নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং- কী, কেন, কিভাবে? (৭)

এই কোর্সের জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং গবেষণাধর্মী রচনা নিচে দেওয়া হলো। এটি এমনভাবে লেখা হয়েছে যাতে প্রশিক্ষণার্থী রাজনৈতিক নেতারা কেবল তথ্য নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতার "Nuances" বা সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচগুলোও বুঝতে পারেন।

গণতন্ত্রের হৃদস্পন্দন হলো নির্বাচন। কিন্তু যখন এই নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সুকৌশলে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনুকূলে নেওয়ার জন্য কারিগরি, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ ব্যবহার করা হয়, তাকেই বলা হয় "ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং" বাংলাদেশে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং কেবল ভোটের দিনের কারচুপি নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। একজন রাজনৈতিক নেতার জন্য এটি বোঝা অপরিহার্য—কেবল নির্বাচনে জেতার জন্য নয়, বরং জনগণের সত্যিকারের ম্যান্ডেট রক্ষার জন্য।

১) ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং কী?

সহজ কথায়, ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং হলো নির্বাচনের স্বাভাবিক ফলাফলকে কৃত্রিমভাবে বদলে দেওয়ার একটি বিজ্ঞানসম্মত কৌশল। এটি কেবল ব্যালট বাক্স ছিনতাই নয়; বরং ভোটারদের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ, আইন সংশোধন, সীমানা নির্ধারণ এবং নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার একটি সামগ্রিক কাঠামো।

২) কেন করা হয় এই ইঞ্জিনিয়ারিং?

১. ক্ষমতার ধারাবাহিকতা রক্ষা: জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়লেও রাষ্ট্রক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য শাসকগোষ্ঠী এই পথ বেছে নেয়।

২. গণতান্ত্রিক বৈধতার মুখোশ: সরাসরি স্বৈরতন্ত্রের বদলে নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে বিশ্ব দরবারে নিজেদের "গণতান্ত্রিক" হিসেবে জাহির করা।

৩. প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা: নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় দেখিয়ে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তিকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া এবং জনবিচ্ছিন্ন করা।

৪. স্বার্থান্বেষী আমলাতন্ত্র: অনেক সময় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের পদোন্নতি বা সুবিধা রক্ষার জন্য রাজনৈতিক দলের হয়ে এই ইঞ্জিনিয়ারিং পরিচালনা করে।

৩)ভোট রিগিং-কীভাবে?

বাংলাদেশে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং প্রধানত তিনটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়:

১. প্রাক-নির্বাচনী পর্যায় (Pre-Poll Engineering)

  • সীমানা নির্ধারণ (Gerrymandering): এমনভাবে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা যাতে প্রতিপক্ষের ভোট ব্যাংক ভেঙে যায়।

  • মামলা ও দমন-পীড়ন: বিরোধী দলের সক্রিয় নেতা-কর্মীদের নামে কাল্পনিক বা "গায়েবি" মামলা দিয়ে তাদের মাঠছাড়া করা।

  • প্রশাসনিক রদবদল: নির্বাচনের আগে নিজেদের অনুগত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ জেলা ও থানায় পোস্টিং দেওয়া।

  • দলীয় নিবন্ধন বাতিল বা নিবন্ধন না দেয়াঃ

    যে সকল বিষয়ে ডিপ স্টেটের বা বিদ্যমান সরকারের ‘না-বাচক’ সিদ্ধান্ত থাকে তাদেরকে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন দেয়া হয়না। আবার পূর্বের নিবন্ধিত দল হলে তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হয়। এক্ষেত্রে মিডিয়া বা প্রেসার গ্রুপ তৈরি করে সে দলের বিরুদ্ধে মিছিল মিটিং করানো হয় এবং সে দলের বিপক্ষে নানান অভিযোগ আনা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে আদালতে কাঠগড়ায় নিয়ে আদালতের মাধ্যমে হ্যারাসমেন্ট করানো হয়,

২. নির্বাচনের দিন ( Poll / Election Day Engineering)

  • এজেন্ট বিতাড়ন: কেন্দ্র থেকে বিরোধী দলের এজেন্টদের ভয় দেখিয়ে বা জোরপূর্বক বের করে দেওয়া। এজেন্ট না থাকা মানেই হলো কারচুপির দরজা খুলে যাওয়া।

  • বুথ জ্যামিং ও সাইলেন্ট ভোট: কৃত্রিম লাইন তৈরি করে আসল ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়া এবং ভেতরে বসে সাইলেন্টলি ব্যালটে সিল মারা।

  • রাতের ভোট (Night Voting): পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় ভোটের আগের রাতেই নির্দিষ্ট পরিমাণ ব্যালট বক্সে ভরে রাখা।

  • ইভিএম ম্যানিপুলেশন: ইভিএম-এর অডিট কার্ড বা ডিজিটাল ডিসপ্লেতে কারিগরি কারসাজি করা।

৩. ফলাফল ঘোষণার পর্যায় (Post-Poll Engineering)

  • ফলাফল পরিবর্তন (Tabulation Magic): কেন্দ্র থেকে আসা মূল ফলাফলের (Form-XVI) সংখ্যা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে যোগ করার সময় বদলে দেওয়া।

  • ঘোষণা বিলম্বিত করা: ফলাফল ঘোষণায় অনাবশ্যক দেরি করে মাঝখানের সময়ে সংখ্যায় হেরফের করা।

পোস্ট-পোল ভোট রিগিং এর কিছু চালেঞ্জঃ

প্রেক্ষাপটঃ

ক) সময়ের হিসাবঃ

  • প্রতিটি বুথে গড়ে ৬০০-৮০০ ভোটার ভোট দেয়ার জন্য নির্ধারণ করা থাকে।

  • যদি গড়ে ৬৫% ভোটার উপস্থিত থাকে তাহলে ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায়- ৪২০ থেকে ৫৬০ জন।

