রেনেসাঁঃ ফুটনোটস-৭[ইনকুইজিশন](১৪)


ইনকুইজিশন (Inquisition)


ইনকুইজিশন (Inquisition) হলো মধ্যযুগে এবং রেনেসাঁ পরবর্তী সময়ে ক্যাথলিক চার্চের অধীনে পরিচালিত এক বিশেষ ধর্মীয় আদালত বা বিচারিক ব্যবস্থা। এর মূল লক্ষ্য ছিল 'হেরেসী' (Heresy) বা প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরোধী মতামত দমন করা।

সহজ কথায়, চার্চের নির্ধারিত মতবাদের বাইরে কেউ যদি নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক যুক্তি বা দার্শনিক মতবাদ প্রচার করত, তবে ইনকুইজিশনের মাধ্যমে তাদের বিচার ও কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো।

ইনকুইজিশন কেন এবং কীভাবে কাজ করত?

১. ভিন্নমত দমন: রেনেসাঁ যুগে যখন বিজ্ঞানীরা (যেমন গ্যালিলিও) বা দার্শনিকরা (যেমন জর্ডানো ব্রুনো) চার্চের ভুল ধরিয়ে দিতে শুরু করলেন, তখন চার্চ তাদের 'ধর্মদ্রোহী' ঘোষণা করে এই আদালতে তলব করত।

২. স্বীকারোক্তি আদায়: ইনকুইজিশনের বিচারকরা অভিযুক্তদের ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করতেন।

৩. শাস্তির ধরন: অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তির বিধান ছিল—সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, কারাদণ্ড, জনসম্মুখে চাবুক মারা, কিংবা সবচেয়ে ভয়াবহ শাস্তি হিসেবে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা (Burning at the stake)



ইনকুইজিশনের প্রধান প্রকারভেদ

ইতিহাসে তিনটি প্রধান ইনকুইজিশন সবচেয়ে বেশি কুখ্যাত:

  • মধ্যযুগীয় ইনকুইজিশন (১১৮৪ সাল থেকে): ফ্রান্সে প্রচলিত কিছু বিশেষ গোষ্ঠীর বিদ্রোহ দমনের জন্য শুরু হয়।


  • স্প্যানিশ ইনকুইজিশন (১৪৭৮-১৮৩৪): এটি ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী। স্পেনের রাজা ও রানী রাজনৈতিক ক্ষমতা পোক্ত করতে এবং ইহুদি ও মুসলিমদের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করতে এটি ব্যবহার করা হত।


  • রোমান ইনকুইজিশন (১৫৪২ সাল থেকে): মূলত প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ এবং রেনেসাঁর বৈজ্ঞানিক চিন্তা (যেমন গ্যালিলিওর জ্যোতির্বিজ্ঞান) দমনের জন্য এটি পরিচালিত হতো।


কেন এটি রেনেসাঁর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ?

রেনেসাঁ ছিল 'যুক্তি ও আলোকায়নের' যুগ, আর ইনকুইজিশন ছিল 'অন্ধকার ও দমনের' প্রতীক।

  • এটি প্রগতিশীল চিন্তাকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করেছিল।

  • জর্ডানো ব্রুনোর মতো পণ্ডিতকে এই আদালতের রায়েই পুড়িয়ে মারা হয়েছিল।

  • গ্যালিলিওকে এই আদালতেই হাঁটু গেড়ে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল এবং আমৃত্যু গৃহবন্দী থাকতে হয়েছিল।



একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য শিক্ষা:

ইনকুইজিশনের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে— যখন কোনো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এবং ভিন্নমতকে 'অপরাধ' মনে করে, তখন সেখানে মেধা ও সত্যের মৃত্যু ঘটে। আধুনিক গণতন্ত্রে ইনকুইজিশনের কোনো স্থান নেই; এখানে স্থান রয়েছে যুক্তি ও সহনশীলতার।

রেনেসাঁর ইতিহাসের সবচেয়ে রোমহর্ষক এবং প্রভাবশালী দুটি বিচারিক কাহিনী হলো জর্ডানো ব্রুনো এবং গ্যালিলিও গ্যালিলি-র বিচার। এই দুটি ঘটনা প্রতীকীভাবে দেখায় কীভাবে 'ইনকুইজিশন' বা ধর্মীয় আদালত যুক্তির কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেছিল।

একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য এই দুটি কাহিনী জানা জরুরি, কারণ এটি শাসকগোষ্ঠীর অসহিষ্ণুতা এবং সত্যের অপরাজেয় শক্তির গল্প।


১. জর্ডানো ব্রুনো: আগুনের শিখায় অম্লান সত্য (১৬০০ সাল)

জর্ডানো ব্রুনো ছিলেন একজন ইতালীয় সন্ন্যাসী, দার্শনিক এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তিনি কেবল কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদই সমর্থন করেননি, বরং বলেছিলেন যে মহাবিশ্ব অসীম এবং রাতের আকাশে আমরা যে নক্ষত্রগুলো দেখি সেগুলো আমাদের সূর্যের মতোই একেকটি নক্ষত্র, যার চারপাশে হয়তো অন্য কোনো জগত আছে।

