বাজেট-জিডিপি অনুপাতঃ সার্কভুক্ত দেশ ও উন্নত ১০টি দেশ(৪)
ক) সার্কভুক্ত দেশগুলোর বাজেট-জিডিপি অনুপাত (তুলনামূলক ছক)
সার্কভুক্ত (SAARC) দেশগুলোর সরকারি ব্যয় বা বাজেটের আকার তাদের জিডিপির তুলনায় কেমন, তার একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রক্ষেপণ এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর গড় ট্রেন্ডের ভিত্তিতে এই তথ্যগুলো সাজানো হয়েছে।
সার্কভুক্ত দেশগুলোর বাজেট-জিডিপি অনুপাত (তুলনামূলক ছক)
| ক্রম | দেশের নাম | জিডিপির তুলনায় বাজেটের আকার (Spending as % of GDP) | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| ১ | ভুটান | ৩০% - ৩২% | সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ (জলবিদ্যুৎ ও অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগ)। |
| ২ | মালদ্বীপ | ২৮% - ৩০% | পর্যটন নির্ভর অর্থনীতি হওয়ায় সরকারি উন্নয়ন ব্যয় অনেক বেশি। |
| ৩ | শ্রীলঙ্কা | ১৯% - ২১% | অর্থনৈতিক সংকটের পর সংস্কারের ফলে ব্যয় কিছুটা নিয়ন্ত্রিত। |
| ৪ | ভারত | ১৪.৫% - ১৫.৫% | বিশাল অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় বাজেটের আকার স্থিতিশীল। |
| ৫ | নেপাল | ১৩% - ১৪% | প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও স্থানীয় সরকারে বরাদ্দ বৃদ্ধির কারণে মাঝারি পর্যায়ে। |
| ৬ | বাংলাদেশ | ১২.৫% - ১৩.০% | এশিয়ায় সর্বনিম্ন হারগুলোর একটি; প্রধান কারণ সীমিত রাজস্ব আদায়। |
| ৭ | পাকিস্তান | ১২% - ১৩% | ঋণ পরিশোধের চাপ বেশি থাকায় উন্নয়ন ব্যয়ের সুযোগ সীমিত। |
| ৮ | আফগানিস্তান | তথ্য অপ্রতুল | আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় বর্তমানে বাজেট কাঠামো অস্থিতিশীল। |
মূল পর্যবেক্ষণসমূহ:
১. উচ্চ অনুপাত:ভুটান ও মালদ্বীপের বাজেটের আকার জিডিপির তুলনায় অনেক বড়। এর কারণ ছোট অর্থনীতির দেশগুলোতে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প সরকারের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়।
২. বাংলাদেশের অবস্থান: সার্ক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের বাজেট-জিডিপি অনুপাত বেশ নিচের দিকে। এর প্রধান কারণ হলো বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত (Revenue-to-GDP Ratio) দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন (প্রায় ৮.৫% - ৯%)। ফলে সরকার বড় বাজেট প্রণয়ন করতে চাইলে বিশাল ঘাটতির মুখে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
৩. আঞ্চলিক গড়: উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আদর্শ বাজেট-জিডিপি অনুপাত সাধারণত ২০% থেকে ২৫% এর মধ্যে থাকা উচিত বলে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন। সেই তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো (বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান) এখনো পিছিয়ে আছে।
৪. ব্যয়ের ধরন: ভারত ও পাকিস্তানে বাজেটের একটি বড় অংশ প্রতিরক্ষা ও ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়, যেখানে বাংলাদেশ মানবসম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ফোকাস করার চেষ্টা করছে।
