2.Female MPs: Philosophy and Objective

সংরক্ষিত নারী আসনের ধারণাটি মূলত 'ইতিবাচক বৈষম্য' (Positive Discrimination) বা 'অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন' (Affirmative Action) নীতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এর মূল দর্শন এবং লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:


১. মূল দর্শন: ঐতিহাসিক ক্ষতিপূরণ ও সমতা

সংরক্ষিত আসনের মূল দর্শন হলো এই স্বীকৃতি দেওয়া যে, নারী ও পুরুষ ঐতিহাসিকভাবে সমান সুযোগ নিয়ে যাত্রা শুরু করেনি। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এবং সামাজিক বাধার কারণে নারীরা রাজনীতির মূলধারায় পিছিয়ে ছিল।

  • লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি: দৌড় প্রতিযোগিতায় একজনকে ১০০ মিটার আগে এবং অন্যজনকে ১০০ মিটার পেছনে রেখে শুরু করলে যেমন ফলাফল ন্যায়সঙ্গত হয় না, তেমনি রাজনীতিতেও নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা না থাকলে তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না।


  • দ্রুত রূপান্তর (Fast-track Mechanism): এই দর্শন বিশ্বাস করে যে, প্রাকৃতিকভাবে বা সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে নারীর অংশগ্রহণ বাড়তে শত শত বছর লেগে যেতে পারে। কোটা পদ্ধতি সেই সময়কে কমিয়ে এনে দ্রুত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে।


২. লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ

সংরক্ষিত আসনের লক্ষ্যগুলোকে তিনটি প্রধান মাত্রায় ভাগ করা যায়:


ক. প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা (Descriptive Representation)

  • জনসংখ্যার প্রতিফলন: জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হওয়া সত্ত্বেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের অনুপস্থিতি গণতন্ত্রের জন্য অসম্পূর্ণতা। সংরক্ষিত আসনের প্রধান লক্ষ্য হলো সংসদে নারীর একটি দৃশ্যমান উপস্থিতি নিশ্চিত করা।


  • নারীর কণ্ঠস্বর জোরালো করা: যেসব বিষয়ে নারীরা সরাসরি ভুক্তভোগী (যেমন- বাল্যবিবাহ, নারী স্বাস্থ্য, প্রজনন অধিকার), সেসব বিষয়ে যেন নারীরাই আইন প্রণয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারেন।


খ. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন (Role Model Effect)

  • নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা: সমাজ যখন নিয়মিতভাবে নারীদের সংসদ সদস্য হিসেবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে দেখে, তখন নারীর নেতৃত্ব সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বাধা বা কুসংস্কার দূর হয়।


  • নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করা: সংসদ সদস্য হিসেবে নারীদের দেখা তরুণী ও কিশোরীদের ভবিষ্যতে রাজনীতি ও পাবলিক সার্ভিস ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে অনুপ্রাণিত করে।


গ. রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও লবিং শক্তি

  • ভোটারদের সাথে সংযোগ: যদিও বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থা পরোক্ষ, কিন্তু এই আসনে আসা নারীরা তৃণমূলের নারী কর্মীদের জন্য একটি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন।


  • আইনি ও কাঠামোগত পরিবর্তন: সংসদে অন্তত নির্দিষ্ট সংখ্যক নারী সদস্য থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে নারীর স্বার্থ রক্ষাকারী আইন পাসের জন্য চাপ (Lobbying) প্রয়োগ করতে পারেন।


৩. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লক্ষ্য বনাম বাস্তবতা

বাংলাদেশের সংবিধানে (৬৫ অনুচ্ছেদ) সংরক্ষিত আসনের বিধানটি রাখা হয়েছিল যাতে করে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রেক্ষাপটে নারীদের রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়।

  • প্রাথমিক লক্ষ্য: ১৯৭৩ সালে ১০ বছর মেয়াদে এটি চালু হয়েছিল এই আশায় যে, ১০ বছর পর নারীরা সরাসরি নির্বাচনে পুরুষদের সমকক্ষ হয়ে উঠবে।


