রেনেসাঁ: গণতন্ত্রের গর্ভফুল-১ (৮)
রেনেসাঁ ও গণতন্ত্রের জাগরণে তার প্রভাব
রেনেসাঁ কি?
রেনেসাঁ (Renaissance) একটি ফরাসি শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ হলো 'নবজাগরণ' বা 'পুনর্জন্ম'। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে, চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপে মধ্যযুগের অন্ধকার কাটিয়ে শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান এবং দর্শনের ক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন বা জাগরণ ঘটেছিল, তাকেই রেনেসাঁ বলা হয়।
রেনেসাঁ সম্পর্কে কিছু মূল বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো:
উৎস: এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ইতালির ফ্লোরেন্স শহর থেকে, যা পরে ধীরে ধীরে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাচীন জ্ঞানচর্চা: রেনেসাঁ মূলত প্রাচীন গ্রিক ও রোমান জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং সংস্কৃতিকে পুনরায় আবিষ্কার করার একটি প্রচেষ্টা ছিল।
মানবতাবাদ (Humanism): মধ্যযুগে মানুষ ছিল মূলত ধর্মকেন্দ্রিক। কিন্তু রেনেসাঁর ফলে মানুষ ইহজাগতিক জীবন এবং নিজের সৃজনশীলতার ওপর গুরুত্ব দিতে শুরু করে। একেই বলা হয় মানবতাবাদ।
শিল্প ও সাহিত্য: লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মাইকেলেঞ্জেলো এবং রাফায়েলের মতো শিল্পীদের তুলিতে চিত্রকলা ও ভাস্কর্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। সাহিত্যে দান্তে, শেক্সপিয়র এবং পেত্রার্ক মানুষের আবেগ ও যুক্তিকে প্রাধান্য দেন।
বিজ্ঞান ও আবিষ্কার: এই সময়েই গ্যালিলিও ও কোপার্নিকাস মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দেন এবং গুটেনবার্গের ছাপাখানা আবিষ্কারের ফলে জ্ঞানচর্চা সাধারণ মানুষের নাগালে আসে।
সহজ কথায়, রেনেসাঁ হলো অন্ধবিশ্বাস ও স্থবিরতা কাটিয়ে যুক্তি, বিজ্ঞান এবং সৃজনশীলতার পথে মানুষের ফিরে আসার এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ।
গণতন্ত্রের বিকাশে রেনেসাঁর প্রভাব
রেনেসাঁ সরাসরি ভোট বা নির্বাচন আনেনি, বরং মানুষের চিন্তার পরিবর্তন এনেছিল যা পরে গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করে। রেনেসাঁ বা 'নবজাগরণ' সরাসরি কোনো ব্যালট বাক্স বা নির্বাচনের জন্ম দেয়নি, বরং এটি মানুষের মস্তিষ্কে এমন এক বিপ্লব ঘটিয়েছিল যা ছাড়া আধুনিক গণতন্ত্রের অস্তিত্ব কল্পনা করা অসম্ভব। চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত চলা এই সাংস্কৃতিক আন্দোলন কীভাবে রাজতন্ত্র ও গির্জার শিকল ভেঙে গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করেছিল, তা নিচে আলোচনা করা হলো:
১. মানবতাবাদ: ইশ্বরকেন্দ্রিক জগত থেকে মানুষকেন্দ্রিক জগত
মধ্যযুগে ইউরোপের মূল চিন্তা ছিল 'পরকাল' এবং 'গির্জা'। মানুষ বিশ্বাস করত তারা জন্মগতভাবেই পাপি এবং তাদের নিজস্ব কোনো মূল্য নেই। রেনেসাঁ এই ধারণা বদলে দিয়ে 'মানবতাবাদ' (Humanism) নিয়ে আসে। রেনেসাঁর দার্শনিকরা প্রচার করলেন যে, মানুষ সৃষ্টির সেরা এবং তার নিজস্ব মেধা, যুক্তি ও সম্ভাবনা আছে।
গণতান্ত্রিক সংযোগ: যখন মানুষ নিজের গুরুত্ব বুঝতে শিখল, তখনই সে প্রশ্ন তুলল— "কেন একজন রাজা বা ধর্মগুরু আমার জীবনের সব সিদ্ধান্ত নেবেন?" এই আত্মসম্মানবোধই পরবর্তীকালে 'নাগরিক অধিকার'-এর দাবিতে রূপ নেয়।
২. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (Individualism)
রেনেসাঁর আগে মানুষ নিজেকে কোনো একটি গোষ্ঠী বা শ্রেণির (যেমন: কৃষক বা সামন্ত) অংশ মনে করত। রেনেসাঁ মানুষকে শেখাল যে সে একজন 'ব্যক্তি'। শিল্পকলায় শিল্পীরা নিজেদের নাম সই করতে শুরু করলেন, যা আগে হতো না।
গণতান্ত্রিক সংযোগ: গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো 'একজন মানুষ, একটি ভোট'। অর্থাৎ, সমষ্টির ভিড়ে ব্যক্তির মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। রেনেসাঁই প্রথম ব্যক্তিকে ভিড় থেকে আলাদা করে তার মতামতের মূল্য দিয়েছিল।
৩. যুক্তিবাদ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি
মধ্যযুগে রাজার ক্ষমতাকে বলা হতো 'Divine Right' বা 'ঈশ্বরপ্রদত্ত অধিকার'। রেনেসাঁর প্রভাবে মানুষ অন্ধবিশ্বাসের বদলে যুক্তি (Reason) দিয়ে সবকিছু বিচার করতে শিখল। গ্যালিলিও বা কোপারনিকাসের মতো বিজ্ঞানীরা যখন প্রমাণ করলেন যে চার্চের সব কথা ঠিক নয়, তখন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারল যে রাজাদের ক্ষমতাও প্রশ্নাতীত নয়।
গণতান্ত্রিক সংযোগ: যুক্তি যখন বিশ্বাসের জায়গা নিল, তখন মানুষ প্রশ্ন করল— "রাজা যদি অযোগ্য হন, তবে কেন আমরা তাকে মেনে চলব?" এই প্রশ্নই রাজতন্ত্র উচ্ছেদের বীজ বপন করেছিল।
৪. ছাপাখানা ও তথ্যের গণতন্ত্রায়ন
১৪৫০ সালে জোহানেস গুটেনবার্গের ছাপাখানা আবিষ্কার রেনেসাঁকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। আগে জ্ঞান ছিল কেবল উচ্চবিত্ত ও পাদ্রিদের হাতে। বই সস্তা হওয়ায় সাধারণ মানুষ পড়তে শিখল এবং বাইবেলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে আলোচনা শুরু করল।
গণতান্ত্রিক সংযোগ: তথ্য ও জ্ঞান যখন সবার জন্য উন্মুক্ত হলো, তখন ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হলো। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হলো যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের অংশগ্রহণ দাবি করতে শুরু করল।
৫. মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ও সামন্তবাদের পতন
রেনেসাঁর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে এবং একটি শক্তিশালী বণিক ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণি তৈরি হয়। তারা আর সামন্ত প্রভুদের অধীনে থাকতে চাইল না। তারা এমন একটি ব্যবস্থা চাইল যেখানে আইনের শাসন থাকবে এবং তাদের জান-মালের নিরাপত্তা থাকবে।
গণতান্ত্রিক সংযোগ: এই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি তুলল, যা পরে ইংল্যান্ডের গৌরবময় বিপ্লব এবং ফরাসি বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
সংক্ষেপে রেনেসাঁর অবদান
| রেনেসাঁর মূলমন্ত্র | গণতন্ত্রে তার রূপান্তর |
|---|---|
| প্রশ্ন করার সাহস | জবাবদিহিমূলক সরকার গঠন। |
| সবার জন্য শিক্ষা | সচেতন ভোটার ও জনমত তৈরি। |
| আইনের শাসন | রাজার মর্জির বদলে সংবিধানের প্রাধান্য। |
সহজ কথায়, রেনেসাঁ ছিল একটি উর্বর জমি তৈরির প্রক্রিয়া। রেনেসাঁ মানুষের মনে যে 'স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা' এবং 'যুক্তিবাদের আলো' জ্বালিয়ে দিয়েছিল, সেই আলোতেই পরবর্তীতে জন লক, রুশো বা ভলতেয়ারের মতো দার্শনিকরা আধুনিক গণতন্ত্রের কাঠামো তৈরি করতে পেরেছিলেন। রেনেসাঁ না হলে মানুষ আজও হয়তো নিজেকে রাজভৃত্য মনে করত, নাগরিক নয়।
