হারও অনেক বেশি। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বাজেট ছোট বলেই খাতভিত্তিক বরাদ্দ বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
২. ভুটান ও মালয়েশিয়া মডেল: বাংলাদেশের সংসদীয় বিতর্কে এই দুটি দেশ আদর্শ উদাহরণ হতে পারে। ভুটান ও মালয়েশিয়া তাদের বাজেটের একটি বড় অংশ (জিডিপির ৪-৬%) শিক্ষায় দেয়, যা বাংলাদেশের তুলনায় তিন গুণ বেশি।
৩. অবকাঠামো বনাম মানবসম্পদ: চীন অবকাঠামোতে সর্বোচ্চ ব্যয় (৮% পর্যন্ত) করে দ্রুত উন্নয়ন করেছে। তবে তারা সাথে সাথে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অনুপাতও ৫-৬ শতাংশে রেখেছে। ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের জন্য এই তিনটি খাতের আনুপাতিক হার বজায় রাখা জরুরি।
৪. সিঙ্গাপুর মডেল: সিঙ্গাপুরের বাজেট ছোট হলেও (১৮-১৯%) তারা তাদের অগ্রাধিকার অনুযায়ী অবকাঠামো ও শিক্ষায় অনেক বেশি মনোযোগী, যার ফলে তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে শীর্ষে রয়েছে।
এই ছকটি সংসদীয় বক্তব্যে উপস্থাপন করলে এটি প্রমাণিত হবে যে, কেবল টাকার অংকের বরাদ্দ নয়, বরং জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ বাড়ানোই একটি রাষ্ট্রকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রকৃত পথ।
সারসংক্ষেপ:
সংসদে আলোচনার সময় এই ছকটি একটি শক্তিশালী রেফারেন্স হতে পারে। যদি আমরা বলি যে, "ভুটান যদি শিক্ষায় ৬% খরচ করতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন ২%-এর নিচে থাকবে?" —তবে এটি অনেক বেশি যৌক্তিক ও তথ্যবহুল শোনায়। উন্নত দেশের মডেল কেবল মাথাপিছু আয় বাড়ায় না, বরং সেই আয়ের একটি বড় অংশ (জিডিপি রেশিও হিসেবে) জনগণের মৌলিক অধিকারে পুনর্বণ্টন করে।