8. The Leviathan
টমাস হবসের 'লেভিয়াথান' (Leviathan) রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী গ্রন্থ। ১৬৫১ সালে প্রকাশিত এই বইটি আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। নিচে আপনার চাওয়া অনুযায়ী বইটির প্রেক্ষাপট এবং অধ্যায়ভিত্তিক সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো:
১. লেখকের পরিচিতি ও বইটির প্রেক্ষাপট
টমাস হবস (১৫৮৮–১৬৭৯):
জন্ম ও বেড়ে ওঠা: হবস ১৫৮৮ সালে ইংল্যান্ডের মালমেসবারিতে এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের সময় ইংল্যান্ডে স্প্যানিশ আর্মাডার আক্রমণের আতঙ্ক বিরাজ করছিল। হবস মজা করে বলতেন, "আমার মা যমজ সন্তান প্রসব করেছিলেন: আমাকে এবং ভয়কে।" এই 'ভয়' তাঁর দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষালাভ করেন এবং দীর্ঘ সময় ক্যাভেন্ডিশ পরিবারের গৃহশিক্ষক ও সচিব হিসেবে কাজ করেন।
বইটির প্রকাশ: ১৬৪২ সালে ইংল্যান্ডে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয় (রাজতন্ত্রী বনাম সংসদীয় বাহিনী)। এই অরাজকতা হবসকে ভীষণভাবে বিচলিত করে। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন ছাড়া মানুষ শান্তিতে থাকতে পারে না। নির্বাসনে থাকাকালীন তিনি 'লেভিয়াথান' লেখা শুরু করেন এবং ১৬৫১ সালে এটি লন্ডনে প্রকাশিত হয়।
নামের সার্থকতা: 'লেভিয়াথান' হলো বাইবেলে বর্ণিত এক বিশাল সামুদ্রিক দানব। হবস রাষ্ট্রকে এই দানবের সাথে তুলনা করেছেন, যা অরাজকতা রুখতে এবং শান্তি বজায় রাখতে অসীম ক্ষমতা সম্পন্ন।
২. 'লেভিয়াথান' এর অধ্যায়ভিত্তিক সামারি
বইটি মূলত ৪টি খণ্ডে বিভক্ত:
প্রথম খণ্ড: মানুষের প্রকৃতি (Of Man)
এখানে হবস রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনার আগে মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন।
প্রকৃতির রাজ্য (State of Nature): হবস মনে করেন, রাষ্ট্র বা সমাজ গঠনের আগে মানুষ ছিল 'প্রকৃতির রাজ্যে'। সেখানে কোনো আইন ছিল না, ছিল কেবল পেশিশক্তি। মানুষের জীবন ছিল "নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, ঘৃণ্য, পাশবিক এবং ক্ষণস্থায়ী" (solitary, poor, nasty, brutish, and short)।
প্রাকৃতিক আইন: মানুষ এই যুদ্ধের অবস্থা থেকে বাঁচতে চায়। তাই বুদ্ধির মাধ্যমে তারা বুঝতে পারে যে, টিকে থাকার জন্য শান্তি দরকার। এই তাড়না থেকেই তারা নিজেদের অধিকার বিসর্জন দিয়ে রাষ্ট্র গঠনে রাজি হয়।
দ্বিতীয় খণ্ড: রাষ্ট্রদেহ (Of Commonwealth)
এটি বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে সামাজিক চুক্তির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক চুক্তি: মানুষ একে অপরের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় যে—"আমি নিজেকে শাসন করার অধিকার এই ব্যক্তির (শাসক) হাতে তুলে দিচ্ছি, এই শর্তে যে তুমিও তোমার অধিকার একইভাবে ত্যাগ করবে।"
লেভিয়াথান বা সার্বভৌম শাসক: এই চুক্তির ফলে যে শাসক জন্ম নেয়, সে হলো 'লেভিয়াথান'। তার ক্ষমতা হবে নিরঙ্কুশ ও অবিভাজ্য। সে আইনের ঊর্ধ্বে, কারণ সে নিজেই আইনের স্রষ্টা। তার প্রধান কাজ হলো জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তৃতীয় খণ্ড: খ্রিস্টীয় রাষ্ট্র (Of a Christian Commonwealth)
এখানে হবস ধর্ম এবং রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন।
তিনি দাবি করেন, চার্চ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের অধীনে থাকবে। সার্বভৌম শাসকের ইচ্ছাই হবে সর্বোচ্চ ধর্মীয় ব্যাখ্যা। ধর্মের দোহাই দিয়ে কেউ যাতে রাষ্ট্রের অবাধ্য না হয়, তিনি সেই পথ বন্ধ করতে চেয়েছিলেন।
চতুর্থ খণ্ড: অন্ধকারের রাজত্ব (Of the Kingdom of Darkness)
এখানে তিনি ভুল ধর্মীয় বিশ্বাস এবং স্বার্থান্বেষী পুরোহিতদের সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করতেন, কুসংস্কার এবং ভুল দর্শন মানুষকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উসকে দেয়, যা সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।
৩. সার্বিক সামারি ও মূল বক্তব্য
'লেভিয়াথান' বইটির মূল বার্তা হলো—মানুষ জন্মগতভাবে স্বার্থপর এবং ক্ষমতার লোভী। যদি তাদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো শক্তিশালী 'লেভিয়াথান' বা সার্বভৌম শক্তি না থাকে, তবে সমাজ যুদ্ধে লিপ্ত হবে। তাই নিরাপত্তার বিনিময়ে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া এবং একজন শাসকের প্রতি অনুগত থাকা বুদ্ধিমানের কাজ।
৪. রুশোর সাথে প্রধান পার্থক্য
আপনি যেহেতু রুশো এবং হবস নিয়ে আগ্রহী, তাই এই পার্থক্যটি জানা জরুরি:
হবসের চুক্তি: মানুষ ভয়ে নিজের অধিকার শাসকের হাতে তুলে দেয়। শাসকই সার্বভৌম।
রুশোর চুক্তি: মানুষ নিজের অধিকার নিজেদের (জনগণের) হাতে তুলে দেয়। সাধারণ ইচ্ছাই (General Will) সার্বভৌম।
উপসংহার: হবস ছিলেন নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের সমর্থক (নিরাপত্তার জন্য), আর রুশো ছিলেন গণতন্ত্রের পথপ্রদর্শক (স্বাধীনতার জন্য)। তবে দুজনেরই মিল হলো—উভয়েই রাষ্ট্রকে একটি "চুক্তি"র ফসল মনে করতেন।