রেনেসাঁর অবদানঃ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জন্য আবশ্যক পাঠ
একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য ইতিহাস কেবল অতীতের গল্প নয়, বরং এটি ভবিষ্যতে চলার পথের ম্যাপ। বিশেষ করে 'রেনেসাঁ' বা নবজাগরণের ইতিহাস জানা একজন রাজনীতিবিদের জন্য বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। কারণ, আজকের যে গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা বাক-স্বাধীনতার সুবিধা আমরা ভোগ করছি, তা আকাশ থেকে পড়েনি; বরং এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের বঞ্চনা, লাখো মানুষের রক্তপাত এবং শত শত মনীষীর আজীবন লড়াই।
রাজনীতি হলো সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। আর এই হাতিয়ারকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হলে একজন কর্মীকে জানতে হয়, মানবসভ্যতা কীভাবে অন্ধকার থেকে আলোর পথে এসেছে। রেনেসাঁ বা নবজাগরণ ছিল ইউরোপের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যা মধ্যযুগের স্থবিরতা ভেঙে আধুনিক পৃথিবীর ভিত্তি স্থাপন করেছিল। একজন রাজনৈতিক নেতার জন্য এই ইতিহাসের খুঁটিনাটি জানা অপরিহার্য কয়েকটি কারণে:
১. ক্ষমতার উৎস ও জনগণের মর্যাদা বোঝা
রেনেসাঁর আগে ক্ষমতা ছিল 'ঈশ্বরপ্রদত্ত' এবং রাজা ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। রেনেসাঁ শিখিয়েছে যে, ক্ষমতার প্রকৃত উৎস হলো মানুষ। একজন রাজনৈতিক কর্মী যখন রেনেসাঁর 'মানবতাবাদ' (Humanism) পাঠ করেন, তখন তিনি বুঝতে পারেন যে একজন সাধারণ নাগরিকের মর্যাদা কোনো রাজার চেয়ে কম নয়। এই বোধ তাকে স্বৈরাচারী হওয়া থেকে রক্ষা করে। তিনি জনগণকে 'প্রজা' নয়, বরং 'মালিক' হিসেবে দেখতে শেখেন।
২. ত্যাগের মহিমা ও সংগ্রামের মূল্য অনুধাবন
রেনেসাঁ কোনো শান্তিপূর্ণ আলোচনা সভায় আসেনি। বিজ্ঞানী ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, গ্যালিলিওকে গৃহবন্দী করা হয়েছে এবং অসংখ্য দার্শনিককে নির্বাসিত করা হয়েছে কেবল সত্য কথা বলার জন্য। একজন রাজনৈতিক নেতা যখন এই আত্মত্যাগের খুঁটিনাটি জানবেন, তখন তিনি বর্তমানের অর্জিত গণতন্ত্রকে সস্তা মনে করবেন না। তিনি বুঝবেন যে, আজ তিনি যে মিছিলে যাওয়ার বা বক্তৃতা দেওয়ার অধিকার পাচ্ছেন, তার পেছনে শত বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম রয়েছে। এই উপলব্ধি তাকে দায়িত্বশীল ও বিনয়ী করে তোলে।
৩. অন্ধত্ব বনাম যুক্তিবাদের লড়াই
রেনেসাঁর মূল মন্ত্র ছিল— 'প্রশ্ন করো'। মধ্যযুগের গির্জা বা রাজতন্ত্র যা বলত, মানুষ তা-ই বিশ্বাস করত। রেনেসাঁ মানুষকে যুক্তি দিয়ে বিচার করতে শিখিয়েছে। একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি। অন্ধভাবে দলের আদর্শ অনুসরণ না করে যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাকে একজন প্রকৃত নেতায় রূপান্তরিত করে। এটি তাকে সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠতে সাহায্য করে।
এর ফলে একজন রাজনৈতিক কর্মী বা নেতা শুধুমাত্র নিজের দল বা নিজেকে ক্ষমতাসীন রাখার চেয়ে একটি দেশ বা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, এবং সেক্ষেত্রে তিনি নিজেকে বা নিজের দলকে শক্তিশালী করার চেয়ে দেশের ভেতরের প্রতিষ্ঠান ও কাঠামোগুলোকে শক্তিশালী করার প্রতি দৃষ্টি দেন।
