(২০)গণতন্ত্রঃ তত্ত্ব ও তাত্ত্বিক (Democratic Theories and Theorists)

গণতন্ত্র একটি গতিশীল রাজনৈতিক ধারণা যা সময়ের সাথে সাথে বিবর্তিত হয়েছে। এর বিভিন্ন রূপ ও প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন তত্ত্ব প্রদান করেছেন।

নিচে গণতন্ত্রের প্রধান প্রধান তত্ত্বগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও ছক দেওয়া হলো:

গণতন্ত্রের প্রধান তত্ত্বসমূহ

১. উদারনৈতিক গণতন্ত্র (Liberal Democracy): ব্যক্তি স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের ওপর জোর দেয়।

২. অভিজাততান্ত্রিক তত্ত্ব (Elitist Theory): মনে করে যে সমাজ সবসময় একটি ক্ষুদ্র দক্ষ গোষ্ঠী বা 'এলিট' দ্বারা শাসিত হয়, এমনকি গণতন্ত্রেও।

৩. বহুত্ববাদী তত্ত্ব (Pluralist Theory): দাবি করে যে ক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট হাতের মুঠোয় থাকে না, বরং বিভিন্ন গোষ্ঠী ও সংগঠনের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে।

৪. অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র (Participatory Democracy): কেবল ভোটদান নয়, বরং সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা বলে।

৫. মার্কসীয় বা সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র (Marxist/Socialist Democracy): অর্থনৈতিক সমতা ছাড়া রাজনৈতিক গণতন্ত্রকে অর্থহীন মনে করে এবং সর্বহারার একনায়কত্বের কথা বলে।

গণতন্ত্রের প্রধান তত্ত্বসমূহের তুলনামূলক ছক

তত্ত্বের নাম মূল বক্তব্য/তত্ত্ব প্রধান তাত্ত্বিকগণ অন্যান্য তথ্য/বৈশিষ্ট্য
উদারনৈতিক গণতন্ত্র ব্যক্তি স্বাধীনতা, ভোটাধিকার এবং সীমিত ক্ষমতার সরকার। জন লক, জন স্টুয়ার্ট মিল, মন্টেস্কু এটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক মডেল।
অভিজাততান্ত্রিক তত্ত্ব গণতন্ত্র আসলে শাসক ও শাসিত—এই দুই ভাগে বিভক্ত। ক্ষমতা মুষ্টিমেয় ব্যক্তির হাতে থাকে। ভিলফ্রেডো প্যারেটো, গায়েতানো মোসকা, সি. রাইট মিলস এই তত্ত্বমতে, সাধারণ মানুষ নীতি নির্ধারণে খুব কম প্রভাব ফেলে।
বহুত্ববাদী তত্ত্ব সমাজে ক্ষমতা বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষা করে। রবার্ট ডাল, হ্যারল্ড লাস্কি রবার্ট ডাল একে 'পলিআর্কি' (Polyarchy) হিসেবে অভিহিত করেছেন।
অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। জঁ-জ্যাক রুসো, ক্যারল প্যাটম্যান এটি বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেয়।
সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র সম্পদের সুষম বণ্টন এবং শ্রেণীবৈষম্য বিলোপের মাধ্যমে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। কার্ল মার্কস, ভ্লাদিমির লেনিন একে প্রায়ই 'জনগণের গণতন্ত্র' বলা হয় যেখানে পুঁজিবাদের অবসান চাওয়া হয়।
সুশৃঙ্খল/পদ্ধতিগত গণতন্ত্র গণতন্ত্র মানে কেবল একটি পদ্ধতি যেখানে জনগণ ভোটের মাধ্যমে শাসক নির্বাচন করে। জোসেফ শুম্পিটার শুম্পিটার গণতন্ত্রকে একটি 'রাজনৈতিক পদ্ধতি' হিসেবে দেখেছেন।

সংক্ষিপ্ত নোট: আধুনিক বিশ্বে মূলত উদারনৈতিক বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের চর্চা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, যেখানে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তবে তাত্ত্বিকভাবে 'এলিট' বা অভিজাতদের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক এখনো বিদ্যমান।

Previous
Previous

(২১)গণতন্ত্রঃ বিকাশ পর্যায়, তরঙ্গ তত্ত্ব ও গণতান্ত্রিক রুপান্তর তত্ত্ব

Next
Next

(১৯)গণতন্ত্রঃ ২০টি তত্ত্ব ও তাত্ত্বিক