  • বর্তমান বাস্তবতা: লক্ষ্যটি ছিল একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা বা 'মই' (Ladder), কিন্তু এটি বর্তমানে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে। গবেষকদের মতে, এর লক্ষ্য এখন কেবল প্রতিনিধিত্বে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর আসন বৃদ্ধির কৌশলে পরিণত হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে।


৪. বৈশ্বিক লক্ষ্য: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৫.৫ (SDG 5.5)-এর একটি অন্যতম উদ্দেশ্য হলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের সকল স্তরে নারীদের পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্বের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। সংরক্ষিত আসন এই বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

সংরক্ষিত আসনের এই লক্ষ্যগুলো পুরোপুরি অর্জিত হতে হলে পরোক্ষ নির্বাচনের পরিবর্তে সরাসরি নির্বাচন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর থেকে নারী নেতৃত্বের বিকাশের ওপর জোর দেওয়া আবশ্যক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

 

সংরক্ষিত নারী আসনের গুরুত্ব: জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও দার্শনিক প্রেক্ষাপট

গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো প্রতিনিধিত্ব। একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী হওয়া সত্ত্বেও যদি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের অনুপস্থিতি থাকে, তবে সেই গণতন্ত্র অপূর্ণ থেকে যায়। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের ব্যবস্থা কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি ঐতিহাসিক বৈষম্য নিরসন এবং জেন্ডার সমতা অর্জনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

১. আন্তর্জাতিক আইনের সাপেক্ষে গুরুত্ব

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এখন আর কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক দায়বদ্ধতা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সনদ ও আইন সংরক্ষিত নারী আসনের মতো 'ইতিবাচক বৈষম্য' (Positive Discrimination) নীতিকে সমর্থন করে:

  • সিডও (CEDAW) সনদ ১৯৭৯: জাতিসংঘের এই সনদের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা আনার লক্ষ্যে গ্রহণ করা সাময়িকভাবে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা (যেমন- কোটা) বৈষম্য হিসেবে গণ্য হবে না। এটি মূলত রাষ্ট্রকে বাধ্য করে যেন তারা নারীদের পিছিয়ে পড়া অবস্থান থেকে টেনে তুলতে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়।

  • বেইজিং ডিক্লারেশন (১৯৯৫): বেইজিং বিশ্ব নারী সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ অন্তত ৩০% নিশ্চিত করতে হবে। সংরক্ষিত আসন এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরাসরি ভূমিকা রাখে।

  • এসডিজি (SDG): জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার লক্ষ্য ৫.৫-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনজীবনে নেতৃত্বের সকল স্তরে নারীর পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণ এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

২. জাতীয় আইনের সাপেক্ষে গুরুত্ব

বাংলাদেশের সংবিধানে সংরক্ষিত নারী আসনের ধারণাটি অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে রয়েছে গভীর আইনি ও সামাজিক দর্শন:

  • সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদ: বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বর্তমানে ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত। এটি এই বার্তা দেয় যে, রাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে চায়।

  • ২৮(৪) অনুচ্ছেদ: এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নারী বা শিশুদের অনগ্রসরতার কারণে তাদের অগ্রগতির জন্য রাষ্ট্র বিশেষ বিধান বা আইন প্রণয়ন করতে পারবে। সংরক্ষিত আসন মূলত এই সাংবিধানিক রক্ষাকবচেরই বাস্তব প্রয়োগ।

  • প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র: জাতীয় আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা সাধারণ সদস্যদের মতোই সমান মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করেন, যা সংসদীয় বিতর্কে নারীর অংশগ্রহণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

  • জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন ২০০৪ - Click the Link

৩. দার্শনিক প্রেক্ষাপট ও রেফারেন্স

সংরক্ষিত নারী আসনের গুরুত্ব বুঝতে বিভিন্ন দার্শনিক ও তাত্ত্বিক কাঠামো বিশ্লেষণ করা জরুরি:

  • ইতিবাচক বৈষম্য (Affirmative Action): দার্শনিক জন রলস তার 'Justice as Fairness' তত্ত্বে বলেছেন, সমাজে যারা সবচেয়ে বেশি সুবিধাবঞ্চিত, তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করাই হলো প্রকৃত ন্যায়বিচার। সংরক্ষিত আসন হলো এমন এক 'মই' (Ladder), যা নারীদের সামাজিক ও কাঠামোগত বাধা অতিক্রম করতে সাহায্য করে।

  • বর্ণনামূলক প্রতিনিধিত্ব (Descriptive Representation): দার্শনিক হানা পিটকিন (Hanna Pitkin)-এর মতে, প্রতিনিধির চেহারা ও পরিচয় যেন জনগণের চেহারার প্রতিফলন হয়। অর্থাৎ, নারী ভোটারদের জীবনবোধ ও সমস্যাগুলো একজন নারী প্রতিনিধি যতটা অনুধাবন করতে পারবেন, তা অন্যের পক্ষে অসম্ভব।

  • মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট ও সিমন দ্য বোভোয়ার: ওলস্টোনক্র্যাফট তার A Vindication of the Rights of Woman গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, সমাজ পরিচালনার দায়িত্ব কেবল পুরুষের নয়। সংরক্ষিত আসন মূলত বোভোয়ারের সেই 'দ্বিতীয় লিঙ্গ' (Second Sex) ধারণা থেকে নারীকে মুক্তি দিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মূল অংশীদার করার দর্শন প্রচার করে।

৪. সংরক্ষিত আসনের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব

জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের গুরুত্ব বহুবিধ:

  1. স্পেস ক্রিয়েশন: অনেক সময় পারিবারিক ও সামাজিক বাধার কারণে নারীরা সরাসরি ভোটে দাঁড়াতে পারেন না। সংরক্ষিত আসন তাদের জন্য একটি প্রাথমিক মঞ্চ তৈরি করে দেয়।

  2. নারী-বান্ধব আইন প্রণয়ন: বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন বা পারিবারিক সহিংসতার মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলোতে সংরক্ষিত নারী সদস্যরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।

  3. তৃণমূলের সাথে সংযোগ: এই আসনগুলোর মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের নারী নেত্রীরাও জাতীয় পর্যায়ে আসার সুযোগ পান, যা পুরো রাজনৈতিক কাঠামোর জেন্ডার সংবেদনশীলতা বাড়ায়।

পরিশেষে বলা যায়, সংরক্ষিত নারী আসন কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রতিনিধিত্ব নয়, বরং এটি একটি জাতির অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার পরিচয়। যদিও বর্তমানে এই আসনের নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে, তবুও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের নিরিখে এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন এই সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া নেতৃত্ব একদিন সরাসরি নির্বাচনে পুরুষদের সমকক্ষ হয়ে জনম্যান্ডেট নিয়ে সংসদে আসবে। এটি কোনো করুণা নয়, বরং ন্যায়বিচার ও সাম্যের দীর্ঘ অভিযাত্রার একটি অপরিহার্য পর্যায়।

 

বাংলাদেশে সংরক্ষিত নারী আসন বা জেন্ডার কোটা পদ্ধতি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক দেশে সংসদীয় রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কোনো না কোনো ধরনের কোটা (সংবিধানিক, আইনি বা রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ) প্রচলিত রয়েছে।

নিচে সংরক্ষিত আসন এবং জেন্ডার কোটা রয়েছে এমন কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দেশের তালিকা, সময়কাল এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রদান করা হলো:

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংরক্ষিত নারী আসনের চিত্র:

দেশের নাম কোটার ধরন চালুর সময়কাল মেয়াদ বা বর্তমান অবস্থা বিশেষ তথ্য ও দর্শন
বাংলাদেশ সংরক্ষিত আসন (সংবিধানিক) ১৯৭৩ (শুরু) ২০৪৪ সাল পর্যন্ত (সপ্তদশ সংশোধনী অনুযায়ী) শুরুতে ১৫টি আসন থাকলেও বর্তমানে তা ৫০টি। এটি দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে বণ্টিত হয়।
রুয়ান্ডা সংরক্ষিত আসন (সংবিধানিক) ২০০৩ স্থায়ী (সংবিধান অনুযায়ী) সংসদে ২৪টি আসন (৩০%) কেবল নারীদের জন্য সংরক্ষিত। বর্তমানে নারী প্রতিনিধিত্বে এই দেশ বিশ্বে শীর্ষে (প্রায় ৬১%)।
পাকিস্তান সংরক্ষিত আসন ১৯৫৬ (শুরু) স্থায়ী বিধান (সংশোধিত) বর্তমানে জাতীয় পরিষদে ৬০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত। ১৯৩৫ সালে ব্রিটিশ আমলেও এখানে সীমিত কোটা ছিল।
ভারত আইনি কোটা ২০২৪ (নতুন আইন) ১৫ বছর (প্রাথমিকভাবে) 'নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম' অনুযায়ী লোকসভা ও বিধানসভায় ৩৩% আসন সংরক্ষিত হবে। স্থানীয় সরকারে অনেক আগে থেকেই ৩৩% কোটা আছে।
আর্জেন্টিনা প্রার্থী কোটা (Legislated) ১৯৯১ স্থায়ী (২০১৭ থেকে সমতা আইন) বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৯৯১ সালে প্রার্থী মনোনয়নে ৩০% কোটা বাধ্যতামূলক করে। ২০১৭ সালে এটি বাড়িয়ে ৫০% (জেন্ডার প্যারিটি) করা হয়েছে।
ইকুয়েডর সমতা কোটা (Parity) ২০০৮ স্থায়ী এখানে দলগুলোকে ৫০% নারী প্রার্থী দিতে হয়। পর্যায়ক্রমে এটি বাড়ানোর ফলে বর্তমানে সংসদে প্রায় ৪৫% নারী রয়েছেন।
উগান্ডা সংরক্ষিত আসন ১৯৮৯ স্থায়ী প্রতিটি জেলা থেকে একজন নারী সদস্য সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। বর্তমানে প্রায় ৩২% আসন নারীদের জন্য নির্দিষ্ট।

প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও দর্শন:

১. চালুর কারণ ও দর্শন (The "Fast-track" Philosophy):

উন্নত দেশগুলোতে কয়েকশ বছর ধরে ধীরে ধীরে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলো "Fast-track" বা দ্রুত রূপান্তরের দর্শন অনুসরণ করে। এর মূল কথা হলো—সামাজিক বাধার কারণে নারীরা যাতে মূলধারার প্রতিযোগিতায় হারিয়ে না যান, তাই আইনের মাধ্যমে তাদের জন্য জায়গা নিশ্চিত করা।

২. মেয়াদ বা "সানসেট ক্লজ" (Sunset Clause):

অনেক দেশে এই কোটা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চালু করা হয় (যেমন ভারতে ১৫ বছর বা বাংলাদেশে নির্দিষ্ট মেয়াদ)। এর পেছনে যুক্তি হলো—একবার নারীরা রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করে ফেললে এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেলে পরবর্তীতে কোটার আর প্রয়োজন হবে না। তবে রুয়ান্ডা বা উগান্ডার মতো দেশে এটি স্থায়ী ব্যবস্থার অংশ।

৩. প্রার্থী কোটা বনাম সংরক্ষিত আসন:

  • সংরক্ষিত আসন (Reserved Seats): যেমন বাংলাদেশ বা রুয়ান্ডা। এখানে নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন কেবল নারীদের জন্যই রাখা হয়।