  • বিচারের প্রেক্ষাপট: ১৫৯২ সালে ভেনিসে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে রোমের ইনকুইজিশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। টানা ৭ বছর তাকে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দী করে রাখা হয়েছিল।

  • আদালতের দাবি: বিচারকরা তাকে বারবার বলছিলেন যে, তিনি যদি তার "ভ্রান্ত ও ধর্মদ্রোহী" মতবাদ প্রত্যাহার করেন, তবে তাকে ক্ষমা করা হবে। কিন্তু ব্রুনো তার তত্ত্বে অটল ছিলেন।

  • রায় ও মৃত্যু: ১৬০০ সালের ২০ জানুয়ারি পোপ অষ্টম ক্লিমেন্ট তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায় শোনার পর ব্রুনো বিচারকদের দিকে তাকিয়ে সেই ঐতিহাসিক উক্তিটি করেন:

    "হয়তো আপনারা আমার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করতে যতটা ভয় পাচ্ছেন, আমি সেই রায় গ্রহণ করতে তার চেয়েও কম ভয় পাচ্ছি।"

  • রোমহর্ষক পরিণতি: ১৬০০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রোমের 'ক্যাম্পো ডি ফিওরি' চত্বরে তাকে নিয়ে আসা হয়। তার জিহ্বা একটি কাষ্ঠখন্ড দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছিল যাতে তিনি শেষ মুহূর্তে জনগণের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে না পারেন। এরপর তাকে খুঁটির সাথে বেঁধে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়

২. গ্যালিলিও গ্যালিলি: "তবুও পৃথিবী ঘোরে" (১৬৩৩ সাল)

ব্রুনোর মৃত্যুর ৩৩ বছর পর আধুনিক বিজ্ঞানের জনক গ্যালিলিওকে একই আদালতের মুখোমুখি হতে হয়। তার অপরাধ ছিল তিনি দূরবীন দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে।

  • বিচারের নাটকীয়তা: ৬৯ বছর বয়সী বৃদ্ধ ও অসুস্থ গ্যালিলিওকে রোমের ইনকুইজিশনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করা হয়। তাকে দেখানো হয় ইনকুইজিশনের ভয়াবহ নির্যাতনের যন্ত্রপাতি, ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে মত না পাল্টালে তার পরিণতিও ব্রুনোর মতো হবে।


  • ক্ষমা প্রার্থনা: নিজের জীবন বাঁচাতে এবং বিজ্ঞানকে বাঁচিয়ে রাখতে গ্যালিলিও বাধ্য হয়ে একটি লিখিত দলিলে সই করেন, যেখানে বলা ছিল— "আমি আমার ভুল স্বীকার করছি, পৃথিবী স্থির এবং সূর্যই ঘোরে।"


  • বিখ্যাত জনশ্রুতি: জনশ্রুতি আছে যে, সেই দলিলে সই করে আদালত কক্ষ থেকে বের হওয়ার সময় গ্যালিলিও মাটির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলেছিলেন— "E pur si muove" (বাংলা অর্থ: "তবুও এটি ঘোরে")। অর্থাৎ, মানুষের তৈরি আদালত জোর করে সত্যকে মিথ্যা বানাতে পারে না।


  • পরিণতি: তাকে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড না দিলেও আমৃত্যু গৃহবন্দী করে রাখা হয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি চোখে দেখতে পেতেন না, কিন্তু তার চিন্তা ও বিজ্ঞানকে কেউ বন্দী করতে পারেনি।


এই দুই বিচারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও রাজনৈতিক শিক্ষা:

নাম অপরাধ পরিণতি রাজনৈতিক শিক্ষা
ব্রুনো অসীম মহাবিশ্বের তত্ত্ব। পুড়িয়ে হত্যা। আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করার সাহস।
গ্যালিলিও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ (পৃথিবী ঘোরে)। গৃহবন্দিত্ব। রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান সত্যকে সাময়িকভাবে চাপা দিলেও তা চিরকাল গোপন থাকে না।

একজন নেতার জন্য এই গল্পের নির্যাস:

ইনকুইজিশন ব্রুনোর দেহ পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল, কিন্তু তার চিন্তাকে পোড়াতে পারেনি। আজ সেই রোমের চত্বরেই ব্রুনোর বিশাল মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে, আর যারা তাকে পুড়িয়েছিল তাদের নাম ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।

একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আপনাকে মনে রাখতে হবে— কণ্ঠরোধ করা মানেই সত্যকে পরাজিত করা নয়। বরং ভিন্নমতকে দমনের চেষ্টা উল্টো সেই মতবাদকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।


Previous
Previous

রেনেসাঁ রিডিং-লিস্টঃ বই, মুভি ও ডকুমেন্টারিজ-০৮(১৫)

Next
Next

রেনেসাঁঃ মুসলিম সভ্যতার অবদান-৬ (১৩)