৪. অধিকার বঞ্চনার ইতিহাস ও ইনসাফ কায়েম
ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা আছে কীভাবে সাধারণ মানুষ অধিকার বঞ্চিত ছিল। রেনেসাঁ পরবর্তী সময়েই 'ম্যাগনা কার্টা' বা 'বিলের অফ রাইটস'-এর মতো দলিলগুলো গুরুত্ব পায়। একজন নেতা যখন এই বঞ্চনার ইতিহাস জানেন, তখন তিনি ক্ষমতায় গিয়ে অন্যের অধিকার হরণ করতে ভয় পান। তিনি জানেন যে, অধিকার বঞ্চিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস শেষ পর্যন্ত যেকোনো শক্তিশালী সাম্রাজ্যকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে।
এর ফলে একজন নেতা বিরোধী দল বা পরাজিত দলকে বিরোধী দল হিসাবে না দেখে বৈশ্বিক উন্নয়ন বা জাতীয় উন্নয়নের পথে সহযোগী হিসাবে দেখে থাকেন, এবং জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সকলের পরামর্শ গ্রহণ এবং জবাবদিহিতার মুখোমুখি হন।
৫. আলোকায়নের পথে বাধা না হওয়া
অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে মুক্তচিন্তা বা শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু রেনেসাঁর ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে, আলোর গতিকে কেউ রুখতে পারে না। যারা বাধা দিয়েছিল, ইতিহাস তাদের 'খলনায়ক' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মী কখনোই চাইবেন না ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে। তাই তিনি শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে উৎসাহিত করবেন, যা একটি জাতিকে প্রকৃত অর্থে উন্নত করে।
৬. বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন
রেনেসাঁ কেবল ইতালিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে ভালো চিন্তা ও আদর্শের কোনো সীমানা নেই। একজন রাজনৈতিক নেতা যখন বিশ্ব ইতিহাসের এই বিশাল ক্যানভাস দেখবেন, তখন তার মধ্যে 'গ্লোবাল সিটিজেনশিপ' বা বৈশ্বিক নাগরিকত্বের বোধ তৈরি হবে। তিনি কেবল নিজের দলের বা গোষ্ঠীর স্বার্থ না দেখে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ নিয়ে ভাবার সাহস পাবেন।
পরিশেষে বলা যায়, রেনেসাঁর ইতিহাস হলো অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর যুদ্ধের দলিল। একজন রাজনৈতিক কর্মী যদি এই ইতিহাসের প্রতিটি মোড়, প্রতিটি রক্তবিন্দু এবং প্রতিটি বিপ্লবের কারণ বিস্তারিত জানেন, তবে তিনি কখনোই জনবিচ্ছিন্ন বা স্বৈরশাসক হতে পারবেন না। রেনেসাঁর শিক্ষা তাকে শেখাবে মানুষের সেবা করতে, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং সর্বদা ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকতে। রেনেসাঁ পাঠ করা মানে হলো নিজের রাজনৈতিক চরিত্রকে সোনার মতো খাঁটি করে গড়ে তোলা।
একজন আদর্শিক রাজনৈতিক কর্মীর জন্য রেনেসাঁর এই মহানায়কদের জীবন থেকে নেওয়া দর্শনগুলোকে শ্লোগান বা মূলমন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। এগুলো কেবল দেয়ালিকা বা ভাষণে ব্যবহারের জন্য নয়, বরং আপনার রাজনৈতিক পথচলার দিশারি হিসেবে কাজ করবে।
নিচে আপনার রাজনৈতিক প্রচারণার জন্য কিছু বিশেষ দিকনির্দেশনা ও শ্লোগান উপস্থাপন করা হলো:
১. নেতৃত্বের মূলমন্ত্র (Leadership Strategy)