খ) বিশ্বের ১০টি উন্নত দেশের বাজেট-জিডিপি অনুপাত
বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশের ১০টি উন্নত দেশের বাজেট ও জিডিপি অনুপাত (সরকারি ব্যয় হিসেবে) নিচে ছক আকারে দেখানো হলো। উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই অনুপাত সাধারণত উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অনেক বেশি হয়, কারণ তাদের শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং উন্নত অবকাঠামো রয়েছে।
বিশ্বের ১০টি উন্নত দেশের বাজেট-জিডিপি অনুপাত (২০২৪-২৫ প্রক্ষেপণ)
| ক্রম | মহাদেশ | দেশের নাম | বাজেট-জিডিপি অনুপাত (Spending as % of GDP) | বৈশিষ্ট্য / মন্তব্য |
|---|---|---|---|---|
| ১ | ইউরোপ | ফ্রান্স | ৫৭.৩% | উন্নত সামাজিক কল্যাণ ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কারণে সর্বোচ্চ ব্যয়ের একটি। |
| ২ | ইউরোপ | জার্মানি | ৪৯.৪% | শক্তিশালী শিল্প খাত ও ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। |
| ৩ | ইউরোপ | নরওয়ে | ৪৯.৫% | প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে অর্জিত তহবিল জনকল্যাণে ব্যাপক ব্যয় করে। |
| ৪ | ইউরোপ | যুক্তরাজ্য | ৪৪.০% | স্বাস্থ্য (NHS) ও প্রতিরক্ষা খাতে বড় অংকের ব্যয় রয়েছে। |
| ৫ | উত্তর আমেরিকা | কানাডা | ৪০.৫% | উন্নত জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় বেশি। |
| ৬ | উত্তর আমেরিকা | যুক্তরাষ্ট্র | ৩৩.৮% | বিশ্বের বৃহত্তম বাজেট; প্রতিরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সর্বোচ্চ ব্যয়। |
| ৭ | এশিয়া | জাপান | ৩৯.৪% | বার্ধক্যজনিত কারণে পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবায় বিপুল ব্যয় করতে হয়। |
| ৮ | এশিয়া | দক্ষিণ কোরিয়া | ৩৫.৬% | প্রযুক্তি ও শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগের হার ক্রমবর্ধমান। |
| ৯ | ওশেনিয়া | অস্ট্রেলিয়া | ২৬.৫% | খনিজ সম্পদ ও দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে স্থিতিশীল বাজেট। |
| ১০ | এশিয়া | সিঙ্গাপুর | ১৮.৫% | উন্নত দেশ হলেও ছোট ভৌগোলিক আয়তনের কারণে ব্যয়ের হার তুলনামূলক কম। |
বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ:
উচ্চ ব্যয় কাঠামো: উন্নত দেশগুলোতে (বিশেষ করে ইউরোপে) বাজেটের আকার জিডিপির প্রায় অর্ধেক বা তার বেশি হয়। এর প্রধান কারণ তাদের নাগরিকদের জন্য "Universal Health Care" এবং উচ্চমানের সামাজিক সুরক্ষা (Social Safety Net) নিশ্চিত করা।
রাজস্ব সক্ষমতা: এই দেশগুলোর রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত (Revenue-to-GDP) অনেক বেশি (সাধারণত ৩০% থেকে ৫০% এর মধ্যে), যা তাদের বড় বাজেট প্রণয়নে সহায়তা করে।
বিপরীত চিত্র: বাংলাদেশের বাজেট-জিডিপি অনুপাত যেখানে মাত্র ১২.৫% - ১৩%, সেখানে ফ্রান্স বা জার্মানির মতো দেশে তা ৫০% এর কাছাকাছি। এটি নির্দেশ করে যে উন্নত দেশগুলোর সরকার জনগণের জীবনে অনেক বেশি সরাসরি বিনিয়োগ করে।
