ফরেন পলিসি সংক্রান্ত চাণক্য’র ৬ নীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর ব্যবহার (১৮)

প্রশ্নঃ বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যমান দুটি দল হচ্ছে বিএনপি ও এনসিপি-জামায়াত জোট । বিরোধী দল হিসাবে এনসিপি-জামায়াত জোট এই বৈদেশিক পলিসির ৬টি গুণাবলীকে কিভাবে দেশের অন্তঃদেশীয় রাজনীতিতে কাজে লাগাতে পারে, তার একটি তুলনামূলক আলোচনা কি করা যায়?

চাণক্যের অর্থশাস্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ‘ষড়গুণ্য’ (Six-fold Policy) বা বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ছয়টি কৌশল। চাণক্যের মতে, একজন শাসক বা বিজিগীষু (বিজয় লাভে ইচ্ছুক রাজা) তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর শক্তির হ্রাস-বৃদ্ধি বিবেচনা করে এই ছয়টি গুণের যেকোনো একটি বা একাধিক প্রয়োগ করবেন।

নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. সন্ধি (Peace Treaty/Alliance)

যখন কোনো শাসক দেখেন যে তার নিজের শক্তি শত্রুর তুলনায় কম এবং যুদ্ধের ফলে জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ, তখন তিনি 'সন্ধি' বা শান্তি চুক্তির পথ বেছে নেবেন।

  • উদ্দেশ্য: নিজের শক্তি সঞ্চয় করা এবং শত্রুকে শান্ত রাখা।

  • প্রয়োগ: এটি কেবল আত্মসমর্পণ নয়, বরং প্রতিকূল সময়ে টিকে থাকার একটি কৌশলগত বিরতি।

২. বিগ্রহ (Hostility/War)

যদি শাসক অনুভব করেন যে তিনি শত্রুর চেয়ে সামরিক ও আর্থিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং আক্রমণ করলে বিজয় সুনিশ্চিত, তবে তিনি 'বিগ্রহ' বা শত্রুতা ঘোষণা করবেন।

  • উদ্দেশ্য: শত্রুর এলাকা দখল বা প্রভাব বিস্তার।

  • প্রয়োগ: সরাসরি যুদ্ধ বা ছায়াযুদ্ধের মাধ্যমে শত্রুকে দুর্বল করা।

৩. যান (Expedition/Mobilization)

শত্রুর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা না করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা এবং সীমান্তের দিকে অগ্রসর হওয়াকে 'যান' বলা হয়।

  • উদ্দেশ্য: শত্রুর ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা এবং আক্রমণের উপযুক্ত মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করা।

  • প্রয়োগ: সামরিক কুচকাওয়াজ বা কৌশলগত অবস্থানে সৈন্য মোতায়েন।

৪. আসন (Neutrality/Wait and Watch)

যখন নিজের এবং শত্রুর শক্তি প্রায় সমান থাকে এবং যুদ্ধ করলে উভয়েরই অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তখন 'আসন' বা নিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণ করা হয়।

  • উদ্দেশ্য: পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং কোনো পক্ষ না নিয়ে নিজের অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধি করা।

  • প্রয়োগ: 'ধৈর্যশীল অপেক্ষা'—যাতে শত্রু আগে ভুল পদক্ষেপ নেয়।

৫. দ্বৈধীভাব (Double-dealing/Duplicity)

এটি একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম কূটনৈতিক চাল। এতে শাসক একদিকে সন্ধি বা মৈত্রীর অভিনয় করেন এবং অন্যদিকে ভেতরে ভেতরে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন অথবা এক শত্রুর বিরুদ্ধে অন্য শত্রুর সাথে গোপনে আঁতাত করেন।

  • উদ্দেশ্য: শত্রুকে বিভ্রান্ত রাখা এবং নিজের স্বার্থ হাসিল করা।

  • প্রয়োগ: প্রকাশ্যে শান্তি বজায় রাখা কিন্তু গোপনে শত্রুর ক্ষতি সাধন করা।

৬. সমাশ্রয় (Seeking Protection)