  • এই দুটি সংখ্যার গড় দাঁড়ায়- ৪৯০ জন; অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, গড়ে প্রতিটি কেন্দ্রে ন্যুনতম ভোটার উপস্থিতি থাকে ৫০০ জন।

  • ভোট গ্রহণের মোট সময় থাকে ৮ ঘন্টা বা ৪৮০ মিনিট।

  • এর মধ্যে কিছু সময় সিস্টেম লস হয়- কমপক্ষে ১ ঘন্টা বা ৬০ মিনিট

  • কার্যকর সময় থাকে- ৭ ঘন্টা বা ৪২০ মিনিট।

  • প্রতিটি ভটের জন্য গড় পড়তা সময় পাওয়া যায় - ৫৩ সেকেন্ড; সর্বোচ্চ ১ মিনিট।

  • বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, একজন ভোটার গড়ে সময় পায় ১ মিনিট থেকে সর্বোচ্চ ২ মিনিট।

  • কিন্তু যেখানে ভোটারের সংখ্যা বেশি এবং উপস্থিতিও বেশি সেখানে ৪৫ থেকে ৫৫ সেকেন্ড করে সময় পায় একজন ভোটার।

খ) পোলিং অফিসার ও পোলিং এজেন্টঃ

একটি ভোট কক্ষে ভোট গ্রহণের জন্য থাকে পোলিং অফিসার ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার। পোলিং অফিসাররা ভোটারের সত্যতা নিশ্চিত করে, এবং ভোটার লিস্ট এর সাথে তাদের নাম মিলিয়ে দেখে এবং অমোচনীয় কালি আংগুলে লাগিয়ে থাকে। প্রতিটি বুথে ৩ জন সরকারি ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তা কর্মচারী সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকে । অন্যদিকে, পোলিং এজেন্টরা দূরে থেকে ভোটারের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পোলিং অফিসারদের সহায়তা করে থাকে।

গ) সময় স্বল্পতাঃ

  • নির্বাচনের দিনে ৩ ধাপের গুত্বপুর্ণ কাজ হচ্ছে- ভোট গণনা। এই ভোট গননাসম্পন্ন হয়ে থাকে নিম্নোক্ত ধাপেঃ

    • গ-১) সকল বুথ থেকে ভোট বাক্স একটি রুমে নিয়ে আসা হয়।

    • গ-২) রুমে সকল বাক্সের ব্যালট ঢেলে একত্রিত করা হয়।

    • গ-৩) এরপর পোলিং অফিসাররা প্রতীক ভেদে সেগুলো আলাদা আলাদা করেন।

    • গ-৪) ব্যালটগুলো একটি সেটসেট করে একত্র করা হয়। সাধারণ কটি সেটে ১০০ করে ব্যালট রাখা হয়।

    • গ-৫) নষ্ট ব্যালট গুলো আলাদা করা হয়। সেগুলোও ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সেটে বিন্যস্ত করা হয়।

    • গ-৬) ফলাফল শিট প্রস্তুত করা হয়; স্বাক্ষর করা হয়; এবং এজেন্টদেরকে দেয়া হয়।

    • গ-৭) সকল ডকুমেন্টস স্বাক্ষর করা হয়, এবং সকল কে তাদের প্রাপ্য টাকা পয়সা দেয়া হয়।

    • গ-৮) সকল জিনিসপত্র নিয়ে প্রিজাইডিং অফিসার উপজেলা পর্যায়ে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে ফলাফল শিট জমা দেয় এবং উপজেলা নির্বাচন অফিসারের কার্যালয়ে ভোট সংক্রান্ত নানান জিনিসপত্র ফেরত দেয়।

    • গ-৯) এ ফলাফল শিট সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ের কন্ট্রোল রুমে সকলকে পড়ে শোনানো হয়, এবং সকল ফলাফল একত্রিত করে শোনানো হয়, এবং চুড়ান্ত ফলাফল করা হয়।

ঘ) সংসদীয় আসনের ফলাফল ঘোষণা :

১) একটি উপজেলাবিশিষ্ট আসনঃ ফলাফল একত্রিত করে জেলায় রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে ঘোষণা করা হয়।

২) একাধিক উপজেলা বিশিষ্ট আসনঃ স্ব স্ব উপজেলার ফলাফল জেলায় পাঠানো হয়।

৩) রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ঃ আপাত চুড়ান্ত বেসরকারী ফলাফল রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে করা হয়।

৪) বেসরকারী ফলাফলঃ চূড়ান্ত বেসুরকারী ফলাফল নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয়।

৫) সরকারী ফলাফলঃ নির্বাচনী কমিশনের কার্যালয় থেকে বেসরকারী ফলাফল সরকারী গেজেটে প্রকাশের জন্য প্রেরণ করা হয়। এই গেজেট প্রকাশিত হলেই তাকে সরকারী ফলাফল বলা হয়।

উপসংহার

ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং গণতন্ত্রের জন্য একটি মরণব্যাধি। এটি কেবল একটি দলের জয় বা পরাজয় নির্ধারণ করে না, বরং দেশের সাধারণ মানুষের ভোটের ওপর থেকে আস্থা কেড়ে নেয় "Political Nuances: The Essentials of Strategic Leadership" কোর্সের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক নেতৃত্ব তৈরি করা, যারা এই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চক্রব্যূহ ভেদ করে জনগণের সত্যিকারের অধিকার ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে।

Previous
Previous

জনগণের সার্বভৌমত্ব বনাম স্রষ্ট্রার সার্বভৌমত্বের সমাধান (৮)

Next
Next

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণঃ নির্বাচন ও ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং এর অভিযোগ