রেনেসাঁ শিখিয়েছে যে নেতা মানেই 'প্রভু' নয়, বরং 'পথপ্রদর্শক'। আপনার প্রচারণায় নিচের নীতিগুলো যুক্ত করতে পারেন:
শ্লোগান:"জনগণই ক্ষমতার উৎস—রাজার মর্জিতে নয়, জনমতে চলুক রাষ্ট্র।" (জন লকের দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত)
দিকনির্দেশনা: আপনার এলাকায় যখন কোনো জনসভা করবেন, তখন বোঝাবেন যে আপনি কোনো 'হুকুম' দিতে আসেননি, বরং জনগণের সাথে একটি 'সামাজিক চুক্তিতে' (Social Contract) আবদ্ধ হতে এসেছেন।
২. ভিন্নমত ও সহনশীলতা (Tolerance and Pluralism)
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভিন্নমত সহ্য করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে ভলতেয়ারের দর্শন আপনার ঢাল হতে পারে:
শ্লোগান:"আমার বিপক্ষ মানেই আমার শত্রু নয়; আপনার কথা বলার অধিকার রক্ষায় আমি আপসহীন।" (ভলতেয়ারের দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত)
দিকনির্দেশনা: রাজনৈতিক প্রচারণায় বিরোধী পক্ষকে ব্যক্তিগত আক্রমণ না করে তাদের 'মতপ্রকাশের স্বাধীনতা'কে সম্মান জানান। এটি আপনাকে একজন আধুনিক ও পরিপক্ক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
৩. আলোকায়ন ও শিক্ষা (Enlightenment and Education)
রেনেসাঁ ছিল অন্ধকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নাম। আপনার রাজনীতিতে 'শিক্ষা' ও 'যুক্তি'কে প্রাধান্য দিন:
শ্লোগান:"অন্ধ আনুগত্য নয়, যুক্তি দিয়ে রাজনীতি গড়ুন।" (রেনেসাঁর যুক্তিবাদের মূলমন্ত্র)
দিকনির্দেশনা: আপনার কর্মীসভাগুলোতে কর্মীদের কেবল শ্লোগান দিতে না শিখিয়ে, তাদের ইতিহাস ও দর্শন পড়তে উৎসাহিত করুন। একজন শিক্ষিত কর্মী শত শত সাধারণ কর্মীর চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
৪. মানবিক অধিকার ও সাম্য (Human Rights and Equality)
রেনেসাঁর 'হিউম্যানিজম' বা মানবতাবাদকে আপনার রাজনীতির প্রধান স্তম্ভ করুন:
শ্লোগান:"মানুষের পরিচয় তার যোগ্যতায়, জন্মগত পরিচয়ে নয়।" (পেত্রার্ক ও মানবতাবাদের দর্শন)
দিকনির্দেশনা: ধর্ম, বর্ণ বা গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার মানবিক মর্যাদা রক্ষা করার অঙ্গীকার করুন। রেনেসাঁ শিখিয়েছে যে মানুষের সম্ভাবনাই শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
আপনার রাজনৈতিক বক্তৃতার জন্য একটি বিশেষ 'কোটেবল' অংশ:
"বন্ধুগণ, আমরা সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকারী যেখানে সত্য বলার জন্য জর্ডানো ব্রুনোকে পুড়ে মরতে হয়েছে, জ্ঞানের জন্য গ্যালিলিওকে বন্দী হতে হয়েছে। আজ আমরা যে কথা বলার অধিকার ভোগ করছি, তা এই মহাপুরুষদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া। তাই রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতা দখল নয়; রাজনীতি মানে প্রতিটি মানুষের সেই অধিকার রক্ষা করা, যার জন্য ইতিহাসে লাখো মানুষ জীবন দিয়েছে।"
রাজনৈতিক কর্মীর পকেট গাইড (৫টি স্বর্ণালি সূত্র):
১. যুক্তি: আবেগের চেয়ে যুক্তিকে প্রাধান্য দিন।
২. মর্যাদা: ছোট-বড় নির্বিশেষে সবার মানবিক মর্যাদা রক্ষা করুন।
৩. জ্ঞান: প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট ইতিহাস বা দর্শন পাঠ করুন।
৪. সহনশীলতা: প্রতিপক্ষের সমালোচনায় ধৈর্য ধরুন।
৫. সেবা: ক্ষমতাকে 'অর্জিত অধিকার' নয়, 'অর্পিত দায়িত্ব' মনে করুন।