যদি কোনো শাসক অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েন এবং শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচার কোনো উপায় না থাকে, তবে তিনি অন্য কোনো শক্তিশালী বা সামর্থ্যবান রাজার আশ্রয় গ্রহণ করবেন।

  • উদ্দেশ্য: অস্তিত্ব রক্ষা করা।

  • প্রয়োগ: কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি করা বা বড় কোনো জোটের সদস্য হওয়া।

বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে এর প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে চাণক্যের এই ষড়গুণ্য নীতিকে 'রিয়েলিজম' বা বাস্তববাদের আদি রূপ বলা হয়।

  • ভারসাম্য রক্ষা: বর্তমান বিশ্বে ছোট ও মাঝারি দেশগুলো বড় শক্তিগুলোর সাথে 'সমাশ্রয়' বা 'আসন' নীতি ব্যবহার করে টিকে থাকে।

  • কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন: কোনো দেশের সাথে অর্থনৈতিক স্বার্থে 'সন্ধি' এবং আবার কৌশলগত স্বার্থে 'দ্বৈধীভাব' বজায় রাখা আধুনিক কূটনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সারকথা: চাণক্যের মতে, একজন সফল শাসকের কোনো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু থাকে না; বরং পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এই ছয়টি কৌশলের সঠিক প্রয়োগই হলো আসল রাজধর্ম।

 

অন্তঃদেশীয় জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই নীতির ব্যবহার


চাণক্যের 'ষড়গুণ্য' নীতি মূলত বৈদেশিক বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের জন্য রচিত হলেও, আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে অন্তঃদেশীয় জটিল রাজনৈতিক মেরুকরণ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি (প্রধান) বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপি বা জামায়াতে ইসলামী কীভাবে এই ৬টি গুণকে তাদের অভ্যন্তরীণ কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, তার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:

১. সন্ধি (শান্তি বা সমঝোতা)

চাণক্যের মতে, নিজের শক্তি কম থাকলে শত্রুর সাথে সাময়িক সমঝোতা করা বুদ্ধিমানের কাজ।

  • প্রয়োগ: জামায়াত বর্তমানে বড় দলগুলোর (যেমন বিএনপি বা অন্যান্য জোট) সাথে আসন ভাগাভাগি বা নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের ইস্যুতে 'সন্ধি' বা ঐক্যজোটের নীতি গ্রহণ করতে পারে। এটি তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা এবং বড় আন্দোলনের অংশীদার হতে সাহায্য করে।


২. বিগ্রহ (শত্রুতা বা প্রতিবাদ)

যখন রাজনৈতিক শক্তি তুঙ্গে থাকে, তখন রাজপথে বা আদর্শিক লড়াইয়ে সরাসরি অবতীর্ণ হওয়া।

  • প্রয়োগ: সরকারের বিভিন্ন নীতি বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যখন জনমত প্রবল থাকে, তখন জামায়াত তাদের দলীয় শক্তিতে রাজপথে কর্মসূচি বা আন্দোলনের ডাক দেয়। এটি তাদের কর্মীদের সক্রিয় রাখতে এবং জনসমর্থন প্রমাণের একটি উপায়।


৩. যান (প্রস্তুতি বা যাত্রা)

সরাসরি সংঘাত না করে নিজের সাংগঠনিক শক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

  • প্রয়োগ: নির্বাচনের আগে মাঠ পর্যায়ে কমিটি গঠন, সদস্য সংগ্রহ এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে জনভিত্তি শক্ত করা। চাণক্যের ভাষায় এটি হলো 'আক্রমণের উপযুক্ত মুহূর্তের অপেক্ষা'।


৪. আসন (নিরপেক্ষতা বা নীরবতা)

কৌশলগত কারণে অনেক সময় রাজনৈতিক নীরবতা পালন করা।

  • প্রয়োগ: দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল (যেমন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) যখন কোনো ইস্যুতে সরাসরি দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকে, তখন জামায়াত কোনো পক্ষ না নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এতে তারা বড় ধরনের আইনি বা প্রশাসনিক চাপ এড়িয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে।


৫. দ্বৈধীভাব (দ্বিমুখী নীতি বা কূটকৌশল)