সিঙ্গাপুর মডেল: সিঙ্গাপুরের অনুপাত উন্নত বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কম হলেও তাদের প্রশাসনিক দক্ষতা এবং বেসরকারি খাতের আধিক্যের কারণে তারা অত্যন্ত উচ্চ জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে পারে।
গ) ১০টি অগ্রসর মুসলিম দেশের বাজেট-জিডিপি অনুপাত
উন্নত ও অগ্রসর অর্থনীতির ১০টি মুসলিম প্রধান দেশের বাজেট-জিডিপি অনুপাত নিচে ছক আকারে দেওয়া হলো। এই দেশগুলো তাদের শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক খাতের ব্যয়ের কারণে অগ্রসর বলে বিবেচিত।
১০টি অগ্রসর মুসলিম দেশের বাজেট-জিডিপি অনুপাত (২০২৪-২৫ প্রক্ষেপণ)
| ক্রম | দেশের নাম | জিডিপির তুলনায় বাজেটের আকার (Spending as % of GDP) | প্রধান বৈশিষ্ট্য / ব্যয়ের খাত |
|---|---|---|---|
| ১ | কুয়েত | ৪৮.৫% | বিশাল তেল সম্পদ এবং নাগরিকদের জন্য উচ্চ সামাজিক সুরক্ষা। |
| ২ | ওমান | ৩৬.৮% | অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণে ব্যয়। |
| ৩ | সৌদি আরব | ৩২.৫% | 'ভিশন ২০৩০' এর অধীনে মেগা প্রজেক্ট এবং প্রতিরক্ষা ব্যয়। |
| ৪ | তুরস্ক | ৩১.২% | উন্নত শিল্পায়ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং ভূমিকম্প উত্তর পুনর্গঠন। |
| ৫ | আরব আমিরাত (UAE) | ৩০.৮% | পর্যটন, বাণিজ্য এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগ। |
| ৬ | কাতার | ২৯.২% | গ্যাসভিত্তিক শক্তিশালী অর্থনীতি ও উচ্চমানের নাগরিক সুবিধা। |
| ৭ | আলজেরিয়া | ২৮.৫% | সামাজিক উন্নয়ন ও সরকারি ভর্তুকি খাতে বড় ব্যয়। |
| ৮ | মরক্কো | ২৬.৪% | শিল্প ও পর্যটন খাতের টেকসই উন্নয়নে বিনিয়োগ। |
| ৯ | মালয়েশিয়া | ২৪.৮% | শিক্ষা, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন শক্তিশালীকরণ। |
| ১০ | ইন্দোনেশিয়া | ১৭.৫% | বড় অর্থনীতি ও জি-২০ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ব্যয় অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। |
মূল পর্যবেক্ষণসমূহ:
১. উচ্চ ব্যয় হার: কুয়েত, ওমান ও সৌদি আরবের মতো জিসিসি (GCC) দেশগুলোর বাজেট-জিডিপি অনুপাত অনেক বেশি। এর কারণ তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের আয় সরাসরি নাগরিকদের জনকল্যাণে এবং বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় করা হয়।
২. মালয়েশিয়া ও তুরস্ক মডেল: এই দেশ দুটি তাদের জিডিপির প্রায় ২৫% থেকে ৩০% বাজেটের মাধ্যমে খরচ করে। তাদের ব্যয়ের একটি বড় অংশ শিক্ষা, গবেষণা ও স্বাস্থ্য খাতের মানোন্নয়নে ব্যবহৃত হয়, যা তাদের অগ্রসর দেশ হতে সাহায্য করেছে।
৩. ইন্দোনেশিয়ার বিশেষত্ব: ইন্দোনেশিয়া একটি বিশাল অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও তারা বাজেট ঘাটতি ৩% এর নিচে রাখার কঠোর নীতি মেনে চলে। ফলে তাদের বাজেট-জিডিপি অনুপাত (১৭.৫%) উন্নত বিশ্বের তুলনায় কম হলেও তা খুবই স্থিতিশীল।
৪. বাংলাদেশের সাথে তুলনা: বাংলাদেশের বাজেট-জিডিপি অনুপাত (১২.৫% - ১৩%) এই অগ্রসর মুসলিম দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর মূল কারণ হলো বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা কম হওয়া, যেখানে এই দেশগুলোর রাজস্ব আয় তাদের জিডিপির তুলনায় বেশ শক্তিশালী।