  • প্রার্থী কোটা (Candidate Quotas): যেমন আর্জেন্টিনা বা মেক্সিকো। এখানে আসন নির্দিষ্ট নয়, তবে প্রতিটি রাজনৈতিক দল যখন তাদের প্রার্থীদের তালিকা দেয়, সেখানে আইনত ৩০% থেকে ৫০% নারী প্রার্থী থাকা বাধ্যতামূলক। এটি বর্তমানে বিশ্বের অনেক আধুনিক গণতন্ত্রে জনপ্রিয় মডেল।

৪. সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ:

যেসব দেশে কোটা নেই (যেমন সুইডেন বা নরওয়ে), সেখানে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই স্বেচ্ছায় নারী প্রার্থী দেয়। কোটা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো রুয়ান্ডা এবং বলিভিয়ার মতো দেশগুলো, যেখানে কোটার কারণে সংসদে নারীর সংখ্যা পুরুষের সমান বা তার চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Brainstorming:

আপনার কি মনে হয় প্রার্থী কোটা (Candidate Quota) ব্যবস্থা বাংলাদেশের বর্তমান সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থার চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে?

 

আসিয়ান, দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্য—এই চারটি অঞ্চলেই নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য কোটা বা বিশেষ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে অঞ্চলভেদে এই ব্যবস্থার ধরণ ও প্রয়োগে ব্যাপক ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়।

নিচে অঞ্চলভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য প্রদান করা হলো:

১. দক্ষিণ এশিয়া (South Asia)

দক্ষিণ এশিয়ায় মূলত সংরক্ষিত আসন (Reserved Seats) মডেলটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। এই অঞ্চলে পপিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামো কাটিয়ে উঠতে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

  • বাংলাদেশ: জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে।

  • পাকিস্তান: জাতীয় পরিষদে ৬০টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে (যা মোট আসনের প্রায় ১৭.৫%)। এছাড়া সিনেটেও ১৭টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত।

  • ভারত: ১৯৯৩ সাল থেকে পঞ্চায়েত ও স্থানীয় সরকারে ৩৩% আসন সংরক্ষিত ছিল। ২০২৪ সাল থেকে লোকসভা ও বিধানসভাতেও ৩৩% আসন সংরক্ষণের আইন পাস হয়েছে।

  • আফগানিস্তান: তালেবান শাসনের পূর্বে দেশটিতে ২৫% আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত ছিল (বর্তমানে স্থগিত)।

  • নেপাল: সংবিধানে ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

২. আসিয়ান অঞ্চল (ASEAN)

আসিয়ান দেশগুলোতে সাধারণত সরাসরি সংরক্ষিত আসনের চেয়ে আইনি প্রার্থী কোটা (Legislated Candidate Quotas) বা রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোটা বেশি দেখা যায়।

  • ইন্দোনেশিয়া: ২০০৩ সালের আইন অনুযায়ী, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অন্তত ৩০% নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হয়।

  • ভিয়েতনাম: এখানে কোনো নির্দিষ্ট কোটা না থাকলেও ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়। বর্তমানে তাদের সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব প্রায় ৩০%।

  • ফিলিপাইন: এখানে 'পার্টি-লিস্ট' সিস্টেমে কিছু আসন সংরক্ষিত থাকে যেখানে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা দলগুলো সুযোগ পায়।

  • থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া: এই দেশগুলোতে কোনো বাধ্যতামূলক কোটা নেই, তবে দলগুলো অভ্যন্তরীণভাবে নারী সদস্য বৃদ্ধিতে কাজ করে।

৩. ইউরোপ (Europe)

ইউরোপের দেশগুলোতে সাধারণত সংবিধানিক বা আইনি বাধ্যবাধকতার চেয়ে স্বেচ্ছাসেবী দলীয় কোটা (Voluntary Party Quotas) বেশি কার্যকর। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো এই মডেলের অগ্রদূত।