একই সাথে একাধিক কৌশল প্রয়োগ করা—একদিকে মিত্রতা, অন্যদিকে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান।

  • প্রয়োগ: বিএনপির সাথে জোটে থেকেও জামায়াত অনেক সময় এককভাবে কর্মসূচি পালন করে। এটি একটি দ্বিমুখী কৌশল; যাতে জোটের সুবিধা নেওয়া যায় আবার দলের নিজস্ব পরিচয় বা 'ব্র্যান্ডিং' হারিয়ে না যায়। এটি তাদের দর কষাকষির ক্ষমতা (Bargaining Power) বাড়িয়ে দেয়।


৬. সমাশ্রয় (আশ্রয় বা জোটবদ্ধ হওয়া)

নিজে যখন এককভাবে প্রভাব বিস্তারে অক্ষম, তখন বড় শক্তির আশ্রয় নেওয়া।

  • প্রয়োগ: বর্তমান বাংলাদেশের দ্বিদলীয় বলয়ে জামায়াত এককভাবে ক্ষমতায় আসার চেয়ে একটি বড় রাজনৈতিক মোর্চার (যেমন ২০ দলীয় জোট বা বর্তমান যুগপৎ আন্দোলন) ছায়াতলে থাকা নিরাপদ মনে করে। এতে রাষ্ট্রীয় চাপ মোকাবিলা করা সহজ হয়।


একটি তুলনামূলক ছক

চাণক্যের নীতি মূল দর্শন রাজনৈতিক প্রয়োগ কৌশল এনসিপি বা জামায়াতের সম্ভাব্য ভূমিকা/উদাহরণ
১. সন্ধি শান্তি বা চুক্তি জোট গঠন ও সমঝোতা বিএনপি বা সমমনা দলগুলোর সাথে যুগপৎ আন্দোলনের চুক্তি বা আসন ভাগাভাগি।
২. বিগ্রহ সংঘাত বা যুদ্ধ রাজপথের আন্দোলন দাবি আদায়ে সরকারের বিরুদ্ধে হরতাল, বিক্ষোভ বা সরাসরি রাজনৈতিক কর্মসূচি।
৩. যান প্রস্তুতি বা যাত্রা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মহড়া নির্বাচনের আগে তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি গঠন, সদস্য সংগ্রহ এবং শক্তির মহড়া দেওয়া।
৪. আসন নিরপেক্ষতা কৌশলগত নীরবতা বিশেষ কোনো সংঘাতময় পরিস্থিতিতে নিজেদের নিরাপদ রাখতে সাময়িকভাবে জনসমক্ষে না আসা।
৫. দ্বৈধীভাব দ্বিমুখী নীতি স্বতন্ত্র বজায় রাখা জোটের অংশ হয়েও নিজেদের দলীয় আদর্শ ও আলাদা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া।
৬. সমাশ্রয় আশ্রয় গ্রহণ বড় শক্তির সাথে থাকা রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও আইনি সুরক্ষা পেতে বড় কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের ছায়াতলে থাকা।


চাণক্য নীতির সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা

চাণক্যের এই নীতিগুলো মূলত 'রাষ্ট্রীয় স্বার্থ' রক্ষার জন্য ছিল। তবে অন্তঃদেশীয় রাজনীতিতে যখন কোনো দল এগুলো প্রয়োগ করে, তখন তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ থাকে 'জনগণের গ্রহণযোগ্যতা'। চাণক্য নিজেও বলেছিলেন, রাজার (বা নেতার) সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের তুষ্টি। জামায়াত বা যেকোনো দল যদি এই ৬টি গুণ কেবল কৌশলের জন্য ব্যবহার করে এবং জনকল্যাণকে গুরুত্ব না দেয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য পাওয়া কঠিন হতে পারে।

পিডিএফ ডাউনলোড করুন

Previous
Previous

চাণক্যের 'মন্ডল তত্ত্ব' ও স্পাইডার-ওয়েব তত্ত্ব: একটি তুলনামূলক ছক(১৯)

Next
Next

বিশ্লেষণঃ ৩০০ সংসদীয় আসন কী বেশি না কম? (১৭)