পরিসংখ্যান বিশ্লেষণঃ বাংলাদেশের গণভোট (৭)

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় কোনো বিশেষ জাতীয় ইস্যুতে সরাসরি জনগণের রায় গ্রহণই হলো গণভোট। বাংলাদেশের ৫ দশকের ইতিহাসে আমরা দেখেছি, যখনই কোনো মৌলিক সাংবিধানিক পরিবর্তন বা শাসনতান্ত্রিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, তখনই গণভোটের দ্বারস্থ হয়েছে রাষ্ট্র। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মোট ৩টি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি (আগামীকাল) চতুর্থ গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

প্রথম গণভোট হয়েছিল ১৯৭৭ সালে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গৃহীত নীতি ও কর্মসূচির প্রতি জনগণের আস্থা যাচাই। এর পর ১৯৮৫ সালে এইচ এম এরশাদের সামরিক শাসনের বৈধতা প্রশ্নে দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। তবে এ দুটি গণভোটের নিরপেক্ষতা ও ভোটারের উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে অনেক বিতর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ গণভোট ছিল ১৯৯১ সালেরটি। সেই ভোটের মাধ্যমেই এদেশের মানুষ সিদ্ধান্ত দিয়েছিল তারা 'রাষ্ট্রপতি শাসিত' নাকি 'সংসদীয় গণতান্ত্রিক' পদ্ধতিতে ফিরে যেতে চায়। জনগণের রায়ের ভিত্তিতেই বাংলাদেশে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। আগামীকাল ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য চতুর্থ গণভোটটি মূলত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা নতুন বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কারের ওপর জনগণের সিলমোহর দেওয়ার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।


রাজনৈতিক অবস্থানের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ:

১. ১৯৭৭ সালের গণভোট: সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া জিয়াউর রহমান তার শাসনকার্যের বৈধতা পেতে এটি করেছিলেন। এতে আমলাতন্ত্র এবং সদ্য গঠিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের বড় সমর্থন ছিল। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণের চেয়ে এটি ছিল ব্যক্তির প্রতি আস্থার ভোট।

২. ১৯৮৫ সালের গণভোট: রাষ্ট্রপতি এরশাদ তার সামরিক শাসনের বৈধতা পেতে এই ভোট আয়োজন করেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটগুলো একে 'প্রহসন' আখ্যা দিয়ে বর্জন করেছিল। বিরোধী দলগুলো সেদিন দেশব্যাপী হরতাল পালন করেছিল।

৩. ১৯৯১ সালের গণভোট: এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র গণভোট যেখানে সব বড় রাজনৈতিক দল (আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ইত্যাদি) একমত ছিল। ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর বিএনপি যখন সংসদীয় পদ্ধতি প্রবর্তনের বিল আনে, তখন আওয়ামী লীগও তাতে পূর্ণ সমর্থন দেয়। ফলে এই গণভোটে কোনো দলই 'না' বাক্সের পক্ষে প্রচারণা চালায়নি।

৪. ২০২৬ সালের গণভোট (আজ): ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান পরবর্তী ‘জুলাই সনদ’ বা সংবিধানের আমূল সংস্কারের ওপর জনগণের রায় নিতে আজকের এই ভোট। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই সংস্কারের পক্ষে দেশবাসীকে 'হ্যাঁ' ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ রাজনৈতিক শক্তিই রাষ্ট্র সংস্কারের এই প্রক্রিয়ায় নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছে।

বাংলাদেশের গণভোটের পরিসংখ্যান ও প্রভাব

বছর কার অধীনে (শাসনামল) প্রধান উদ্দেশ্য ভোটার উপস্থিতি হ্যাঁ না বাতিল ফলাফল/কল্যাণকর দিক
১৯৭৭ জিয়াউর রহমান (৩০ মে ১৯৭৭) রাষ্ট্রপতির নীতি ও কর্মসূচির প্রতি আস্থা যাচাই। ৮৮.১০% ৯৮.৮৯% ১.১% ০% সামরিক শাসন থেকে বেসামরিকীকরণের সূচনা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।
১৯৮৫ এইচ এম এরশাদ (২১ মার্চ ১৯৮৫) সামরিক শাসনের বৈধতা ও এরশাদের নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন। ৭২.৪৪% ৯৪.১৪% ৫.৮১% ০% বিদ্যমান শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
১৯৯১ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনর্ববর্তনের (১২তম সংশোধনী) অনুমোদন। ৩৫.১৯% ৮৪.৪১% ১৫.৫৯% ১.৬৯% সবচেয়ে কল্যাণকর: রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরা।
২০২৬ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) জুলাই জাতীয় সনদের আওতায় সংবিধান সংস্কারের অনুমোদন। গণতান্ত্রিক সংস্কার ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রকাঠামো নিশ্চিত করা।

সকল রাজনৈতিক দলের ঐক্যমত্য থাকার পরেও ১৫.৫৯% না ভোটের কারণ কী?

