11. Activities of the Female MP of the Reserved Seats
সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিঃ লক্ষ্য অর্জনে সমস্যা ও সমাধান
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের সংবিধানে সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু হয়। শুরুতে ১৫টি আসন সংরক্ষিত থাকলেও বিভিন্ন সংশোধনের মাধ্যমে বর্তমানে তা বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়েছে। এসব আসনে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সদস্য নির্বাচন করা হয় না। বরং জাতীয় সংসদে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হিসাবের নিরিখে বণ্টন করা হয়। নারীদের মূলধারার রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা, নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলাই এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য।
বিদ্যমান সংরক্ষিত নারী প্রথার কাঠামোগত সমস্যাঃ
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এ ব্যবস্থার কাঠামোগত কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। প্রথমত, সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। সংসদে উপস্থিত রাজনৈতিক দলগুলো মনোনয়নের মাধ্যমে তাদের সংসদে আসার সুযোগ করে দেয়। ফলে এ সংসদ সদস্যদের জনগণের প্রতি সরাসরি জবাবদিহিতা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। যেহেতু তাদের নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক নির্বাচনী এলাকা নেই, তাই সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের সংযোগও অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ে। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক নাগরিকই জানেন না তাদের জন্য কোনো সংরক্ষিত নারী এমপি রয়েছেন কিনা। দ্বিতীয়ত, প্রার্থী মনোনয়নের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দীর্ঘদিনের অভিযোগ, রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় তৃণমূল থেকে উঠে আসা বা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় নারীদের পরিবর্তে প্রভাবশালী পুরুষ নেতাদের আত্মীয়স্বজনদের অগ্রাধিকার দেয়। ফলে দক্ষ ও অভিজ্ঞ নারী নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তৃণমূল স্তরে নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েও অনেক নারী মনোনয়ন পান না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মনোনয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবস্থানের কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলগুলো অতীতের সীমাবদ্ধতা অনেকাংশে কাটানোর চেষ্টা করেছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা, অবদান এবং জনসম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দেয়ার প্রবণতা কিছুটা বেড়েছে। নির্বাচিত সদস্যদের প্রোফাইলেও এ পরিবর্তনের আংশিক প্রতিফলন দেখা যায়। এও সত্য, এটি এখনো সর্বজনীন প্রবণতায় পরিণত হতে পারেনি।
শুধু মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা এ ব্যবস্থাকে সফল করতে যথেষ্ট নয়, বিষয়টি বোঝা জরুরি। সংরক্ষিত নারী এমপিরা যেন সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, সেজন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য। পাশাপাশি তাদের নিজস্ব ভূমিকাবোধ, নীতিনির্ধারণে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতার চর্চা আরো জোরদার করতে হবে। এ বাস্তবতা থেকেই স্পষ্ট সংরক্ষিত নারী আসন ব্যবস্থার ভেতরে সংস্কার আনা জরুরি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে এ ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে এটি আরো কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই সুশীল সমাজ, অধিকারকর্মী ও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর পাশাপাশি অনেক রাজনীতিবিদও মনে করেন, সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থার একটি বিকল্প চিন্তা করা প্রয়োজন। এ প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রস্তাব হলো সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন প্রবর্তন।
সরাসরি নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যদের প্রতি ভোটারদের আস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি। কারণ সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ নিজেরাই তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। এটি গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের একটি মৌলিক শর্ত। অনেক ভোটার মনে করেন, নারী নেতারা তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহির বিষয়ে প্রতিশ্রুতিশীল। বিশেষত নারী ভোটাররা বিশ্বাস করেন, নারী প্রতিনিধিরা তাদের অভিজ্ঞতা ও সমস্যাকে আরো গভীরভাবে বুঝতে পারেন। এ প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার একটি ফারাক রয়ে গেছে। নির্বাচনের পর নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেক সংসদ সদস্যই সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন না। উন্নয়ন কার্যক্রমও অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উপেক্ষিত থেকে যায়। এতে প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি থেকেই যায়।
নারীদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় সামাজিক ও কাঠামোগত বাধাগুলোও গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় নারীদের চলাচল, জনপরিসরে অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা এখনো নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, জনপরিসরে পুরুষদের আধিপত্য ও রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীদের কম উপস্থিতি—সব মিলিয়ে নারীদের জন্য রাজনীতির পথ আরো কঠিন হয়ে ওঠে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ প্রশ্নগুলো নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। একদিকে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন সীমিত। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে নারীর ক্ষমতায়ন এখনো প্রান্তিক ইস্যু হিসেবেই রয়ে গেছে। এ বাস্তবতায় মৌলিক প্রশ্নটি থেকেই যায় সংরক্ষিত নারী আসন ব্যবস্থা কি তার মূল উদ্দেশ্য পূরণ করতে পেরেছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ব্যবস্থা নারীদের সংখ্যাগত উপস্থিতি বাড়ালেও প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারেনি। তাই এর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে নারীদের শুধু উপস্থিতি নিশ্চিত করলেই হবে না; তাদের সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায়িত করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে নারীদের নেতৃত্ব বিকাশ, অর্থনৈতিক সহায়তা ও সামাজিক বাধা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। সংরক্ষিত আসন নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ সূচনা বা উদ্যোগ। কিন্তু সময় এসেছে এটিকে আরো কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও টেকসই ব্যবস্থায় রূপান্তরের। নারীরা যেন শুধু প্রতীকী প্রতিনিধিত্বে সীমাবদ্ধ না থেকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত আগামী দিনের লক্ষ্য। (লিঙ্ক)
সংরক্ষিত আসনের এমপিদের কাজ কী (Bangla Tribune)
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশের সংবিধানে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের কার্যপরিধি বা নির্দিষ্ট দায়িত্ব আলাদাভাবে উল্লেখ নেই। সংবিধানে শুধু সংরক্ষিত আসনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, তবে এসব আসনের সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।
সংবিধানে আলাদাভাবে দায়িত্ব নির্ধারণ না থাকায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যরা নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
গতকাল রবিবার (৩ মে) রাত ৯টার দিকে সংসদ ভবনে সংরক্ষিত আসনের এমপিদের শপথবাক্য পাঠ করান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। শপথ অনুষ্ঠানের পর এ বিষয়ে কথা বলেছেন জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি বলেন, ‘সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা নেই এবং সংবিধানেও তা নির্ধারণ করা হয়নি। তারা মূলত জাতীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ডে অংশ নেবেন, সংসদীয় কার্যক্রমে অবদান রাখবেন এবং জাতিকে উদ্বুদ্ধ করার কাজ করবেন।’
এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি যেমন ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ তদারকি এবং নারীদের ক্ষমতায়নে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন বলেও জানান তিনি।
নির্বাচিত এমপিদের সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসনের পার্থক্য কী?
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সাংবিধানিকভাবে সংসদ সদস্য হিসেবে অন্যদের মতোই সমান মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন সংরক্ষিত আসনের এমপিরা। সংসদে বিল উত্থাপন, বাজেট আলোচনা এবং ভোট দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা যেমন তাদের রয়েছে তেমনি বেতন-ভাতা, শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা এবং প্লট বরাদ্দসহ সব অধিকার একজন সাধারণ সংসদ সদস্যের মতোই সমানভাবে পান সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা।
একজন এমপির ০৪ প্রধান কাজ (বদিউল আলম মজুমদার)
আমাদের জাতীয় সংসদে ৩৪৫ জন সদস্য রয়েছেন। তার মধ্যে ৩০০ জন সরাসরি এবং ৪৫ জন সংরক্ষিত আসন থেকে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত। সংসদ কার্যকর হওয়ার জন্য সবারই ভূমিকা রাখা আবশ্যক। সংসদকে কার্যকর করতে হলে সব সংসদ সদস্যের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। মোটা দাগে সংসদ সদস্যদের কাজ ৪টি।প্রথমত, আইন প্রণয়ন; দ্বিতীয়ত, জাতীয় এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিতর্ক অনুষ্ঠান; তৃতীয়ত, সরকারের আয়-ব্যয় ও বাজেট অনুমোদন; চতুর্থত, সংসদীয় কমিটিগুলোর মাধ্যমে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ।
একক আঞ্চলিক এলাকা থেকে বা সরাসরি নির্বাচিত সদস্যদের মতো সংরক্ষিত আসন থেকে ‘নির্বাচিত’ নারী সদস্যরাও একই ভূমিকা পালন করতে পারেন- যদি তারা আগ্রহী হন এবং সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করতে চান। (বিস্তারিত)
আরো বেশি জানতে পড়ূন ১০টি নির্বাচিত কলাম- লিংক