  • ফ্রান্স: এখানে 'প্যারিটি ল' (Parity Law) কার্যকর আছে। দলগুলোকে নির্বাচনে সমান সংখ্যক (৫০-৫০) নারী ও পুরুষ প্রার্থী দিতে হয়, অন্যথায় আর্থিক জরিমানা করা হয়।

  • নরওয়ে ও সুইডেন: কোনো সাংবিধানিক কোটা নেই। কিন্তু বড় রাজনৈতিক দলগুলো কয়েক দশক ধরে ৫০% নারী প্রার্থীর নীতি মেনে চলায় বর্তমানে সেখানে স্বাভাবিকভাবেই নারী প্রতিনিধিত্ব অনেক বেশি।

  • বেলজিয়াম ও স্পেন: প্রার্থী তালিকায় নারী ও পুরুষের ভারসাম্য রক্ষায় কঠোর আইনি কোটা রয়েছে।

  • জার্মানি: বড় দলগুলো (যেমন- গ্রিন পার্টি বা এসপিডি) অভ্যন্তরীণভাবে কোটা ব্যবস্থা মেনে চলে।

৪. মধ্যপ্রাচ্য (Middle East)

বিগত দুই দশকে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে সংরক্ষিত আসন (Reserved Seats) পদ্ধতি গ্রহণ করেছে।

  • ইরাক: ২০০৪ সাল থেকে সংবিধানে ২৫% আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখার বিধান রয়েছে।

  • জর্ডান: ১৯৯৩ সাল থেকে কোটা পদ্ধতি শুরু হয়। বর্তমানে সংসদে নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন (প্রায় ১১%) নারীদের জন্য সংরক্ষিত।

  • সৌদি আরব: ২০১৩ সালে বাদশাহর এক আদেশে শুরা কাউন্সিলের (উপদেষ্টা পরিষদ) ২০% আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে।

  • সংযুক্ত আরব আমিরাত: ২০১৯ সাল থেকে ফেডারেল ন্যাশনাল কাউন্সিলের ৫০% আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

  • তিউনিসিয়া ও মরক্কো: উত্তর আফ্রিকার এই দেশগুলোতে প্রার্থী তালিকায় সমতা বজায় রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

অঞ্চলভিত্তিক কোটার তুলনামূলক চিত্র:

অঞ্চল প্রধানত যে মডেল দেখা যায় চালুর প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য
দক্ষিণ এশিয়া সংরক্ষিত আসন (Reserved Seats) সামাজিক বাধা ডিঙিয়ে সরাসরি সংসদে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
আসিয়ান প্রার্থী কোটা (Candidate Quotas) নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা।
ইউরোপ দলীয় কোটা (Voluntary/Legislated) জেন্ডার ইকুয়ালিটি বা সমতা নিশ্চিত করা।
মধ্যপ্রাচ্য সংরক্ষিত আসন/কোটা সংস্কারপন্থী ইমেজ তৈরি ও রাষ্ট্রীয় আধুনিকায়ন।

প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা:

ইউরোপের দেশগুলো যেখানে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সচেতনতার মাধ্যমে (Voluntary Quotas) নারীর অবস্থান নিশ্চিত করেছে, সেখানে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে আইনি বাধ্যবাধকতা বা "সংরক্ষিত আসন" ছাড়া নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো কঠিন ছিল। আসিয়ান অঞ্চল এই দুইয়ের মাঝামাঝি একটি অবস্থানে রয়েছে যেখানে দলগুলোকে নারী প্রার্থী দিতে বাধ্য করা হয়, কিন্তু আসন নিশ্চিত করা হয় না।

Brainstorming:

আপনার কি মনে হয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ইউরোপের মতো 'স্বেচ্ছাসেবী দলীয় কোটা' ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার মতো রাজনৈতিক পরিবেশ বর্তমানে তৈরি হয়েছে?


Previous
Previous

3. Reference Articles on the objective and Achievement of Female MPs in reserved Seats

Next
Next

1. Female MPs: Sources in the BD. Constitution