১৯৯১ সালের গণভোটে প্রায় ১৫.৫৯% ভোটার 'না' বাক্সে ভোট দিয়েছিলেন। যদিও আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো বড় দলগুলো এককভাবে 'হাঁ' ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, তবুও কেন ১৫ শতাংশের বেশি মানুষ এই পরিবর্তনের বিপক্ষে ভোট দিলেন, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বেশ কৌতুহল উদ্দীপক।

এর পেছনে প্রধান কয়েকটি কারণ নিম্নরূপ:

১. রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার প্রতি ব্যক্তিগত বা আদর্শিক আনুগত্য

একটি বড় অংশ মনে করতেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল এবং রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল দেশে একজন শক্তিশালী রাষ্ট্রপ্রধান (Executive President) প্রয়োজন, যিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। বিশেষ করে তৎকালীন জাতীয় পার্টির একটি অংশ এবং এরশাদ সমর্থক ভোটাররা সংসদীয় পদ্ধতির চেয়ে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার প্রতি বেশি আস্থাশীল ছিলেন।

২. সংসদীয় পদ্ধতির 'অস্থিতিশীলতা' নিয়ে শঙ্কা

বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম দিকে (১৯৭২-৭৫) সংসদীয় পদ্ধতি চালু থাকলেও তা রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছিল। সাধারণ মানুষের একটি অংশের মধ্যে ভয় ছিল যে, সংসদীয় পদ্ধতিতে ঘনঘন সরকার পরিবর্তন হতে পারে বা সংসদ সদস্যরা বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে পড়লে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। এই শঙ্কা থেকেই অনেকে 'না' ভোট দেন।

৩. শেখ মুজিবুর রহমানের 'বাকশাল' বা একক পদ্ধতির স্মৃতি

সংসদীয় গণতন্ত্রের সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও অনেকে ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর (বাকশাল) কথা ভুলে যাননি। কেউ কেউ মনে করেছিলেন, ক্ষমতার কাঠামোর এই পরিবর্তন হয়তো পরবর্তীতে আবারও কোনো একদলীয় বা বিশেষ ব্যবস্থার পথ খুলে দেবে। এই 'ভীতি' থেকেও কিছু মানুষ পুরাতন কাঠামোর (রাষ্ট্রপতি শাসিত) পক্ষে থাকতে চেয়েছিলেন।

৪. বামপন্থী ও ক্ষুদ্র দলগুলোর ভিন্নমত

সব বড় দল একমত হলেও, কিছু অতি-বামপন্থী বা অতি-ডানপন্থী ক্ষুদ্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী মনে করত যে, এই পরিবর্তন কেবল বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার ভাগাভাগি। তারা বিদ্যমান ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছিল এবং প্রতিবাদস্বরূপ 'না' ভোট দিতে উৎসাহী ছিল।

৫. প্রচারণার অভাব ও বিভ্রান্তি

যেহেতু বড় সব দল 'হাঁ' ভোটের পক্ষে ছিল, তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে 'না' ভোট দিলে কী হতে পারে বা 'না' ভোট দেওয়ার অর্থ কী—তা নিয়ে সচেতনতা বা প্রচারণার অভাব ছিল। অনেক ক্ষেত্রে গ্রামগঞ্জের বয়োজ্যেষ্ঠ ভোটাররা পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষা করাকেই নিরাপদ মনে করে 'না' বাক্সে সীল মেরেছিলেন।

সারসংক্ষেপ: ১৯৯১ সালের 'না' ভোটগুলো কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনের ফল ছিল না, বরং এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট অংশের ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিক দ্বিধা, পুরাতন ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য এবং নতুন ব্যবস্থার অস্থিতিশীলতা নিয়ে শঙ্কার প্রতিফলন।

