জননীতি সংশ্লিষ্ট ০৫টি তত্ত্ব (৭)
রাষ্ট্রীয় পলিসি বা জননীতি বিশ্লেষণের জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং লোকপ্রশাসনবিদগণ বিভিন্ন তাত্ত্বিক কাঠামো ব্যবহার করেন। এই তত্ত্বগুলো মূলত ব্যাখ্যা করে যে, কেন এবং কীভাবে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রভাবক হিসেবে কারা কাজ করে।
নিচে প্রধান ৫টি তত্ত্ব বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. এলিট থিওরি (Elite Theory)
এই তত্ত্বের মূল কথা হলো—একটি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ সাধারণ মানুষের দ্বারা হয় না, বরং সমাজের একটি ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিশালী উচ্চবিত্ত বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী (Elites) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
মূল বক্তব্য: আমলা, রাজনীতিবিদ, কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব এবং সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মিলে নীতি প্রণয়ন করেন। সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়া এখানে গৌণ।
প্রয়োগ: যখন কোনো পলিসি কেবল বৃহৎ শিল্পপতিদের সুবিধা দেয় বা সাধারণ জনগণের স্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা রক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়।
২. প্লুরালিস্ট থিওরি বা বহুত্ববাদী তত্ত্ব (Pluralist Theory)
এলিট থিওরির বিপরীতে এই তত্ত্ব বলে যে, সমাজে অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী আছে (যেমন: এনজিও, ট্রেড ইউনিয়ন, মিডিয়া, সিভিল সোসাইটি)।
মূল বক্তব্য: পলিসি হলো এই বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর মধ্যে দরকষাকষির (Bargaining) ফল। সরকার এখানে একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী (Mediator) হিসেবে কাজ করে।
প্রয়োগ: যখন কোনো শ্রম আইন বা পরিবেশ আইন প্রণয়নের আগে সরকার শ্রমিক ইউনিয়ন এবং মালিক পক্ষ—উভয়ের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়।
৩. ইনক্রিমেন্টালিজম বা ক্রমবর্ধমান তত্ত্ব (Incrementalism)
চার্লস লিন্ডব্লম (Charles Lindblom) এই তত্ত্বের প্রবক্তা। একে অনেক সময় "Muddling Through" বা অল্প অল্প পরিবর্তন বলা হয়।
মূল বক্তব্য: সরকার হঠাৎ করে কোনো বড় বা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে না। বরং বিদ্যমান নীতিতে ছোট ছোট পরিবর্তন বা সংস্কারের মাধ্যমেই নতুন নীতি তৈরি হয়।
প্রয়োগ: বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন। প্রতি বছর বাজেটের কাঠামো প্রায় একই থাকে, কেবল গত বছরের তুলনায় কিছু বরাদ্দ বাড়ানো বা কমানো হয়।
৪. র্যাশনাল চয়েস থিওরি (Rational Choice Theory)
এটি অর্থনৈতিক তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এখানে মনে করা হয় যে, প্রতিটি নীতিনির্ধারক একজন "যুক্তিবাদী মানুষ" (Rational Actor)।
মূল বক্তব্য: সরকার বা ব্যক্তি সেই নীতিটিই গ্রহণ করবে যাতে খরচ সবথেকে কম কিন্তু লাভ (Utility) সবথেকে বেশি। এটি মূলত Cost-Benefit Analysis-এর তাত্ত্বিক রূপ।
প্রয়োগ: বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প (যেমন: পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেল) যেখানে অর্থনৈতিক রিটার্ন দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
৫. গেম থিওরি (Game Theory)
এই তত্ত্বটি মূলত নীতিনির্ধারণকে একটি প্রতিযোগিতামূলক খেলা হিসেবে দেখে।
মূল বক্তব্য: একটি নীতির সাফল্য নির্ভর করে অন্য পক্ষ (যেমন: অন্য দেশ বা অন্য রাজনৈতিক দল) কী করবে তার ওপর। প্রতিটি পক্ষই চায় এমন চাল দিতে যাতে তার নিজের লাভ সর্বোচ্চ হয়।
প্রয়োগ: পররাষ্ট্রনীতি বা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে এই তত্ত্বের ব্যবহার বেশি দেখা যায়।
তত্ত্বগুলোর তুলনামূলক সারসংক্ষেপ
| তত্ত্বের নাম | ফোকাস (দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে যেখানে) | পলিসি কীভাবে নির্ধারিত হয়? |
|---|---|---|
| এলিট থিওরি | মুষ্টিমেয় শক্তিশালী গোষ্ঠী। | উপর থেকে নিচে (Top-Down)। |
| প্লুরালিস্ট থিওরি | বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। | দরকষাকষি ও সমঝোতার মাধ্যমে। |
| ইনক্রিমেন্টালিজম | বর্তমান পরিস্থিতি (Status Quo)। | ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে। |
| র্যাশনাল থিওরি | দক্ষতা ও সর্বোচ্চ লাভ। | গাণিতিক বা যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে। |
| গেম থিওরি | কৌশলগত প্রতিযোগিতা। | প্রতিপক্ষের চাল মাথায় রেখে। |
বিশেষ সংযোজন: ২০২৬-এর আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি
বর্তমানে 'অ্যাডভোকেসি কোলিশন ফ্রেমওয়ার্ক' (ACF) নামক একটি তত্ত্ব খুব জনপ্রিয়। এটি বলে যে, পলিসি কেবল ক্ষমতা দিয়ে হয় না, বরং বিশ্বাস (Belief systems) দিয়ে হয়। সমমনা কিছু মানুষ ও গোষ্ঠী মিলে একটি জোট গঠন করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতে পলিসি পরিবর্তনের চেষ্টা করে (যেমন: জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বৈশ্বিক জোট)।
একজন গবেষক বা নীতিনির্ধারক হিসেবে আপনি কোন তত্ত্বটিকে বর্তমান প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে বেশি কার্যকর মনে করছেন?