গণভোটে রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন চিত্র

গণভোটের বছর আয়োজক শাসক/সরকার সমর্থনকারী দলসমূহ বিরোধিতাকারী/বর্জনকারী দলসমূহ
১৯৭৭ জিয়াউর রহমান মূলত তৎকালীন সরকারি বলয় ও ডানপন্থী দলসমূহ। আওয়ামী লীগসহ অধিকাংশ বামপন্থী দল এই প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে গিয়েছিল।
১৯৮৫ এইচ এম এরশাদ এরশাদের অনুসারী রাজনৈতিক শক্তি (তৎকালীন জনদল)। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ ১৫ ও ৭ দলীয় জোট এই ভোট বর্জন করে এবং ধর্মঘট পালন করে।
১৯৯১ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য প্রায় সব দল। কোনো প্রধান দলই এর বিরোধিতা করেনি, কারণ এটি ছিল সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার জাতীয় সিদ্ধান্ত।
২০২৬ (আজ) অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই চেতনার পক্ষের দল এনসিপি, জামায়াত এবং অনেক দেশপ্রেমিক জনতা আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, কিছু বাম দল, এবং বিএনপিও গোপনে এর বিপক্ষ প্রচারণা চালিয়েছে।
  • ১৯৭৭ এবং ১৯৮৫ সালের গণভোটে ভোটার উপস্থিতি ও 'হ্যাঁ' ভোটের হার (যথাক্রমে ৯৮.৯% এবং ৯৪.১%) অস্বাভাবিকভাবে বেশি হওয়ায় এগুলো নিয়ে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। তবে ১৯৯১ সালের গণভোটটি বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ভিত্তি স্থাপনে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। অন্যদিকে ২০২৬ সালের গণভোটে বিএনপির অবস্থান ছিল দোদুল্যমান। তারেক রহমান একটি মাত্র সভায় গণভোটের পক্ষে হাঁ ভোটে সিল মরার আহ্বান জানালেও গোপনে এই দলের সকলেই জাতীয় পার্টি ও আওয়ামীলীগের সাথে মিলিতভাবে না ভোটের পক্ষে মতামত দিয়েছে বলেই জোর প্রচারণা রয়েছে।

  • ১৯৭৭ ও ১৯৮৫ সালের দুটি গণভোটই হয়েছিল সামরিক আইনের অধীনে। তখন বিরোধী দলগুলো ভোট বর্জন করেছিল এবং ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে ব্যাপক আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিতর্ক ছিল। মূলত শাসককে ৯৪% থেকে ৯৮% সমর্থন দেখানোর একটি রাজনৈতিক প্রবণতা থাকায় সেখানে 'না' বাক্সের কোনো কার্যকর ভূমিকা ছিল না। এই ভোটগুলো মূলত তৎকালীন শাসকদের একটি 'বেসামরিক চেহারা' দিতে সাহায্য করেছিল, যদিও তা প্রকৃত গণতন্ত্র নিশ্চিত করেনি।

  • ১৯৭৭ বা ১৯৮৫ সালের তুলনায় ১৯৯১ সালের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনের গণভোট ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম স্বচ্ছ গণভোট। যদিও সব বড় দল 'হাঁ' ভোটের পক্ষে ছিল, তবুও ১৫% এর বেশি মানুষ নির্ভয়ে 'না' ভোট দিতে পেরেছিল। এটি প্রমাণ করে যে ১৯৯১ সালের নির্বাচন কমিশন এবং তত্ত্বাবধায়ক কাঠামো অনেক বেশি নিরপেক্ষ ছিল।

  • বিভিন্ন তথ্যমতে, আগের দুই ভোটে ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৮০-৯০% দাবি করা হলেও ১৯৯১ সালে তা ছিল মাত্র ৩৫%। এটিই ছিল প্রকৃত ভোটার উপস্থিতির বাস্তব চিত্র, যা আগের সরকারগুলোর ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো পরিসংখ্যানের অসারতা প্রমাণ করে।

  • ১৯৭৭ ও ১৯৮৫ সালে 'না' ভোট দেওয়াকে এক ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কাজ বা শাসকের অবাধ্যতা হিসেবে দেখা হতো। ১৯৯১ সালে 'না' ভোট ছিল একটি রাজনৈতিক ভিন্নমত। মানুষ মনে করেছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থাটিই হয়তো দেশের জন্য ভালো, এবং তারা কোনো ভয় ছাড়াই সেই রায় দিতে পেরেছিল।

  • ১৯৭৭ এবং ১৯৮৫ সালের গণভোটে 'না' ভোট ছিল নামমাত্র, যা কেবল ভোটের আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করতে ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালের ১৫.৫৯% 'না' ভোট মূলত বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার পুনরুদ্ধারের প্রতীক। এটিই ছিল প্রকৃত গণতান্ত্রিক ম্যাচিউরিটির প্রথম ধাপ।

Previous
Previous

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণঃ তত্ত্বাবধায়ক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন (৮)

Next
Next

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণঃ বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন ও ফলাফল (৬)